kalerkantho

রবিবার । ১৪ আগস্ট ২০২২ । ৩০ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১৫ মহররম ১৪৪৪

জীবনযাত্রা

জমজমাট নৌকার হাট

ইয়াহইয়া ফজল, সিলেট   

৩০ জুন, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



জমজমাট নৌকার হাট

সিলেটের সালুটিকরে নৌকার হাটে বিক্রির জন্য এসব নৌকা বেঁধে রাখা হয়েছে। ছবি : কালের কণ্ঠ

এবার সিলেটের বন্যায় নৌকার জন্য একরকম হাহাকার পড়ে গিয়েছিল। এখন বন্যার পানি কমছে। তবে কমার গতি ধীর। অনেকের ভিটা থেকে পানি নামলেও আশপাশ জলমগ্ন।

বিজ্ঞাপন

বন্যাকবলিত উপজেলাগুলোতে তাই এখনো চলাফেরার প্রধান বাহন নৌকা। নৌকার হাটও তাই জমজমাট।

ক্রেতাদের অভিযোগ, নৌকার বাড়তি চাহিদার সুযোগে অতিরিক্ত দাম চাইছেন বিক্রেতারা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তিন গুণের বেশি। মঙ্গলবার সিলেট-কোম্পানীগঞ্জ মহাসড়কের সালুটিকর এলাকায় রাস্তার পাশে নৌকার হাটে গিয়ে এমন চিত্র দেখা গেছে।

বর্ষা মৌসুমে প্রতি শনি ও মঙ্গলবার সালুটিকরে বসে নৌকার হাট। অনেক দিনের পুরনো বাজার এটি। যুগ যুগ ধরে এখানে হাট বসে। কাছে-দূরের ব্যবসায়ীরা নৌকা তৈরি করে এই হাটে নিয়ে আসেন। দূর-দূরান্ত থেকে অনেকে আসেন পছন্দমতো নৌকা কিনতে। সাধারণ ছোট আকারের এসব নৌকাকে স্থানীয়রা ‘খাড়ি নৌকা’ বলে। মাছ ধরা, ঘাস কাটার কাজে লাগে খাড়ি নৌকা। বর্ষা মৌসুমে এবাড়ি-ওবাড়ি যেতে মা-ঝিয়েরাও এটি ব্যবহার করে। শিক্ষার্থীদের স্কুল-মাদরাসায় যেতে প্রয়োজন পড়ে নৌকার। আবার বাড়ির পুরুষরা বাজারে বা বাড়ির আশপাশে যাতায়াতে ব্যবহার করে এসব নৌকা।

গত মঙ্গলবার দুপুরে নৌকার হাটে গিয়ে দেখা যায়, অনেক ক্রেতা-বিক্রেতায় সরগরম বাজার। কেউ দর-কষাকষি করছে। কেউ আড্ডা দিচ্ছে। পাশের রনিখাই ইউনিয়নের তরুণ চঞ্চল বিশ্বাস দরদাম করে ছয় হাজার টাকায় একটি নৌকা কিনে সেটি ঠেলাগাড়িতে তুলতে ব্যস্ত। নৌকা তোলা শেষ হলে চঞ্চল জানালেন, সঞ্চয়ের টাকা ছিল। আরো কিছু ধারদেনা করে নৌকাটি কিনেছেন। নৌকা কোন কাজে লাগবে জানতে চাইলে বললেন, ‘গরুর জন্য ঘাস জোগাড় করব, বাড়তি পেলে বিক্রি করব। আর মাছ ধরে কিছু আয়ের চেষ্টা করব। ’ চঞ্চলের গ্রামের প্রৌঢ় খুরশিদ আলী এসেছেন তাঁকে নৌকা দামদরে সাহায্য করতে। তিনি বললেন, ‘নাও (নৌকা) এখটা লাগেই অখন। ইদিক-হিদিক যাইতে নৌকা লাগে। অন্যর কাছে কয়বার নাও ধার চাওয়া যায়। ’

সিলেট সদর উপজেলার শিবের বাজার থেকে আসা ফুল মিয়াও (৩৪) দেড় ঘণ্টা ধরে বাজারে চক্কর দিচ্ছেন। কিন্তু হিসাব মেলাতে পারছেন না। তাঁর অভিযোগ, ‘যে নাওয়ের দাম দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা, তা চায় সাত-আট হাজার টাকা। ’ নৌকা কেনা জরুরি হয়ে পড়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘রান্নার লাকড়ি সংগ্রহ, গরু-বাছুরের খাবার জোগাড়, মাছ ধরা ছাড়াও নৌকা ছাড়া এখন চলাফেরা করা যায় না। ’

ছাতক উপজেলার সৈদের গাঁও ইউনিয়নের মল্লিকপুর গ্রাম থেকে এসেছেন ময়না মিয়া (৪৬)। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাড়ির চারদিকে পানি। নৌকা ছাড়া চলার উপায় নাই। তবে দাম অতিরিক্ত চড়া। যে নৌকা অল্প দিন আগেও তিন হাজার টাকায় মিলেছে, তা এখন ১০ থেকে ১২ হাজার চায়। কিনব কেমনে?’

দাম চড়া হওয়ার অভিযোগ অস্বীকারও করেননি, আবার ঠিক মেনেও নেননি নৌকা বিক্রেতারা। তাঁরা নিজেদের মতো করে যুক্তি খাড়া করছেন। মধ্য পঞ্চাশের নৌকা ব্যবসায়ী ফখর উদ্দিন এক যুগ ধরে এ ব্যবসা করেন। ছয়টি নৌকা নিয়ে বাজারে এসেছেন সকাল ৯টার দিকে। পথে আসতে আসতেই তিনটি নৌকা বিক্রির কথাবার্তা পাকা করে ফেলেন। তিনি বললেন, এ সময় এমনিতেই নৌকার চাহিদা থাকে। তার ওপর বড় বন্যার কারণে নৌকার প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে। অতিরিক্ত দাম চাওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বন্যার পর এ কয় দিনে বরং নৌকার দাম কমেছে। বন্যার সময় যে নৌকা ১৫ থেকে ১৬ হাজারে বিক্রি হয়েছে, সেটি এখন ১০ থেকে ১২ হাজার টাকায় কেনা যাচ্ছে। ’ দাম বাড়ার কারণ সম্পর্কে বললেন, ‘শুকনো জায়গা না থাকায় অনেকে নৌকা বানাতে পারছেন না। তা ছাড়া খরচও বেশি হচ্ছে। তাই দাম কিছুটা চড়া। ’

ওসমান গণি ১১টি নৌকা নিয়ে হাটে এসেছিলেন। নৌকার দাম কেমন—এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আকারভেদে দাম। কোনো নৌকা আছে ১৫ থেকে ১৬ হাজারে বিক্রি হচ্ছে, আবার কোনোটি ১০ থেকে ১১ হাজারে, আবার কিছু নৌকা সাত হাজার থেকে সাড়ে সাত হাজারে। ’ দাম বেশি এমন অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনিও নানা যুুক্তি দিলেন। বললেন, ‘জায়গাজমি ডুবে থাকায় নৌকা বানানোর জায়গা কমে গেছে, কিন্তু চাহিদা বেড়েছে। তাই যেগুলো বানানো হচ্ছে, সেগুলোর দাম বেশি পড়ছে। মানুষও কিনছে। ’

মানিকগঞ্জের ঘিওরে ঐতিহ্যবাহী ডিঙির হাট।   ছবি : কালের কণ্ঠ



সাতদিনের সেরা