kalerkantho

শনিবার । ১ অক্টোবর ২০২২ । ১৬ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

প্রত্নতত্ত্ব

মাটির নিচে আস্ত এক শহর

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১৩ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মাটির নিচে আস্ত এক শহর

ওপরে পাহাড় (বাঁয়ে) ও ভূগর্ভস্থ শহরের একটি বাসার কক্ষের দৃশ্য। ছবি : সংগৃহীত

ক্যাপাডোসিয়ার লাভ ভ্যালিতে যখন-তখন বয়ে যায় দমকা বাতাস। ঘূর্ণি বাতাসে উড়ে বেড়ায় আলগা মাটির গুঁড়া। চারদিকজুড়ে ক্ষতের মতো গভীর লালচে গিরিখাত। আর তার চারপাশ ঘিরে গোলাপি-হলদে আভার ঢেউ খেলানো পাহাড়শ্রেণি।

বিজ্ঞাপন

দূরে দেখা যায় সারি সারি চিমনির মতো বিচিত্র দর্শন পাথুরে কাঠামো। চরম শুকনা, উত্তপ্ত, ঝোড়ো হাওয়াময় হলেও একই সঙ্গে ভয়ংকর সুন্দর এক দৃশ্যপট।

হাজার বছর আগে এই অস্থির, আগ্নেয়গিরির পরিবেশ প্রাকৃতিকভাবে এই শঙ্কু আকৃতির ভাস্করগুলো গড়ে তুলেছিল। তুরস্কের মধ্যাঞ্চলের এই স্থানটি পাহাড়ি এলাকায় হাঁটা বা হটএয়ার বেলুনে চড়তে আগ্রহীসহ লাখো পর্যটককে টানে প্রতিবছর।

তবে ক্যাপাডোসিয়ার ওপরের ভাঙাচোরা পৃষ্ঠের নিচে রয়েছে আরো বড় এক বিস্ময়। বহু শতাব্দী ধরে যা লুকিয়ে ছিল লোকচক্ষুর অন্তরালে। আর তা হচ্ছে আস্ত এক ভূগর্ভস্থ শহর। সেখানে এককালে ২০ হাজার মানুষের আবাস ছিল।

এলেংগুবু নামের ওই প্রাচীন শহর (যা আজ দেরিংকুউ নামে পরিচিত) গড়ে উঠেছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে ৮৫ মিটারেরও বেশি নিচে। এর মধ্যে রয়েছে ১৮ স্তরের সুড়ঙ্গ। মাটি খুঁড়ে বের করা বিশ্বের বৃহত্তম ভূগর্ভস্থ শহর এটি। হাজার হাজার বছর ধরে প্রায় টানা জনবসতি ছিল এই শহরে। যুগে যুগে ফ্রিজিয়ান থেকে পারসিয়ান এবং তা থেকে বাইজান্টাইন যুগের খ্রিস্টানদের হাতে এসেছিল শহরটি।

শেষ পর্যায়ে বিশের দশকে ক্যাপাডোসিয়ান গ্রিকরা শহরটি পরিত্যাগ করে। গ্রিস-তুরস্ক যুদ্ধের সময় পরাজয়ের মুখে হঠাৎ করে তারা পিঠটান দিয়ে গ্রিসে চলে যায়।

এ শহরের গুহার মতো কক্ষগুলো শুধু যে কয়েক শ মাইল পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে তাই নয়, মনে করা হয় এই অঞ্চলে আবিষ্কৃত আরো ২০০টিরও বেশি ছোট, পৃথক ভূগর্ভস্থ শহরও সম্ভবত এর সঙ্গে যুক্ত। বিষয়টি মাটির নিচে একটি অতিবিশাল কাঠামোর নেটওয়ার্কের ইঙ্গিত দেয়।

