kalerkantho

শনিবার । ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৬ রবিউস সানি               

সড়ক পরিবহন আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন জরুরি

ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু

৮ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সড়ক পরিবহন আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন জরুরি

বহুল আলোচিত সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ গত ১ নভেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছে। নতুন সড়ক পরিবহন আইন বাস্তবায়নে পূর্ণ সমর্থন দেওয়ার কথা জানিয়েছে সড়ক পরিবহন সমিতি। তবে আইনটিকে সাধুবাদ জানালেও এর কিছু অংশ কঠিন বলে মনে করছে মালিক সমিতি। এ জন্য আইনের কিছু অংশ সংশোধনের দাবি জানিয়েছে তারা। সড়ক পরিবহন সমিতির পক্ষ থেকে বলা হয়, নতুন এ আইনে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ এত বিপুল যে তা দেওয়া সম্ভব নয়। যাহোক, নতুন এ আইনে মালিক, শ্রমিক, পথচারী সবারই জরিমানা বেড়েছে। তবে এটা জানানোর জন্য আরো বেশি প্রচারণা দরকার।

বেশির ভাগ মানুষ এখন পর্যন্ত এ আইনের কথা জানে না। ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া পেশাদার বা অপেশাদার চালক গাড়ি চালালে কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রেখে ২০১৭ সালের ২৭ মার্চ মন্ত্রিসভা আইনটির খসড়ায় অনুমোদন দেওয়ার পর গত বছরের ৮ অক্টোবর ‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮’-এর গেজেট জারি করা হলেও এর কার্যকারিতা এত দিন ঝুলে ছিল। এ আইনে ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালালে ছয় মাসের কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। তা ছাড়া গাড়ি চালানোর সময় চালকদের মোবাইল ফোন ব্যবহারের জন্যও দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। আইনে বলা হয়েছে, অষ্টম শ্রেণি পাস না করলে লাইসেন্স পাবে না চালকরা। পাশাপাশি গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার করা যাবে না। মোবাইল ফোন ব্যবহার করলে এক মাসের কারাদণ্ড ও পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হবে। আইনে সাধারণ চালকের বয়স কমপক্ষে ১৮ বছর এবং পেশাদার চালকদের বয়স হতে হবে কমপক্ষে ২১ বছর। জাল ড্রাইভিং লাইসেন্স ব্যবহারের জন্য দুই বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানা তিন লাখ টাকা করা হয়। ফিটনেস চলে যাওয়ার পরও মোটরযান ব্যবহার করলে এক বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা জরিমানা করার বিধান রয়েছে। তা ছাড়া দুর্ঘটনার জন্য দণ্ডবিধি অনুযায়ী তিন রকমের বিধান রয়েছে। যেমন—অপরাধমূলক নরহত্যা হলে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারা অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডের সাজা হবে। খুন না হলে ৩০৪ ধারা অনুযায়ী যাবজ্জীবন।

বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালিয়ে মৃত্যু ঘটালে ৩০৪(বি) ধারা অনুযায়ী তিন বছরের কারাদণ্ড হবে। আর দুই গাড়ি পাল্লা দিয়ে দুর্ঘটনা ঘটালে তিন বছরের কারাদণ্ড বা ২৫ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড দেওয়া হবে। দুর্ঘটনায় না পড়লেও বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানোর জন্য সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড অথবা দুই লাখ টাকা জরিমানার প্রস্তাব করা হয়েছে আইনে। তা ছাড়া নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী ও বয়োজ্যেষ্ঠ যাত্রীর জন্য সংরক্ষিত আসনে অন্য কোনো যাত্রী বসলে এক মাসের কারাদণ্ড বা পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড দেওয়া হবে। পাশাপাশি মদপান করে বা নেশাজাতীয় দ্রব্য খেয়ে গাড়ি চালালে, সহকারীকে দিয়ে গাড়ি চালালে, উল্টো দিকে গাড়ি চালালে, নির্ধারিত স্থান ছাড়া অন্য স্থানে গাড়ি থামিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি, চালক ছাড়া মোটরসাইকেলে একজনের বেশি সহযাত্রী ওঠালে, মোটরসাইকেলের চালক ও সহযাত্রীর হেলমেট না থাকলে, ছাদে যাত্রী বা পণ্য বহন, সড়ক বা ফুটপাতে গাড়ি সারানোর নামে যানবাহন রেখে পথচারীদের চলাচলে বাধা সৃষ্টি, ফুটপাতের ওপর দিয়ে কোনো মোটরযান চলাচল করলে সর্বোচ্চ তিন মাস কারাদণ্ড বা ৩৫ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। তবে এখনো আইনটির বিধিমালা হয়নি। ফলে এটি কার্যকর করতে গেলে সমস্যায় পড়া লাগতে পারে। এ জন্য আইনটির দ্রুত বিধিমালা করা প্রয়োজন। তবে নতুন এ আইনটি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে এবং চালক, জনগণসহ সবাই তা মান্য করলে দেশের সড়ক-মহাসড়কে নিশ্চয় শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।

