kalerkantho

শনিবার । ২৪ আগস্ট ২০১৯। ৯ ভাদ্র ১৪২৬। ২২ জিলহজ ১৪৪০

ডেঙ্গু প্রতিরোধে আমাদের সচেতনতা ও প্রস্তুতি

ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু

১৮ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ডেঙ্গু প্রতিরোধে আমাদের সচেতনতা ও প্রস্তুতি

বিগত কয়েক বছরের তুলনায় এ বছর রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি হিসাবে দেখা দিয়েছে। বর্তমানে ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী এ বছরের এপ্রিল মাস থেকে চলতি জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে একজন চিকিৎসকসহ ১১ জনের মারা যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। গত বছর একই সময়ে দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছিল সাতজনের।

শুধু ঢাকা শহর কিংবা বাংলাদেশ নয়, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। গণমাধ্যমে প্রকাশ, বাংলাদেশের আশপাশের শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ভারতে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ডেঙ্গুর ঘটনা ১৯৬০ সালের পর থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় ৫০ থেকে ১০০ মিলিয়ন লোক ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়। বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে দ্রুত প্রসারমাণ রোগ ডেঙ্গু নিয়ে তাই আমাদের বিশেষ সতর্কতামূলক ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজন ছিল অনেক আগে থেকেই। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, তা সেভাবে হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি বর্ষা, তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বৃদ্ধি বিভিন্ন প্রজাতির এডিস মশার প্রজনন ও বিস্তারে সহায়ক। যে বছর বেশি বৃষ্টিপাত হয়, সেই বছর এডিস মশার ঘনত্ব বাড়ে। ফলে ডেঙ্গুর প্রকোপও স্বাভাবিকভাবে বাড়ে। বৃষ্টির স্থায়িত্ব যত বাড়বে ডেঙ্গুর বিস্তারও তত বাড়বে। যেহেতু এ বছর বাংলাদেশে মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে বর্ষা দীর্ঘস্থায়ী হতে চলেছে, তাই সারা দেশে ডেঙ্গুর বিস্তারও আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে, ‘Prevention is better than cure.’ প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম। ডেঙ্গু প্রতিরোধকল্পেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষসহ আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে। প্রতিবছর বর্ষার শুরুতেই আমাদের দেশে মশা তথা ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন, যেন তা মহামারি আকারে ছড়িয়ে না পড়ে। যেহেতু এ রোগের জন্য নির্দিষ্ট কোনো ভ্যাকসিন নেই, তাই মশার সংখ্যা বৃদ্ধির অনুকূল পরিবেশ ও মশার সংখ্যা বৃদ্ধি হ্রাস করার ব্যবস্থা করা এবং মশার কামড়ের আশঙ্কা কমানোর মাধ্যমে এর প্রতিরোধ করা প্রয়োজন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এ বিষয়ে প্রচার, সামাজিক সক্রিয়তা এবং জনস্বাস্থ্য সংগঠন, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য বিভাগের মধ্যে সহযোগিতা (সরকারি ও বেসরকারি) বাড়ানোসহ পাঁচটি মৌলিক দিকনির্দেশনা দিয়েছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যেহেতু প্রতিবছরই বর্ষার সময় দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব ঘটে থাকে এবং অনেক লোক মারা যায়, তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে আমাদের আগাম প্রস্তুতি, সচেতনতা ও কার্যকারিতা থাকে কতটুকু? সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, মশা মারতে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন যে ওষুধ ব্যবহার করে, তা অকার্যকর হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) ও সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র (সিডিসি) পৃথক দুটি গবেষণায় দেখেছে, এই ওষুধে মশা মরছে না। বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ায় নিয়মিত জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ঢাকা শহরের নাগরিকরা সাধারণত মশা নিধনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়। জনগণ ও নগরবাসী চায়, সরকার নিয়মিতভাবে সব ধরনের মশা নিধনে কার্যকর ওষুধ ছিটাক। কিন্তু গবেষণার ফলাফলের মাধ্যমে জনগণ জানতে পেরেছে, মশা নিধনে সিটি করপোরেশন যে ওষুধ ছিটায়, তা অকার্যকর। আর এ বিষয়টি নাগরিকদের মধ্যে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে এবং অনেকেই এ বিষয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়াও ব্যক্ত করেছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র গণমাধ্যমকে বলেছেন, ডেঙ্গু মোকাবেলায় সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে। মশক নিধন শুরু হয়েছে, পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ মেডিক্যাল টিমের কাজ শুরু হচ্ছে। নগরবাসীকে বিনা মূল্যে ওষুধ সরবরাহ করা হবে।

তবে সবচেয়ে বড়া কথা হচ্ছে, সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি ডেঙ্গু প্রতিরোধে তথা মশা নিধনে প্রত্যেক মানুষ ও নগরবাসীর সচেতন হওয়ার কোনোই বিকল্প নেই। প্রত্যেকের বাড়ির আশপাশের ঝোপঝাড়, নালা-নর্দমা, ময়লা-আবর্জনা নিয়মিতভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এবং এডিস মশার বংশবৃদ্ধির উপযুক্ত স্থান (যেমন—কোনো পাত্রে জমে থাকা পানি ইত্যদি) নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে। এসবের পাশাপাশি সিটি করপোরেশন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে সবখানে মশা নিধন ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। বিশেষ করে, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মেয়রদ্বয় এডিস মশা তথা সব ধরনের মশা নিধন এবং মশার বংশবিস্তার রোধে নিয়মিত জোরদার ও কার্যকর অভিযান পরিচালনা করবেন—এ প্রত্যাশা নগরবাসীর। সিটি করপোরেশন এলাকার বাইরেও স্থানীয় প্রশাসন ও দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ কাজে দ্রুত তৎপর হওয়া দরকার। এ ছাড়া ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা তৈরি, ডেঙ্গুর প্রাথমিক লক্ষণগুলো সম্পর্কে মানুষকে অবগত করানো, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে করণীয় সম্পর্কে প্রচার-প্রচারণা ব্যাপকভাবে জোরদার করা প্রয়োজন। রাজধানী ও জেলা সদরের সরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু শনাক্তকরণ ও চিকিৎসায় বিশেষ ব্যবস্থা রাখার কথাও বিবেচনা করা দরকার। দেশের জনগণের স্বার্থেই ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ ও তা বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের আন্তর্জাতিক সদস্য

[email protected]

মন্তব্য