kalerkantho

বুধবার । ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ । ১৩ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

প্যাঁচা

হারাতে বসা নিরীহ পাখি

গৌরাঙ্গ নন্দী, খুলনা   

১৪ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



হারাতে বসা নিরীহ পাখি

সুন্দরবনসংলগ্ন গ্রামে সম্প্রতি দেখা মেলে এই প্যাঁচাটির। ছবি : সুচন্দা অধিকারী

স্বভাবে নিরীহ ও লাজুক ধরনের হয়েও প্যাঁচা সম্ভবত তার কিছুটা অদ্ভুত দর্শন চেহারা আর কণ্ঠস্বরের জন্যই সে অর্থে লোকের পছন্দের পাখি নয়। যদিও ইঁদুর মেরে ধান রক্ষার জন্য ঐতিহ্যগতভাবে পাখিটি আবহমান বাংলার কৃষকের বন্ধু হিসেবেই পরিচিত ছিল। আবার সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে এক ধরনের প্যাঁচা প্রিয়। কারণ ধন-সম্পদের দেবী লক্ষ্মীর বাহন হিসেবে প্যাঁচার পরিচিতি রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

পাখিবিদ আর কৃষিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দীর্ঘ প্রচারের পরও কালের প্রবাহে প্যাঁচার এই অবদান বা ভূমিকা একালে কতজনের জানা তা গবেষণার বিষয়। অথচ প্যাঁচা সম্পর্কে সচেতনতার একটি দিবসও আছে। দিনটি ছিল গত ৪ আগস্ট।

প্যাঁচা (বিকল্প বানান পেঁচা) নিশাচর শিকারি পাখি। সূর্যের আলো এরা সহ্য করতে পারে না। তাই সূর্যাস্তের সময় বা পরে এরা গাছের পাতার আড়াল থেকে বেরিয়ে শিকার খোঁজে।  

বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্যাঁচা দেখতে পাওয়া যায়। সুন্দরবনেও প্যাঁচা পাওয়া যায়। তবে সংখ্যায় পাখিটি কমে যাচ্ছে। শিকারি হলেও এজাতীয় অন্য সব পাখির মতো প্যাঁচা হিংস্র নয়। বিশ্বে স্ট্রিজিফর্মিস বর্গভুক্ত এই পাখিটির এখন পর্যন্ত প্রায় ২০০টি প্রজাতি টিকে আছে।

বেশির ভাগ প্যাঁচা ইঁদুরের মতো ছোট ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং কীটপতঙ্গ শিকার করে। কয়েকটি প্রজাতি মাছও ধরে। প্যাঁচা ওপর থেকে ছোঁ মেরে শিকার ধরতে অভ্যস্ত। প্যাঁচার মাথা বড়, মুখমণ্ডল চ্যাপ্টা এবং মানুষের মতো মাথার সামনের দিকে চোখ। প্যাঁচার চোখের চারদিকে সাধারণত বৃত্তাকারে পালক সাজানো থাকে। তবে প্যাঁচার দৃষ্টি দূরবদ্ধ থাকায় এরা চোখের কয়েক ইঞ্চির মধ্যে অবস্থিত কোনো বস্তু পরিষ্কারভাবে দেখতে পারে না। প্যাঁচা তার মাথাকে একদিকে পুরো ১৩৫ ডিগ্রি কোণে ঘোরাতে পারে। তাই দুই দিক মিলে এদের দৃষ্টিসীমা ২৭০ ডিগ্রি। ফলে এরা নিজের কাঁধের ওপর দিয়ে পেছনের অনেকটাই দেখতে পায়। পাখিটার শ্রবণশক্তিও খুব প্রখর।

বাংলাদেশে ২৭ প্রজাতির প্যাঁচা পাওয়া যায়, যার মধ্যে ২৫টি স্থায়ী এবং দুটি পরিযায়ী। প্যাঁচা মূলত নিঃসঙ্গভাবে বসবাস করে। এরা গাছের কোটর, পাহাড় বা পাথরের গর্ত বা পুরনো দালানে থাকে। হলদে-বাদামি হুতুম হচ্ছে প্যাঁচার একটি প্রজাতি। সুন্দরবন ছাড়া দেশের আর কোথাও এটি দেখতে পাওয়া যায় না। এই প্যাঁচা একাকী কিংবা জোড়ায় খাদ্যের সন্ধানে বের হয়। পাখি হিসেবে দেখতে কিছুটা ভীতিকর। এদের ইংরেজি নাম : ‘বাফি ফিস আউল’। ‘মেটে মেছোপ্যাঁচা’ নামেও পরিচিত পাখিটি।

প্যাঁচার অদ্ভুত কণ্ঠস্বর, অবয়ব এবং নিশাচর স্বভাব একে নানা কুসংস্কার এবং অলৌকিক চিন্তার সঙ্গে যুক্ত করেছে। আফ্রিকার কিকুয়ু উপজাতিগোষ্ঠী বিশ্বাস করে, প্যাঁচা মৃত্যুর আগমনের বার্তাবাহী। ধরে নিতে হবে কেউ প্যাঁচা দেখলে কিংবা তার ডাক শুনলে সে শিগগিরই মারা যাবে। বিশ্বের অনেক সমাজেই প্রচলিত বিশ্বাসবোধে প্যাঁচাকে মন্দভাগ্য, শারীরিক অসুস্থতা অথবা মৃত্যুর প্রতিচ্ছবি হিসেবে ভাবা হয়।

আমাদের দেশে আবহমানকাল ধরে প্যাঁচাকে কৃষক ও গৃহস্থের বন্ধু ভাবা হতো। ইঁদুর এবং ক্ষতিকর পোকা খেয়ে কৃষির উপকার তথা বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষা করে এরা। নিরীহ এই পাখিটিকে অশুভ ভাবা নেহাতই কুসংস্কার। নির্বিচারে বৃক্ষ উজাড়, কৃষি জমিতে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক প্রয়োগ, অশুভ পাখি বলে মেরে ফেলাসহ বিভিন্ন কারণে প্রকৃতি থেকে প্যাঁচার সংখ্যা কমছে। রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ নিঃসন্দেহে প্যাঁচা ছাড়া বাংলার কথা ভাবতে পারতেন না। তাঁর কবিতায় শুভ ও সুন্দরের প্রতীকরূপে বারবার আবির্ভূত হয়েছে প্যাঁচা—‘এই পৃথিবীতে এক স্থান আছে,/সবচেয়ে সুন্দর করুণ;/সে স্থানে লক্ষ্মীপ্যাঁচা/ধানের গন্ধের মতো অস্পষ্ট তরুণ’।



সাতদিনের সেরা