প্রতিবছর এ দেশে প্রায় সাড়ে সাত হাজার সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির এক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ঈদুল ফিতরের ছুটিতে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় কমপক্ষে ১৪২ জন নিহত ও ৩২৪ জন আহত হয়েছেন। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গত ১২ জুন জাতীয় সংসদে জানিয়েছিলেন, গত ১০ বছরে (২০০৯-২০১৯) দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ২৫ হাজার ৫২৬ জন মানুষ নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে ১৯ হাজার ৭৬৩ জন। আর বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী ১৯৯৪ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত দেশে ৭২ হাজার ৭৪৮ জন প্রাণ হারিয়েছে এবং ৫২ হাজার ৬৮৪ জন আহত হয়েছে। এ হিসাব অনুযায়ী দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিদিন গড়ে ১০ জন সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায়। দেশে প্রতিনিয়ত যেভাবে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে চলেছে তাতে মনে হয়, এ দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলো দিন দিন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হচ্ছে।

এ দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোতে নিয়মিতভাবে ঘটে চলা দুর্ঘটনা জনগণের কপালের লিখন নয় কিংবা ভাগ্যদেবীর নির্মম পরিহাস নয়। এ ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলো দায়ী তা হচ্ছে—সার্বিক যোগাযোগব্যবস্থার ধরন, চালকদের দক্ষতা, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, চালকদের ওভারটেকিং করার মানসিকতা প্রবল মাত্রায় বিদ্যমান থাকা, ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রাপ্তিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব, জনগণের সচেতনতার অভাব, ট্রাফিক আইন কিংবা রাস্তা চলাচলের নিয়ম না মানা ইত্যাদি। এক হিসাবে দেখা গেছে, সড়ক দুর্ঘটনার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান সারা বিশ্বে দ্বিতীয়। দেশে প্রতিনিয়তই সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে অনেক লোকের প্রাণহানি ঘটছে, অনেকে পঙ্গুত্ববরণ করছে, মোটা অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে; তা ছাড়া সড়ক দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে অনেক সময় ভাঙচুর ও নৈরাজ্যের ঘটনা ঘটছে। ফলে সাধারণ মানুষ কঠিন ভোগান্তি আর হয়রানির শিকার হচ্ছে, যা অস্বীকার করার উপায় নেই। দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোয় যেভাবে দুর্ঘটনা ঘটছে এবং দুর্ঘটনার সংখ্যা দিন দিন যে হারে বাড়ছে, তা অতি দ্রুত রোধ করার ব্যাপারে বাস্তবমুখী ও যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ এবং যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করতেই হবে।

সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সর্বাগ্রে চালকদের হতে হবে বেশি দক্ষ, হতে হবে সতর্ক। পাশাপাশি জনগণকেও ট্রাফিক আইন ও রাস্তা চলাচলের আইন-কানুন যথারীতি মেনে চলতে হবে। এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট কঠোরতার সঙ্গে ট্রাফিক আইনের প্রয়োগ অপরিহার্য। মাদক সেবন করে গাড়ি চালানো এবং গাড়ি চালানো অবস্থায় মোবাইল ফোনে কথা বলাসহ চালকদের ‘ওভারটেকিং’ করার মানসিকতাও পরিহার করা প্রয়োজন। তা ছাড়া সড়ক দুর্ঘটনা রোধে দেশের সার্বিক সড়কব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানোসহ চালকদের দক্ষতা বিচার করে ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়টিও নিশ্চিত করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে যেন কোনো ধরনের দুর্নীতি না ঘটে, সে বিষয়টিও সরকারের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করতে হবে। আর সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয় বাদ দিয়ে কঠোর জবাবদিহির আওতায় এনে শাস্তি প্রদানের ব্যবস্থা থাকাও আবশ্যক। পাশাপাশি সড়ক দুর্ঘটনা রোধে বিভিন্ন গণমাধ্যম, সুধীসমাজ, সরকারসহ আপামর জনগণকে একযোগে আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসতে হবে। সর্বোপরি সবাই সচেতন হলেই সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে আনা সম্ভব।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সদস্য।

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা