kalerkantho

রবিবার । ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯। ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৭ রবিউস সানি                    

আস্থা ও স্বস্তির প্ল্যাটফর্ম তৈরিতে কিছু শঙ্কা

ড. সুলতান মাহমুদ রানা

১২ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



আস্থা ও স্বস্তির প্ল্যাটফর্ম তৈরিতে কিছু শঙ্কা

শুদ্ধি অভিযান অব্যাহত থাকায় আওয়ামী লীগের সব পর্যায়ের নেতাকর্মীরা বেশ আতঙ্কে রয়েছেন। বিশেষ করে, সম্প্রতি দলের গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর শীর্ষ পদের অপসারণমূলক পদক্ষেপ তথা রদবদলের ইস্যুতে শঙ্কার পরিমাণটা অধিক হয়েছে। বেশ কিছুদিন ধরে দেশে যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিরাজ করছিল, তাতে সাধারণ সচেতন মানুষ ক্রমেই হতাশ হয়ে উঠেছিল। আর এখন সেই সচেতন জনগণের মনে এক ধরনের স্বস্তির জায়গা আসতে শুরু করেছে। দীর্ঘদিন থেকে রাজনৈতিক আধিপত্যের ফলে সাধারণদের অসহায়ত্ব বোধ বেশি ছিল। মূলত বেশ কিছু ক্ষেত্রে সরকারি দলের কতিপয় কর্মকাণ্ড ও যাচ্ছেতাই আধিপত্য এবং ক্ষমতার দাপটের ফলে সাধারণদের হয়রানির পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর শুদ্ধি অভিযান শুরু হওয়ায় এবং অব্যাহত থাকায় সরকারি দলের নেতাকর্মীদের দ্বারা হয়রানির দৃষ্টান্ত যথেষ্ট কমতে শুরু করেছে। এমনকি এসব ক্ষেত্রে গণমাধ্যমও বেশ তৎপর রয়েছে। এ মুহূর্তে কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে তৃণমূল পর্যায়ে সরকারি দলের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নিজেরাই নিজেদের সংস্কারের তাগিদ অনুভব করতে শুরু করেছেন।

তবে রাষ্ট্রের সর্বস্তরে যেভাবে সুবিধাবাদ চর্চা, স্বজনপ্রীতি, আত্মীয়করণ, আঞ্চলিকপ্রীতি ও দুর্নীতির ডালপালা বেড়েছে, তাতে অতি সহজেই এখান থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব নয়। এমনকি প্রধানমন্ত্রী নিজে এ ক্ষেত্রে নিজের জীবন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেও বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি তাঁর নিজের জীবনের ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে শুদ্ধি অভিযান নিয়ে আগানোর প্রত্যয়ের কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর এই বক্তব্য থেকে পরিষ্কার ধারণা করা যায় যে অনিয়ম ও দুর্নীতির শিকড় কত দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। তবে দেশে যে ধরনের অনিয়ম ও অন্যায়ের ডালপালার বিস্তার ও প্রাদুর্ভাব রয়েছে, সেগুলোর শুদ্ধিতার সময় ও সুযোগ এটিই।

শুধু রাজনীতিবিদদের মধ্যে নয়, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরেও এই অভিযান অব্যাহত রাখতে এবং চলমান অভিযানকে আরো গতিশীল করতে দুর্নীতি দমন কমিশনের অগ্রণী ভূমিকা রাখার সুযোগ এসেছে। আমরা লক্ষ করেছি, গত ১ নভেম্বর কালের কণ্ঠে  ‘ক্রমবর্ধমান অপরাধে জড়াচ্ছে পুলিশও’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদনে খুলনা অঞ্চলের বেশ কয়েকটি ঘটনা উল্লেখপূর্বক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এমন তথ্য আমরা প্রায়ই গণমাধ্যম সূত্রে পাচ্ছি। কিন্তু গণমাধ্যম সূত্রে প্রাপ্ত চাঞ্চল্যকর সংবাদের তুলনায় যথাযথ তদন্ত কিংবা সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলো আমলে নিয়ে সেগুলোর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি খুব বেশি আমাদের সামনে আসছে না।

বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় ও অনলাইন নিউজপোর্টালে বেশ কিছু সংবাদ আমাদের সামনে আসে, যেগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ। নানা অনিয়ম, অন্যায়ের বিষয়ে বিভিন্ন দপ্তরের কর্তাব্যক্তিদের যাচ্ছেতাই ক্ষমতাচর্চার বিষয়টি যেভাবে সামনে আসে সেগুলোর বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ লক্ষ করা যায় না। এমনকি সেগুলো যথাযথভাবে প্রতিবাদ করার সুযোগ ও সাহস কোনোটিই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা পান না। ফলে সেগুলো সাধারণদের অজানাই থেকে যায়। এভাবে বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতি ও অন্যায় প্রশ্রয় পেয়ে যায় নীরবে। অনেক সময় আমরা লক্ষ করি, কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগের বিষয়ে সরকার কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যবস্থা গ্রহণে উদ্যোগী হতে দেখা যায় না। প্রতিটি ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এবং প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিগোচর হওয়ার অপেক্ষা ছাড়া দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দেখা যায় না বললেই চলে। অথচ এসব ক্ষেত্রে গড়িমসি না করে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সোচ্চার হওয়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। 

