kalerkantho

সোমবার । ২৭ জুন ২০২২ । ১৩ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৬ জিলকদ ১৪৪৩

কমলাপুর রেলস্টেশনে ভবঘুরে অপরাধীচক্র

রেজোয়ান বিশ্বাস   

১৮ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কমলাপুর রেলস্টেশনে ভবঘুরে অপরাধীচক্র

কমলাপুর রেলস্টেশনে ভাসমান একটি অপরাধীচক্র নানা অপকর্ম করে যাচ্ছে। তাদের একজন সম্প্রতি এই স্টেশনের ব্যবস্থাপকের মোবাইল ফোন চুরির ঘটনায় সরাসরি জড়িত ছিলেন। সিসিটিভির ফুটেজ থেকে ছবি নিয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)।

পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, সন্দেহভাজন ওই ব্যক্তির নাম আজিজ মোহাম্মদ।

বিজ্ঞাপন

তিনি মাদকাসক্ত। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি নিজেকে কোরআনে হাফেজ দাবি করেছেন। তাঁর দেওয়া তথ্যে এ ঘটনায় আরো দুজনকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।

পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, বিষয়টি স্পর্শকাতর বলে ওই ব্যক্তি ও তাঁর ঘনিষ্ঠদের নজরদারিতে রেখে তদন্তকাজ চালানো হচ্ছে। চুরির ঘটনা নিশ্চিত হলেই সহযোগীসহ তাঁকেও গ্রেপ্তার করা হবে।

পুলিশ প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জেনেছে, আজিজ মোহাম্মদ দীর্ঘদিন সৌদি আরবে ছিলেন। ওই দেশে গাড়ি চুরির দায়ে তাঁর তিন বছরের সাজা হয়েছিল। জেল খাটার পর তাঁকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। এর পরও চুরির অভ্যাস ছাড়তে পারেননি তিনি। দেশে ফিরে ছয় মাসে ১৮টি চুরি করেন। সর্বশেষ গত ২৩ এপ্রিল কমলাপুর রেলস্টেশনের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ মাসুদ সারওয়ারের দুটি মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ চুরির ঘটনায় তাঁর জড়িত থাকার তথ্য পেয়েছে ডিবি।

ডিবির এক কর্মকর্তা বলেন, রেলস্টেশন ব্যবস্থাপকের মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ চুরির ঘটনায় সিসিটিভির ফুটেজ থেকে একজনকে শনাক্ত করা হয়। পরে তাঁকে পুরান ঢাকার বংশাল এলাকা থেকে ধরে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করে চক্রের আরো কয়েকজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। এঁরা পরস্পর যোগসাজশে চুরি করা মোবাইল ফোনসহ মালপত্র বিক্রি করতেন।

তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ডিবি জানতে পেরেছে, দেশে ফিরে তিনি কক্সবাজারের টেকনাফে একটি মাদরাসায় আরবির শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। সেখান থেকে টেকনাফে ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে মিশে অপরাধে জড়ান। সেখানে তিনি ইয়াবায় আসক্ত হয়ে পড়েন। পরে তাঁকে চাকরিচ্যুত করে ওই মাদরাসা কর্তৃপক্ষ। বছর তিনেক আগে তিনি ঢাকায় এসে মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ ও মানিব্যাগ চুরি করতে শুরু করেন।

আজিজ মোহাম্মদকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ডিবি আরো জানতে পেরেছে, তিন মাস আগে বায়তুল মোকাররম মার্কেটে একটি দোকান থেকে ল্যাপটপ চুরি করার সময় হাতেনাতে ধরা পড়েন তিনি। পরে পুলিশে সোপর্দ করার পর জায়গা হয় কেরানীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে।

কিন্তু তাঁকে নিয়ে নতুন সমস্যার সৃষ্টি হয় জানিয়ে ডিবির এই কর্মকর্তা বলেন, ‘কারাগারে তাঁর কোরআন তিলাওয়াত শুনে সব কর্মকর্তা মুগ্ধ হয়ে যান। তিনি কারাগারে নামাজ পড়ান এবং বন্দিদের কাছে কোরআন তিলাওয়াত করেন। এক পর্যায়ে জেলখানা থেকে তাঁর জন্য সরকারি আইনজীবী ঠিক করে দেওয়া হয়। পরে তিনি জামিনে মুক্তি পেয়ে আবারও চুরিতে জড়িয়ে পড়েন। ’

জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা গুলশান বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মশিউর রহমান বলেন, ‘কমলাপুর রেলস্টেশন ব্যবস্থাপকের মোবাইল ফোন চুরির ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে আমরা বেশ কয়েকজনকে শনাক্ত করেছি। প্রাথমিকভাবে এদের মধ্যে একজনের চুরির ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাচ্ছে। বিষয়টি জিজ্ঞাসাবাদ পর্যায়ে রয়েছে। ’

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আজিজ মোহাম্মদ জানিয়েছেন, পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে সেদিন তিনি কক্সবাজার যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে কমলাপুর রেলস্টেশনে যান। তবে তাঁর পকেটে কোনো টাকা ছিল না। যেহেতু আগে থেকে চুরির অভ্যাস ছিল, মাথার মধ্যে বিষয়টি নিয়ে স্টেশনে ঘোরাঘুরি করছিলেন তিনি। এরই মধ্যে দেখতে পান যে সাংবাদিকরা স্টেশন ব্যবস্থাপকের কক্ষের দিকে যাচ্ছেন। তিনি তাঁদের পিছু নেন। এক পর্যায়ে তাঁদের সঙ্গে ঢুকে পড়েন ব্যবস্থাপকের কক্ষে। ব্যবস্থাপক সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলা শুরু করলে তিনি ভিড়ের মধ্যে পেছনে গিয়ে ব্যবস্থাপকের টেবিল থেকে একটি লম্বা মানিব্যাগ উঠিয়ে নেন। পরে বাইরে এসে দেখেন, দুটি মোবাইল ফোন ছাড়া মানিব্যাগে কোনো টাকা নেই। মন খারাপ করে তিনি স্টেশন ত্যাগ করে চলে যান পুরান ঢাকার বংশালের কসাইটুলি এলাকায়।

চুরির ওই ঘটনার পর কমলাপুর রেলওয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন স্টেশন ব্যবস্থাপক। তবে তিনি এখন পর্যন্ত মামলা করেননি। ঘটনার পর ব্যবস্থাপক মাসুদ সারওয়ার দাবি করেছিলেন, দুটি মোবাইল ফোন ছাড়াও মানিব্যাগে ৪৫ হাজারের মতো টাকা এবং মূল্যবান কিছু ডকুমেন্ট ছিল। তবে ধরা পড়ার পর জিজ্ঞাসাবাদে আটক আজিজ দাবি করেছেন, তিনি যে ব্যাগটি চুরি করেছিলেন তাতে দুটি মোবাইল ফোন ছাড়া কোনো টাকা ছিল না।  

পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, চুরির ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে নানা তথ্য পাওয়া গেছে। বিশেষ করে দেশের  বৃহৎ এই রেলস্টেশনে ২৪ ঘণ্টা অপরাধীরা ঘোরাঘুরি করে। সুযোগ পেলেই তারা চুরি, ছিনতাইয়েরে পাশাপাশি নানা অপরাধকর্ম করে থাকে। তাদের মধ্যে অন্তত ৩৭ জনের নাম পেয়ে যাচাই-বাছাই চলছে।  

ডিবির এক কর্মকর্তা বলেন, ‘কমলাপুর রেলস্টেশন কার্যত অরক্ষিত থাকে। সেখানে সব সময় চোর, ছিনতাইকারী, অজ্ঞান পার্টি, মলম পার্টি, মাদকসেবীসহ নানা অপরাধী ঘুরে বেড়ায়। এতে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। ’

এর আগে রেলওয়ে পুলিশের এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, গত এক বছরে কমলাপুর স্টেশন থেকে ৮৬ জনকে আটক করেছে তারা। আটক ব্যক্তির বেশির ভাগ ভবঘুরে অপরাধী। তারা সুযোগ পেলেই যাত্রীদের টাকা, মোবাইলসহ মালপত্র চুরির চেষ্টা করে।

 

 



সাতদিনের সেরা