kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২ । ১৪ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

শিক্ষা

রত্নার পাঠে আলোর পথে

জে এম রউফ, বগুড়া   

২০ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



রত্নার পাঠে আলোর পথে

বগুড়া সদর উপজেলার হাপুনিয়া গ্রামে নিজ উদ্যোগে শিশুদের পড়াচ্ছেন রত্না দেবনাথ। ছবি : কালের কণ্ঠ

নিজের লোক বলতে তেমন কেউ নেই রত্না দেবনাথের। বিয়ের এক বছরের মধ্যে মারা যান স্বামী। শ্বশুরকে চোখেই দেখেননি। বিয়ের ছয় বছরের মধ্যে মারা যান শাশুড়িও।

বিজ্ঞাপন

একা রত্না দেবনাথের তাই আপনজন একদল শিশু। যাদের তিনি অক্ষরজ্ঞান দেন; লিখতে-পড়তে শিখলে ভর্তি করেন স্থানীয় বিদ্যালয়ে। আবার নতুনদের জোগাড় করে পড়াতে শুরু করেন। স্কুলে পড়া শিক্ষার্থীরাও বাড়ি ফিরে পড়তে যায় তাঁর কাছে।

বগুড়া সদর উপজেলার এরুলিয়া ইউনিয়নের ঘোলাগাড়িতে তাঁর বসবাস হলেও তিনি শিশুদের পড়াতে যান তিন কিলোমিটার দূরে হাপুনিয়া গ্রামে। ১৯৯৭ সাল থেকে তিনি ওই গ্রামের শিশুদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন।

বগুড়া শহর থেকে আট কিলোমিটার দূরে হাপুনিয়া গ্রাম। ওই গ্রামের এক বাঁশঝাড়ের নিচে একটি কক্ষে সকাল ৯টা থেকে দুপুর পর্যন্ত চলে রত্না দেবনাথের পাঠদান। একসময় গ্রামের পাশে ছিল ব্র্যাক স্কুল নামে উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম। সেখানেই মূলত শিক্ষক ছিলেন রত্না দেবনাথ। ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে চলত সেই বিদ্যালয়। কিন্তু ২০১৯ সালে ব্র্যাক এই কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করে। এরপর তিনি কর্মহীন হয়ে পড়েন। অনেকটা নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন। এ কারণে গ্রামের শিশুদের পাঠদানের সিদ্ধান্ত নেন তিনি। ঘুরে ঘুরে শিশু জোগাড় করেন। কিন্তু পাঠদানের জায়গা ছিল না। আগে যে কক্ষে ব্র্যাক স্কুল পরিচালিত হতো, সেটির জন্য আলাদা ভাড়া দেওয়া হতো। কিন্তু এখন সেখানে বিনা ভাড়ায় পড়ানো সম্ভব নয়। ওই ঘরের মালিকও এতে সম্মত নয়। সে সময় পাড়ার ভেতরেই একটি কক্ষের ব্যবস্থা করেন শিশুদের অভিভাবকরা। সজল প্রামানিক নামের ওই ঘরের মালিককে বুঝিয়ে বিদ্যুৎ বিল আর মাস শেষে ৩০০ টাকা করে দিতে চান সবাই মিলে। এতে রাজি হয়ে যান ঘরের মালিক। সেখানেই শুরু হয় রত্নার নতুন পাঠদান কার্যক্রম। এখন সেখানে শিশু পাঠ বিভাগে (বর্ণ পরিচয়) ১৮ জন এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত আরো ১০ জন শিক্ষার্থী নিয়মিত পড়ে।

