kalerkantho

সোমবার । ১৪ অক্টোবর ২০১৯। ২৯ আশ্বিন ১৪২৬। ১৪ সফর ১৪৪১       

এই সময়

বিএনপি, ঐক্যফ্রন্ট ও আগামীর রাজনীতি

তারেক শামসুর রেহমান

৯ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



বিএনপি, ঐক্যফ্রন্ট ও আগামীর রাজনীতি

বিএনপি, ঐক্যফ্রন্ট ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, এই বিষয়গুলো এখন বহুল আলোচিত। বেগম জিয়া ও তারেক রহমান মোটামুটিভাবে একাদশ জাতীয় সংসদে থাকছেন না—এটি নিশ্চিত করেই বলা যায়। বিএনপি ঐক্যফ্রন্টে যোগ দিয়েছে। কিন্তু নেতৃত্ব বিএনপির হাতে নেই। কামাল হোসেন নির্বাচন করছেন না। তাহলে ‘বিজয়ী’ হলে ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী কে হবেন? কিংবা সংসদে বিরোধী দলের নেতাই বা কে হবেন? এতে কি ঐক্যফ্রন্ট ভেঙে যাবে নির্বাচনের পর? এসব প্রশ্ন এখন উঠেছে এবং বারবার বিভিন্ন মহলে আলোচিত হচ্ছে। সাধারণত নির্বাচনের আগে যদি কোনো জোট গঠিত হয়, তাহলে জোটের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেওয়া হয় ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী কে হবেন। ঐক্যফ্রন্ট এ ধরনের ঘোষণা দেয়নি। ড. কামাল হোসেন জোটের নেতা। বয়সের কারণে তিনি নির্বাচন করছেন না। অবশ্য তিনি বলেছেন ফ্রন্ট বিজয়ী হলে তাঁরা আলোচনা করে ঠিক করবেন, তাঁদের নেতা কে হবেন। এখানে একটি শুভংকরের ফাঁকি আছে। এটি স্পষ্ট হলে ভালো হতো। তাই বিএনপির রাজনীতি নিয়ে প্রশ্ন থাকবে অনেকের।

কোন পথে এখন বিএনপি? বিএনপি কি একটি ‘সূক্ষ্ম কৌশলে’ হেরে গেল? বিএনপি কয়েকটি ছোট দলকে সঙ্গে নিয়ে একটি ঐক্যফ্রন্ট গঠন করেছে। এই ঐক্যফ্রন্টের নেতা বিএনপির কেউ নন, বরং আওয়ামী লীগের রাজনীতির মধ্য দিয়ে যাঁর জন্ম, সেই ড. কামাল হোসেন। ড. কামাল হোসেন বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের সমর্থকও নন। ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রশ্নেও তাঁর ‘অবস্থান’ বিএনপির রাজনীতির বিপরীত। এর পরও বিএনপি তাঁর ওপর ‘আস্থা’ রাখল! কিন্তু তাতে বিএনপির প্রাপ্তি কী? শুধু সংসদে যাওয়া? ২০ দলীয় জোট নিয়েও বিএনপি সংসদে যেতে পারত। এর জন্য ব্যক্তিসর্বস্ব দলগুলোর সঙ্গে ‘ঐক্য’ করার আদৌ প্রয়োজন ছিল না। এখন বিএনপিকে ‘ব্যবহার’ করে কাদের সিদ্দিকী, আ স ম আবদুর রব, মাহমুদুর রহমান মান্নার মতো ব্যক্তিরা সংসদে যাবেন। ব্যক্তি বা দল হিসেবে তাঁরা কোনো দিনই পার্লামেন্টে যেতে পারতেন না। বিএনপি তাঁদের সুযোগ করে দিল পার্লামেন্টে যাওয়ার। এতে বিএনপি লাভবান হয়েছে—এটি মনে করার কোনো কারণ নেই। বরং ‘রাজনীতিটা’ এখন চলে গেল এঁদের হাতে। অন্তত আগামী পাঁচ বছরের রাজনীতিটা এখন নিয়ন্ত্রণ করবেন এই ব্যক্তিরা। এ ক্ষেত্রে বিএনপির নেতারা মূলধারা থেকে ছিটকে পড়তে পারেন।

