kalerkantho

রবিবার । ১ কার্তিক ১৪২৮। ১৭ অক্টোবর ২০২১। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

হরতাল-অবরোধ সংঘাত-সহিংসতা

বেশি বিপদে পেশাজীবী নারীরা

শরীফা বুলবুল   

৩ ডিসেম্বর, ২০১৩ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



হরতাল, অবরোধ বা রাজনৈতিক সহিংসতায় বেশি সমস্যায় পড়েছেন নারী পেশাজীবীরা। চাকরি, ব্যবসা, সন্তানকে নিয়ে স্কুলে যাওয়াসহ গৃহস্থালি কাজে নিয়োজিত নারীরা পরিবহনের অভাবে যেমন না পারছেন হেঁটে লম্বা রাস্তা পাড়ি দিতে, না পারছেন সব ছেড়ে ঘরে বসে থাকতে। রাস্তার গুটিকয়েক বাসে তাঁরা যেমন ঠেলাঠেলি করে উঠে গন্তব্যে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না, তেমনি গোনা টাকা খরচ করে অটোরিকশা, কেউ কেউ রিকশায়ও চড়তে পারছেন না। ফলে ঢাকার সড়কগুলোর মোড়ে মোড়ে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হচ্ছে তাঁদের। কোনো দিন অপেক্ষার পর গন্তব্যে পৌঁছতে পারছেন, আবার কোনো দিন পারছেন না। কাজ না করেই ঘরে ফিরতে হচ্ছে।

রাস্তায় কেবল যানবাহন সংকটই ভোগাচ্ছে না নারীদের। নাশকতার পেট্রলবোমা, ককটেলও এসে পড়ছে তাঁদের গায়ে। দিনকয়েক আগে পেট্রলবোমায় পুড়ে যাওয়া ব্যাংক কর্মচারী আনোয়ারা মারা গেছেন। গতকাল সোমবার ঢাকার ডেমরা এলাকায় কারখানায় কাজে যোগ দিতে যাওয়ার পথে অবরোধকারীদের আগুন পুড়িয়ে দেয় অন্তঃসত্ত্বা গার্মেন্টকর্মী শিরিন আক্তারের দেহ। তাঁর শরীরের ৪০ শতাংশই পুড়ে গেছে। তিনি আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে। শাহবাগে যাত্রীবাহী বাসে পেট্রলবোমা হামলাসহ বিভিন্ন স্থানে অবরোধের আগুন আর সহিংসতায় পোড়া শরীর নিয়ে বার্ন ইউনিটে আগে থেকেই চিকিৎসাধীন অর্ধডজনেরও বেশি নারী। তাঁদের মধ্যে শিরিনসহ চারজন আছেন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ)।

রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে অনেকেই পারতপক্ষে ঘরের বাইরে বের হচ্ছে না। ঢাকার শান্তিনগরে থাকেন সরকারি কর্মচারী সেলিনা আখতার। বাসা থেকে এক কিলোমিটারেরও কম দূরত্বে কর্মস্থল, সেগুনবাগিচায়। ওইটুকু রাস্তা প্রতিদিন যেতে আর আসতেই ভীত হয়ে পড়েন তিনি। ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডে ইস্টার্ন মল্লিকা মার্কেটের এক দর্জির দোকানে মাসখানেক আগে দুই সেট জামা বানাতে দিয়ে এসেছিলেন। সেগুলো বানানো হয়ে গেছে। হরতাল-অবরোধে উৎসবের আতশবাজির মতো বোমাবাজি আর ককটেল নিক্ষেপের কারণে সেই জামাকাপড়ও আনতে যাচ্ছেন না তিনি।

এ তথ্য জানিয়ে কালের কণ্ঠকে সেলিনা বলেন, 'জামাকাপড় আমার কাছে বড় নয়। আগে নিজের জান। অফিসে না এলেই নয়, তাই প্রাণ হাতে নিয়ে রাস্তায় নামি। এ সপ্তাহেও আর ইস্টার্ন মল্লিকায় যাব না। পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলে শুক্রবার যাওয়ার সাহস দেখাতে পারি, তার আগে নয়।'

শারীরিক অসুস্থতার কারণে ১৫ দিন ধরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে ডাক্তার দেখানোর পরিকল্পনা করেও পারেননি মিরপুর ১ নম্বরের বাসিন্দা জেসমিন। কিন্তু হরতাল-অবরোধ বা রাজনৈতিক সহিংসতা কমার অপেক্ষায় থেকে জীবন তো আর ধ্বংস করা যাবে না। তাই প্রাণটুকু হাতে নিয়ে গতকাল আসেন শাহবাগে, ডাক্তারের কাছে। কিন্তু অবরোধে অহরহ বাসে আগুন দিয়ে মানুষ পোড়ানোর দৃশ্য দেখা জেসমিন আসার সময় বাসে ওঠার সাহস পাননি। তিনি এসেছেন রিকশায়। কিন্তু এ জন্য আড়াই শ টাকা ভাড়া গুনতে হয়েছে তাঁকে।

জরুরি কাজে বের হওয়া জেসমিন ইসলাম সপ্তাহে দু-এক দিনের জন্য এমন বাড়তি ভাড়া দিয়ে রিকশায় আসতেই পারেন। কিন্তু নিরাপত্তার কথা ভেবে তাঁর মতো রিকশায় আসার সুযোগ নেই তথ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মচারী সোকানুর বেগমের। তাঁর বাসাও মিরপুরে, কর্মচারীদের জন্য সরকারি আবাসন কোয়ার্টারে। তাঁর পক্ষে পুরো মাসের বেতন দিয়েও শুক্র, শনিবার বাদ দিয়ে সপ্তাহে পাঁচ দিন দুই বেলা করে রিকশা ভাড়া দেওয়া সম্ভব নয়। তাই বরাবরের মতো সরকারি স্টাফ বাসেই যাতায়াত করেন তিনি। কিন্তু স্টাফ বাসটি স্বাভাবিক দিনে যেখানে সকাল ৮টায় মিরপুর থেকে ছাড়ে, হরতাল-অবরোধে বাসটি ছাড়ে ৬টা থেকে সাড়ে ৬টার দিকে। মূলত পিকেটাররা রাস্তায় নামার আগেই নিরাপদে অফিসে পৌঁছানোর জন্যই স্টাফ বাসের চালক ভোরে যাত্রা শুরু করেন। এতে সোকানুর বেগম একে তো দুই ঘণ্টা আগে রওনা দেন, তার ওপর ফাঁকা রাস্তায় ২০-২৫ মিনিটের মধ্যেই বাসটি চলে আসে। কিন্তু অফিসের কাজ শুরু হয় ৯টার দিকে। ফলে অফিসে এসে শুধু শুধু নষ্ট করতে হয় কমপক্ষে দুই ঘণ্টা সময়।

সোকানুর জানান, ভোরে ঘুম থেকে উঠেই স্টাফ বাস ধরতে হয়। গোসল, নাশতা কোনো কিছুই করা যায় না। আবার অফিসের সামনে গাড়ি থেকে নেমে বসে থাকতে হয় দু-তিন ঘণ্টা। প্রতিটি হরতাল-অবরোধের সময় এমনই কষ্ট ভোগ করতে হয় স্টাফ বাসের যাত্রীদের।



সাতদিনের সেরা