রত্না দেবনাথ জানান, ১৯৯৭ সালে যখন তাঁর বিয়ে হয় তার কিছুদিন পরেই অসুস্থ হয়ে পড়েন তাঁর স্বামী। অনেকটা বাধ্য হয়েই অর্থসংকট মেটাতে এইচএসসি পাস রত্না বেছে নেন ব্র্যাক স্কুলের শিক্ষকতা। বিয়ের এক বছরের মাথায় স্বামী মারা যান। এরপর তিনি ও তাঁর শাশুড়ি মিলে ওই বেতনের টাকা দিয়েই সংসারের ব্যয় নির্বাহ করতেন। এরপর যখন তাঁর শাশুড়ি মারা যান, তখন একা রত্নার জন্য অর্থসংকটের চেয়ে বড় হয়ে দেখা দেয় স্বজনসংকট। স্বামীর চারজন বড় ভাই থাকলেও তাঁরা পৃথক। এ কারণে তিনি ব্র্যাক স্কুলের ছেলেমেয়েদের নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন। এলাকায় দীর্ঘ ২২ বছর ব্র্যাক স্কুলে শিক্ষকতা করায় এলাকার লোকজনেরও প্রিয় ছিলেন তিনি। এ কারণে বিদ্যালয় বন্ধ হলেও এলাকাবাসী চাচ্ছিল তিনি সেখানেই ছোট ছেলেমেয়েদের শিক্ষার দায়িত্বটা যাতে নেন। তিনি বলেন, এখানে যাতায়াত করতে তাঁর মাসে প্রায় ৬০০ টাকা খরচ হয়। যেসব শিশু তাঁর কাছে পড়ে তাদের বেশির ভাগের অভিভাবকই শ্রমিক ও মজুর। ফলে তাদের পরিবার থেকে যে কোনো সহযোগিতা তিনি পাবেন এমন আশা নেই। বরং অন্য অভিভাবকরা মাস শেষে যদি তাঁকে কিছু টাকা দেন সেই টাকায় অসচ্ছল পরিবারের শিশুদের বই কিনে দেন তিনি। ঘরে বসার জন্য মাদুর কিনেছেন সেই টাকা থেকেই। তিনি বলেন, ‘আমি বিধবা মানুষ, একটু আলো চালের ভাত হলেই আমার চলে যায়। টাকা-পয়সার তো তেমন কোনো দরকারও নেই। বাচ্চাদের মাঝে থাকতে পারি এটাই আমার বড় পাওয়া। ’

জানতে চাইলে রুমি বেগম নামের এক অভিভাবক বলেন, ‘তিন-চার ঘণ্টা বাচ্চাদের নিয়ে কারো কোনো টেনশন নেই। নিজের সন্তানকেও হয়তো এত যত্ন করে কেউ পড়াবে না। ’

আরেক অভিভাবক লাবনী আক্তার বলেন, ‘শুধু যে বর্ণ পরিচয় শেখান তা নয়, কিভাবে কথা বলতে হয়; কিভাবে নিজের পরিচয় দিতে হয় সবই শেখান তিনি। এ কারণে গ্রামের সব মানুষই তাঁর ওপর সন্তুষ্ট। তিনি এই গ্রামের মানুষ না, কিন্তু সবাই তাঁকে নিজের মানুষ মনে করে। ’

রত্না দেবনাথ বলেন, ‘এমন অনেককে আমি ব্র্যাক স্কুলে পড়িয়েছি যারা সেখান থেকে স্কুলে ভর্তি হয়ে লেখাপড়া শেষ করে এখন স্বাবলম্বী। সেসব ছেলেমেয়েকে দেখলে অনেক ভালো লাগে। যে কটা দিন বাঁচি এই বাচ্চাদের মাঝেই যেন থাকতে পারি এটাই আমার চাওয়া। ’

বগুড়া জেলা উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর সহকারী পরিচালক এ এইচ এম রবিউল করিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, রত্না দেবনাথ যে কাজটি করছেন সেটি অত্যন্ত মহৎ উদ্যোগ। শিশুদের প্রাক-প্রাথমিকের শিক্ষা দেওয়া খুবই কষ্টকর। অথচ তিনি নিরলসভাবে সেটি করছেন। ভবিষ্যতে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা প্রকল্পের কোনো কেন্দ্র চালু করা হলে তাঁকে সেখানে সম্পৃক্ত করে ওই এলাকায় উপানুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করা হবে। সেটি করা গেলে কিছুটা হলেও তিনি আর্থিক সহযোগিতা পাবেন।



সাতদিনের সেরা