দ্বিতীয়ত, হাইকোর্টের সাম্প্রতিক একটি রায় (দুই বছরের বেশি যাঁদের দণ্ডাদেশ হয়েছে, তাঁরা নির্বাচন করতে পারবেন না) অন্তত একটি ইঙ্গিত দিল যে বেগম জিয়া একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারছেন না। বেগম জিয়ার তিনটি আসনে এখন বিএনপিকে নতুন প্রার্থী দিতে হচ্ছে। এটি হয়তো বিএনপির জন্য কোনো সমস্যা না। কিন্তু বিএনপির জন্য সমস্যা একটিই—বেগম জিয়ার অবর্তমানে এবং তারেক রহমানের দেশে আসতে না পারার কারণে দলকে নেতৃত্ব দেবেন কে? আপাতদৃষ্টিতে মির্জা ফখরুল নেতৃত্বের দায়িত্বটি তুলে নিয়েছেন বলে মনে হলেও দলে তাঁর সর্বজনগ্রহণযোগ্যতা আছে, এটি মনে হয় না। উপরন্তু দলে সিনিয়র নেতারাও রয়ে গেছেন। ফলে নেতৃত্বের প্রশ্নে বিএনপি সংকট কাটিয়ে উঠতে পেরেছে—এটি মনে হয় না। তৃতীয়ত, বেগম জিয়ার সাজা এবং জামিন না পাওয়ার সম্ভাবনা বিএনপির ভেতরকার দ্বন্দ্বকে আরো উসকে দিতে পারে। যা প্রত্যাশা করা হয়েছিল, তা হয়নি। বিএনপি আন্দোলন সংগঠিত করতে পারেনি। কর্মীরা একত্র থাকলেও নেতৃত্বের দুর্বলতা বারবার প্রমাণিত হয়েছে। ফলে বেগম জিয়ার মাঝে এক ধরনের ‘হতাশা’ আসতে পারে। এই হতাশা শেষ পর্যন্ত যদি বেগম জিয়াকে প্যারলে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে উদ্বুদ্ধ করে, আমি তাতে অবাক হব না। নিঃসন্দেহে বেগম জিয়া হচ্ছেন একমাত্র ব্যক্তি, যাঁকে কেন্দ্র করে বিএনপি আবর্তিত হচ্ছে। তাঁর অসুস্থতা, বয়স ইত্যাদি বিএনপিকে ঐক্যবদ্ধ রাখার ব্যাপারে একটি প্রধান অন্তরায়। একবার তিনি বিদেশে গেলে আর দেশে ফিরে আসতে পারবেন কি না, সেটি একটি বড় প্রশ্ন।

চতুর্থত, তারেক রহমান বিএনপির পরবর্তী নেতা। শহীদ জিয়ার উত্তরাধিকারী। তিনিই বিএনপির কাণ্ডারি। কিন্তু তিনিও দণ্ডপ্রাপ্ত এবং দেশে ফিরে এসে তাঁর দলের নেতৃত্ব দেওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। লন্ডন থেকে এখনো দলকে চালাচ্ছেন বটে; কিন্তু তাঁর এই ‘নেতৃত্ব’ নিয়েও প্রশ্ন আছে। ফলে গভীর এক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বিএনপি। আগামী পাঁচ বছর দলটির অবস্থা কী হবে বলা কঠিন।

দেশে নির্বাচন হচ্ছে। নির্বাচনটি সুষ্ঠু হবে কি না বলা কঠিন। বিদেশি পর্যবেক্ষকরা আসছেন না। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন আছে। প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা বিতর্কিত। নির্বাচন নিয়ে দুই দল এখন ‘বিতর্ক’ করছে। ওবায়দুল কাদের বলেছেন, নির্বাচন বানচালে বিএনপি নানা অজুহাত তুলছে। আর মির্জা ফখরুলের বক্তব্য, আওয়ামী লীগ ৩০টির বেশি আসনে জিতবে না। আর ব্রিটেনের হাউস অব কমনসের একটি প্রতিবেদনও সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে—তাতে বলা হয়েছে, দাবি পূরণ ছাড়া বিএনপির ভোটে আসা ছিল অপ্রত্যাশিত। ওই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, বাংলাদেশের নির্বাচন পরিস্থিতি সবার সমান সুযোগ সৃষ্টি বা ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’-এর ধারেকাছেও নেই। অন্যদিকে মার্কিন কংগ্রেসে জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরকে দেশের স্থিতিশীলতা ও ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রের জন্য চলমান হুমকি উল্লেখ করে বাংলাদেশ সরকারকে তাদের রুখে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে একটি বিল উত্থাপন করা হয়েছে। নির্বাচনের আগে এ ধরনের সংবাদ আমাদের আশাবাদী করে না।

একটি সুষুম নির্বাচন সবাই চায়। এখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে নির্বাচন পর্যবেক্ষণে কোনো প্রতিনিধি দল আসছে না। বিদেশি পর্যবেক্ষকদের অনুপস্থিতিতে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কি না বলা মুশকিল। তবে এটি ঠিক এই নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। দলবদলের নানা কাহিনি সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে। আজীবন বিএনপির রাজনীতির যাঁরা বিরোধিতা করলেন, তাঁদের কারো কারো বিএনপিতে যোগদান ও মনোনয়ন পাওয়া নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিএনপি বিপদেই আছে। শীর্ষস্থানীয় অনেক নেতাই নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষিত হতে পারেন। অনেকের নামেই মামলা আছে। এসব কারণে প্রাথমিক বাছাইয়ে অনেকে বাদ পড়তে পারেন। যে কারণে অনেক আসনেই বিএনপি দুজন প্রার্থী দিয়েছে। এটি ঠিক আছে। এর ফলে পার্লামেন্টে বিএনপির পক্ষ থেকে অনেক ‘নয়া মুখ’ দেখব আমরা এবার। নির্বাচন বিএনপির নেতাকর্মীদের কিছুটা একত্র করতে পেরেছে—এটি অস্বীকার করা যাবে না। মনোনয়নপত্র নেওয়া ও জমা দেওয়ার জন্য বিএনপির অফিসে যে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীর উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে, তাতে এটিই প্রমাণ করে বিএনপির প্রতি সাধারণ মানুষের ভালোবাসা এখনো আছে। মামলা-মোকদ্দমার পরও বিএনপির কর্মীরা ভেঙে পড়েনি। এখন সংগঠনকে শক্তিশালী করতে হলে দলকে ঢেলে সাজাতে হবে। স্থায়ী পরিষদে যোগ্য ও তরুণ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ছাত্রদল ও যুবদলকে সংগঠিত করতে হবে। শুধু ঢাকা তথা নয়াপল্টনকেন্দ্রিক রাজনীতি পরিত্যাগ করতে হবে। প্রতিদিন প্রেস ব্রিফিং করার রাজনীতি দিয়ে জনগণকে সংগঠিত করা যাবে না। এ জন্য গ্রামে গ্রামে যেতে হবে। সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে বিএনপির বার্তা। এই কাজ রাষ্ট্রপতি জিয়া করতেন। এ জন্যই তিনি গ্রহণযোগ্য একজন নেতায় পরিণত হয়েছিলেন। ঐক্যফ্রন্ট একটি নির্বাচনী জোট, কোনো রাজনৈতিক জোট নয়। বিএনপির সঙ্গে অন্য দলগুলোর রাজনৈতিক মতপার্থক্য আছে। বঙ্গবন্ধুকে জোটভুক্ত অন্যান্য দল যেভাবে মূল্যায়ন করে, বিএনপি সেভাবে করে না। ফলে আগামী দিনে বিএনপির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় সেদিকে দৃষ্টি থাকবে অনেকের।

তবু বাস্তবতা হচ্ছে বিএনপি বড় দল। জনগণের একটি বড় অংশের সমর্থন রয়েছে এই দলের পেছনে। আর আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের রাজনীতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে ‘উৎখাত’ করা যাবে না। আওয়ামী লীগের ব্যাপক জনসমর্থন এ কথাই প্রমাণ করে। সুতরাং দেশে সুষুম গণতন্ত্র চর্চার জন্য এই দুটি বড় দলের মাঝে আস্থার সম্পর্ক থাকা জরুরি। এই ‘সম্পর্ক’ শুধু গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকেই শক্তিশালী করবে না, বরং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে দুই দলের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক থাকাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দেশে বাম্পার ফলন হয়েছে। ফলে জিডিপির প্রাক্কলিত প্রবৃদ্ধি ৭.৮৬ শতাংশ ধরে রাখা সম্ভব হবে।

তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হিসাব ঘাটতির কারণে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যেতে পারে! নির্বাচনের পর যদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হয়, তাহলে তা অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে। এমনিতেই বিশ্ব অর্থনীতি একটি বড় ধরনের সংকটে আছে। চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ‘বাণিজ্য যুদ্ধে’ শুধু এই দুটি দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, বরং বাংলাদেশের মতো দেশও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সুতরাং আওয়ামী লীগ ও ঐক্যফ্রন্ট উভয়কেই বিষয়টি ভেবে দেখা জরুরি। এ জন্যই নির্বাচনটি সুষুম ও গ্রহণযোগ্য হওয়া জরুরি। বিএনপি নয়, বরং ঐক্যফ্রন্টই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকায় আবির্ভূত হতে যাচ্ছে।

আমরা চাই ঐক্যফ্রন্ট তার ‘নেতা’ নির্বাচন করুক, যিনি সংসদে বিরোধী দলের নেতার ভূমিকা পালন করবেন অথবা ‘বিজয়ী’ হলে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করবেন। ঐক্যফ্রন্ট সুস্পষ্ট ঘোষণা দিক তারা বাংলাদেশকে আগামী পাঁচ বছর কিভাবে দেখতে চায়। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন চলমান বিদ্বেষপূর্ণ রাজনীতিকে কতটুকু বদলে দিতে পারবে, সেটিই হচ্ছে দেখার বিষয়।

নিউ ইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র

লেখক : অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা