kalerkantho

শনিবার । ৫ আষাঢ় ১৪২৮। ১৯ জুন ২০২১। ৭ জিলকদ ১৪৪২

বিশ্ব অভিবাসী দিবস পালিত

দেশেই স্বপ্নের জাল বুনছে ওরা ৪৭ জন

হায়দার আলী   

১৯ ডিসেম্বর, ২০১৪ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



দেশেই স্বপ্নের জাল বুনছে ওরা ৪৭ জন

আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস ২০১৪ উপলক্ষে গতকাল প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সংসদ ভবনের সামনে শোভাযাত্রা বের করে। ছবি : কালের কণ্ঠ

সংসারের সচ্ছলতা আনতে দেশ ছেড়ে বিদেশ পাড়ি দিয়েছিল তারা। বিদেশ যাওয়ার টাকা জোগাড় করতে কেউ বিক্রি করেছিল জমি, কেউ করেছিল ধার-দেনা। তবে সুখ পাখি ধরা দেয়নি। উল্টো দালালদের হাতে জিম্মি হয়ে সইতে হয়েছে নির্মম নির্যাতন। দিনের পর দিন খাবার জোটেনি, মুক্তিপণের টাকার জন্য দেওয়া হয়েছে বৈদ্যুতিক শক, কারো কারো হাত-পায়ের নখ উপড়ে ফেলেছে দালালরা। শেষে দেশ থেকে পাঠানো মুক্তিপণের টাকা দালালদের হাতে তুলে দিয়ে শূন্য পকেটে স্বজনের কাছে ফিরেছে তারা। দেশে ফিরে শুরুতে ভেঙে পড়লেও আবার তারা ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছে। তবে আর বিদেশ নয়, এবার তারা দেশেই স্বপ্নের ডানা মেলে ধরতে চায়। সে লক্ষ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে 'অভিবাসী এন্টারপ্রাইজ'। বিদেশে প্রতারিত হয়ে দেশে ফেরা ৪৭ জন মিলে দাঁড় করেছে ব্যবসায়িক এ প্রতিষ্ঠান। 'বিদেশে দাসত্ব নয়, দক্ষ শ্রমে দেশে ভাগ্য হয়'-এই হলো তাদের স্লোগান। বিদেশ গিয়ে আর কেউ যেন দালালদের হাতে প্রতারিত না হয়, সে জন্য জনসচেতনতা তৈরির কাজও করছে তারা।

গত মার্চ থেকেই ব্যবসা শুরু করেছে অভিবাসী এন্টারপ্রাইজ। উদ্যোক্তারা মুড়ি, ঝালমুড়ি, বিভিন্ন ধরনের চকোলেট, চানাচুর, মোটর ভাজা, বিস্কুটসহ নানা খাদ্যপণ্য কিনে এনে প্যাকেটজাত করে বাজারে সরবরাহ করে। ঢাকার বাইরে পাইকারি বাজার থেকে কাপড় কিনে সেগুলো পরে রাজধানীর বিভিন্ন দোকানেও সরবরাহ করে। সব আয়োজন চলে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের চাঁদ হাউজিং লিমিটেডের বি-ব্লকের ১ নম্বর রোডের ৯ নম্বর বাড়িতে। এর মাধ্যমে যে যার মতো স্বল্প পুঁজি বিনিয়োগ করে এক ছাতার নিচে জড়ো হয়েছে ৪৭ জন। আর সম্মিলিত পরিশ্রমে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে অভিবাসী এন্টারপ্রাইজ।

বিনিয়োগকারীরা নিজেরাই পণ্য প্যাকেটজাত করে। নিজেরাই রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকার মার্কেট কিংবা দোকান ঘুরে ঘুরে ফরমায়েশ আনে। পরে সে অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ করে।

উদ্যোক্তাদের অন্যতম আল আমিন নয়ন। আড়াই লাখ টাকা খরচ করে গিয়েছিলেন মালয়েশিয়া। তবে কোনো কাজ জোটেনি। উল্টো দালালদের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, খেয়ে না খেয়ে বনে-জঙ্গলে পালিয়ে ছিলেন। শেষ পর্যন্ত বাড়ি থেকে জমি বিক্রি করে পাঠানো টাকায় ফিরে আসেন।

আল আমিন কালের কণ্ঠকে বলেন, 'দেশে ফেরার পর মাথায় নতুন চিন্তা এলো। বিদেশ গিয়ে মানুষ যেন প্রতারণার শিকার না হয়, সে বিষয়ে কাজ করতে থাকি। অভিবাসীদের নিয়ে কাজ করে-এমন একটি সংস্থায় চাকরিও নিই। যেখানেই শুনি প্রবাসী কর্মী সমস্যায় পড়েছে, সেখানেই ছুটে গেছি। সবাই মিলে ব্যবসা করা যায় কি না, প্রতারণার শিকার হয়ে দেশে ফেরা ব্যক্তিদের এমন প্রস্তাব দিলাম। সবাই রাজিও হলো। এরপর প্রতি মাসে ২০০ টাকা করে জমানো শুরু করি। সেই টাকাতেই ব্যবসার শুরু।' পটুয়াখালীর ইসহাক ফারুক ২০১২ সালের জুনে গিয়েছিলেন ওমানে। গিয়েই পড়েন দালালের খপ্পরে। ১৯ দিন পর দালালরা তাঁর সঙ্গে আরো অনেককে আরব সাগর পাড়ি দিয়ে নিয়ে যায় ইরানে। টাকার জন্য মাঝ দরিয়াতেই চালানো হয় নির্যাতন। মারা যায় তিনজন। ইরানে নেওয়ার পরও চলে নির্যাতন। হাত-পায়ের নখ পর্যন্ত তুলে নেওয়া হয়েছে। ভিটেমাটি বিক্রি করে মুক্তিপণ দেওয়ার পরও দালালরা তাঁকে ছাড়েনি। শেষে স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় তিনি মুক্তি পান।

তবে সেসব ভুলে এখন দেশেই নিজের পায়ে দাঁড়াতে চান ফারুক। তাঁর আশা, শিগগিরই অভিবাসী এন্টারপ্রাইজের পরিধি আরো বাড়বে। বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জের ইলিয়াস হোসেন আবুধাবি গিয়েছিলেন ২০১১ সালে। সেখান থেকে প্রথমে ওমানে, পরে ওমান থেকে দালালরা তাঁকে ফারুকের মতো ইরানে নিয়ে যায়। তারপর বহু কষ্টে তিনি দেশে ফিরেছেন। ইলিয়াস বললেন, 'বিদেশে গিয়ে কেউ যেন প্রতারণার শিকার না হয়, সে জন্য অভিবাসী এন্টারপ্রাইজের মাধ্যমে আমাদের এলাকায় উঠোন বৈঠক করে মানুষকে সচেতন করার কাজ করছি। স্থানীয় স্কুলগুলোতেও সচেতনামূলক সভা করে দালালদের ভয়াবহতা সম্পর্কে জানিয়েছি।'

৪৭ জনেরই আরেকজন মোজাম্মেল হক। তিনি বললেন, 'মধ্যপ্রাচ্য থেকে উন্নত দেশে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে দালালরা সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে টাকা আদায় করে। সেই ফাঁদে যেন কেউ না পড়ে, সে জন্য আমরা সচেতনতা তৈরির জন্য কাজ করি। বিদেশ যাওয়ার কথা আর মুখেও আনব না।'

 



সাতদিনের সেরা