স্থানীয় গাইড সুলেমানের মতে, ১৯৬৩ সালে এক স্থানীয় লোক তাঁর হারানো মুরগি খুঁজতে গিয়ে আবিষ্কার করেন অমূল্য এই ভূগর্ভস্থ সম্পদ। লোকটি তাঁর বাড়ির সংস্কার করছিলেন। দেখা গেল মাটিতে একটি ফাটলের মতো জায়গা দিয়ে বাড়ির মুরগিগুলো বেরিয়ে যায়। তাদের আর ফিরে পাওয়া যেত না। ভালো করে সুলুকসন্ধান আর কিছু খননের পরে পাওয়া গেল এক অন্ধকার পথের খোঁজ। এটিই ছিল দেরিংকুউ শহরে প্রবেশের ৬০০টিরও বেশি ফটকের মধ্যে প্রথমটি। এলাকার বাড়িগুলোর নিচে সন্ধান মেলে এগুলোর। এর পরপরই শুরু হয় ব্যাপক খননকাজ। বের হয়ে আসে ভূগর্ভস্থ বাসস্থান, শুকনা খাদ্যের গুদাম, গবাদি পশুর আস্তাবল, স্কুল, মদ তৈরির কারখানা এমনকি একটি প্রার্থনা ঘরের জটিল এক নেটওয়ার্ক। এককথায়, নিরাপদে মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা পুরো এক সভ্যতা। ১৯৮৫ সালে এলাকাটি ইউনেসকো বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় যুক্ত হয়।

এলেংগুবু  ওরফে দেরিংকুউ শহর নির্মাণের সঠিক তারিখটি নিয়ে বিতর্ক রয়ে গেছে। তবে প্রায় ৩৭০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এথেন্সের জেনোফোনের লেখা অ্যানাবাসিসে এরই উল্লেখ করা হয়েছে বলে মনে করা হয়। এটাই এলেংগুবু শহরের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এমন প্রাচীনতম লিখিত ভাষ্য। বইটিতে জেনোফোন ক্যাপাডোসিয়া অঞ্চলে বা তার কাছাকাছি জায়গায় বাস করা আনাতোলিয়ান লোকদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তারা ওই অঞ্চলে সুপরিচিত বেশি জনপ্রিয় পাহাড়চূড়ার ধারের গুহা-আবাসের পরিবর্তে ভূগর্ভে নির্মিত বাড়িতে বসবাস করত।

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা স্টেট ইউনিভার্সিটির ক্লাসিক্যাল স্টাডিজের সহযোগী অধ্যাপক এন্ড্রিয়া ডি গিওর্গির মতে, মাটির স্তরে পানির অভাব এবং এর নমনীয়, সহজে আকার দেওয়ার উপযোগী পাথরের কারণে ক্যাপাডোসিয়া এই ধরনের ভূগর্ভস্থ নির্মাণের জন্য অনন্য। এ অঞ্চলের মাটি ভূগর্ভে খনন করে এ ধরনের কাঠামো তৈরির জন্য সহায়ক।

তবে দেরিংকুউ শহরটি সৃষ্টির কৃতিত্ব কাকে দেওয়া যায় তা আংশিকভাবে রহস্যই হয়ে রয়ে গেছে। ভূগর্ভস্থ গুহাগুলোর বিস্তৃত কাঠামোর প্রাথমিক কাজের কৃতিত্ব অনেক সময় হিট্টাইটদের দেওয়া হয়। ভূমধ্যসাগরীয় গুহা আবাস বিশেষজ্ঞ এ বার্তিনির মতে, সম্ভবত তারা কয়েকস্তর কাজ করার পর ১২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে ফ্রিজিয়ানদের আক্রমণের শিকার হয়। দেরিংকুউ শহরের ভেতরে হিট্টাইট প্রত্নসামগ্রী পাওয়া যাওয়ায় এই তত্ত্ব কিছুটা জোরদারও হয়েছে। সূত্র : বিবিসি

 



সাতদিনের সেরা