সরকার এবং দলকে ঢেলে সাজানোর বিষয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বেশ কয়েকবার ইচ্ছা পোষণ করেছেন। এমনকি এরই মধ্যে বিভিন্ন সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের কাউন্সিলের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। আসন্ন কাউন্সিলগুলোতে ক্লিন ইমেজের নেতারা যে শীর্ষ পদ পেতে যাচ্ছেন, এ বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে আমরা শুনে থাকি, সরকার এবং দল অনেক ক্ষেত্রে বেশ কিছু সিন্ডিকেট দ্বারা পরিচালিত হয়। সিন্ডিকেট যেভাবে চায়, ঠিক সেভাবেই সব কিছু হয়—এমন ধারণাটি খুব প্রচলিত আছে। কিন্তু সাম্প্রতিক শুদ্ধি অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে ধারণা করা হচ্ছে, রাষ্ট্রের সব ক্ষেত্রে ওই সব কথিত সিন্ডিকেটের ভাঙনের সুযোগ হয়েছে।

আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের কমিটিতে যেন বিতর্কিত ও অনুপ্রবেশকারীরা স্থান না পান, সে জন্য দলের শীর্ষপর্যায় থেকে হুঁশিয়ারি ছিল। কিন্তু হুঁশিয়ারি অমান্য করে যে যার মতো রাজনৈতিক স্বেচ্ছাচারিতা অনুসরণ করেছে। ফলে বেড়েছে রাজনৈতিক স্বেচ্ছাচারিতা ও দুর্বৃত্তায়নের মাত্রা। সম্প্রতি নানাভাবে আলোচনায় এসেছে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের ভয়াবহতার প্রসঙ্গ। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের ফলে সুশাসনের মূল চেতনা নষ্ট হচ্ছে। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের পেছনে আরো যে শক্তি কাজ করছে সেটি হলো—সরকারি দলে অনুপ্রবেশ। গত ৩১ অক্টোবর রাজধানীর ধানমণ্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে সম্পাদকমণ্ডলীর সভা শেষে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, অনুপ্রবেশকারীদের তালিকা করেছে দলটি। এই তালিকা পাঠানো হয়েছে কেন্দ্র থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলায়। মূলত বিতর্কিতদের নামের এ রকম একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এই তালিকায় বিতর্কিতদের সংখ্যা প্রসঙ্গে দলের দপ্তর সম্পাদক আব্দুস সোবহান গোলাপ বলেন, ‘নামের তালিকাটি এক হাজার পৃষ্ঠার মতো হবে।’ এর আগে গণমাধ্যমে প্রকাশিত অনেক প্রতিবেদন সূত্রে জামায়াত-শিবির নিজেদের গা বাঁচানোর জন্য অনেক দিন থেকেই আওয়ামী লীগের পদ লাভ করার বিষয়টি আমরা সবাই জানি। বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগে কিংবা যুবলীগে এমন অনুপ্রবেশকারীদের গুরুত্বপূর্ণ পদ পাওয়ার খবর পাওয়া যায়। যাঁরা দীর্ঘদিন থেকে মূল সংগঠনে আছেন, তাঁদের বাদ দিয়ে কোনো ক্ষেত্রে এমন অনুপ্রবেশকারীদের পদ পাওয়ার বিষয়টি প্রকৃত আদর্শের মানুষদের ব্যথিত করে তুলেছে বিভিন্ন সময়ে। আর কথিত রয়েছে, এসব অনুপ্রবেশকারীর বটগাছ হিসেবে সরকারের ভেতরে নানা সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। আর সেই সিন্ডিকেটগুলো যত দিন পর্যন্ত ভাঙা যাবে না তত দিন অনুপ্রবেশকারী কিংবা সুবিধাবাদীদের শক্ত দাঁত ভাঙতে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ সম্ভব হবে কি না, সেই প্রশ্ন এখন সামনে আসছে। কাজেই সাধারণদের মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস স্থিতিশীল করতে শুধু দলের ভেতরের দুর্নীতিবাজদের নয়, অনুপ্রবেশকারীদের মূলোৎপাটন করতে কথিত সিন্ডিকেটগুলোর বিরুদ্ধেও শুদ্ধি অভিযান চালানোর  ন্যায্যতা রয়েছে।

 

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা