৩০. স্মরণ করো, কাফিররা তোমাকে বন্দি বা হত্যা করার জন্য কিংবা নির্বাসিত করার চক্রান্ত করে। তারা চক্রান্ত করে; আল্লাহও কৌশল অবলম্বন করেন। আর আল্লাহ শ্রেষ্ঠতম কৌশলী। (সুরা আনফাল, আয়াত : ৩০) তাফসির : এ আয়াতে হিজরতের প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয়েছে। এখানে অতি সংক্ষেপে এ প্রশ্নের জবাব দেওয়া হয়েছে যে মহানবী (সা.) কেন নিজ মাতৃভূমি ত্যাগ করে মদিনায় গিয়েছেন। মক্কার কাফিররা মুসলমান ও মুসলমানদের নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে সামাজিকভাবে বয়কট করাসহ সব ধরনের নির্যাতন-নিপীড়ন করে ইসলামের আওয়াজ স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছিল। অঙ্কুরেই ইসলাম নামের বৃক্ষকে উপড়ে ফেলতে চেয়েছিল। হাতে গোনা যে কয়জন সাহাবি ইমান এনেছিলেন, তাঁরা কেউই কাফিরদের নির্যাতন-নিপীড়ন থেকে রেহাই পাননি। কোনো কোনো সাহাবি দৈহিকভাবে এমন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন যে ইতিহাসে এর নজির খুঁজে পাওয়া যায় না। কখনো ফুটন্ত গরম পানি ঢেলে দিয়ে কখনো বা প্রচণ্ড উত্তপ্ত মরুভূমির পাথর-বালিতে টানাহেঁচড়া করে সাহাবিদের তারা অতিষ্ঠ করে তোলে। নির্যাতন-নিপীড়নের মাত্রা দিন দিন চরম থেকে চরমতর হচ্ছিল। দৈহিক, মানসিক ও সামাজিকভাবে নির্যাতিত হয়েছেন খোদ মহানবী (সা.)। একপর্যায়ে মক্কার কাফিররা এই মহামানবকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। নতুনভাবে ষড়যন্ত্রের জাল বোনে। মহানবী (সা.)-কে নিয়ে দারুন নদওয়ায় বৈঠক জাতীয় সমস্যাবলি সম্পর্কে চিন্তাভাবনা ও শলাপরামর্শ করার জন্য 'দারুন নদওয়া' নামে মক্কার কাফিরদের একটি জায়গা নির্দিষ্ট ছিল। সেখানে প্রত্যেক গোত্রের প্রধান ব্যক্তিরা জমায়েত হতো। শীর্ষস্থানীয় কাফিররা তাদের 'দারুন নদওয়া' বা 'মন্ত্রণাগৃহে' ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত কর্মকৌশল ঠিক করতে পরামর্শসভার আয়োজন করে। কেউ কেউ পরামর্শ দিল : 'মুহাম্মদ (সা.)-কে শৃঙ্খলিত করে কোনো ঘরের মধ্যে বন্দি করে রাখা উচিত।' কিন্তু অন্যরা মত প্রকাশ করল যে মুহাম্মদ (সা.)-এর সঙ্গী-সাথিরা হয়তো আমাদের কাছ থেকে তাঁকে ছিনিয়ে নিয়ে যাবে এবং এর ফলে আমাদের পরাজয়ও ঘটতে পারে। তাই ওই পরামর্শ প্রত্যাখ্যান করা হলো। কেউ কেউ আবার পরামর্শ দিল : 'তাঁকে নির্বাসিত করা উচিত।' কিন্তু তিনি যেখানে যাবেন, সেখানেই তাঁর অনুগামী বাড়তে থাকবে এবং তাঁর আন্দোলনও যথারীতি সামনে অগ্রসর হবে- এ আশঙ্কায় ওই পরামর্শও নাকচ করা হলো। অবশেষে আবু জাহেল পরামর্শ দিল : 'প্রত্যেক গোত্র থেকে একজন করে যুবক মনোনীত করা হবে; তারা সবাই একসঙ্গে রাসুল (সা.)-এর ওপর হামলা করবে এবং তাঁকে হত্যা করে ফেলবে। এর ফলে তাঁর রক্তপণ সব গোত্রের মধ্যে বিভক্ত হয়ে যাবে। আর সবার সঙ্গে একাকী লড়াই করা হাশিমি গোত্রের পক্ষে কিছুতেই সম্ভব হবে না।' এ অভিমতটি সবাই পছন্দ করল এবং শেষ পর্যন্ত এ কাজের জন্য একটি রাতও নির্দিষ্ট করা হলো। কিন্তু তাদের সব পরিকল্পনা আল্লাহ নস্যাৎ করে দেন। রাতেই আল্লাহ তাআলা ওহির মাধ্যমে এই চক্রান্তের কথা তাঁর রাসুলকে জানিয়ে দিলেন। হিজরতের নির্দেশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজ বাড়িতে আপন চাচাতো ভাই হজরত আলী (রা.)-কে নিজ বিছানায় রেখে আবু বকর (রা.)-কে সঙ্গে নিয়ে মহানবী (সা.) মদিনার পথে রওনা হন। রওনা হওয়ার মুহূর্তে বাইতুল্লাহর দিকে করুণ দৃষ্টি ফেলে নবীজি বললেন, 'হে মক্কা! খোদার কসম, তুমি আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় শহর, আমার প্রতিপালকের কাছেও বেশি পছন্দের শহর তুমি। যদি তোমার অধিবাসীরা আমাকে বের করে না দিত, আমি কখনো বের হতাম না।' (তিরমিজি : ৩৯২৫) হিজরতের এই ঐশী হুকুম ও মহান ইবাদত পালনের মধ্য দিয়ে পদে পদে নেমে আসে আল্লাহর গায়েবি মদদ। হিজরত ইসলাম, মুসলমান ও মুসলমানদের নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনে 'টার্নিং পয়েন্ট'। হিজরতের পর মুসলমানদের অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। ইসলামের আলো ছড়িয়ে পড়তে থাকে দিগ-দিগন্তে। (তাফসিরে মা'আরেফুল কোরআন ও ইবনে কাছির অবলম্বনে)