kalerkantho

বৃহস্পতিবার ।  ২৬ মে ২০২২ । ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ২৪ শাওয়াল ১৪৪

মেগাপ্রকল্পের কাজে অর্থের অপেক্ষা

জহিরুল ইসলাম   

১৪ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মেগাপ্রকল্পের কাজে অর্থের অপেক্ষা

‘আমরা রাজধানীতে থাইকাও সুযোগ-সুবিধা পাই না। শুধু নামেই ইউনিয়ন থেইক্কা সিটি করপোরেশনে গেছি। অভিভাবক বদলাইলেও জীবন বদলায় নাই। গত মঙ্গলবার বেরাইদ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে এমন আক্ষেপ করেন বেরাইদের বাসিন্দা আজাদুর রহমান।

বিজ্ঞাপন

’ নতুন ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের অভিযোগ, ‘নতুন’ নামে ডাকা হলেও ডিএনসিসির এসব ওয়ার্ডে কোনো ধরনের উন্নয়নকাজ হয়নি। সিটি করপোরেশনের অধীনে যাওয়ার বয়স পাঁচ পেরিয়ে ছয় বছরে পড়লেও কোনো পরিবর্তন নেই। বেশির ভাগ ওয়ার্ডের রাস্তাঘাট কাঁচা, নেই সড়কবাতি ও ফুটপাত। খালগুলো ময়লার ভাগাড়। খালের দুই পাশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য অবৈধ স্থাপনা।

জানা যায়, সরকার কয়েক বছর আগে এসব ওয়ার্ডের উন্নয়নের জন্য একটি ‘মেগা প্রকল্প’ গ্রহণ করলেও এখনো কোনো কাজই শুরু হয়নি। প্রথম ধাপের উন্নয়নকাজের জন্য ২০২০ সালের জুলাই মাসে একনেক চার হাজার ২৫ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন করে। চলতি বছর মার্চ মাসে প্রধানমন্ত্রী প্রকল্পের উদ্বোধনও করেন। কিন্তু অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ায় কাজ শুরু হয়নি। প্রথম ধাপের কাজ শেষ হলে পরবর্তী কয়েক ধাপে আরো অন্তত ২২ হাজার কোটিসহ মোট ২৬ হাজার কোটি টাকার উন্নয়নকাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

ডিএনসিসি সূত্র জানায়, বিশাল এই প্রকল্পের জন্য মাত্র ৮০ কোটি টাকা ছাড় দেওয়া হয়েছে। এই টাকায় উল্লেখযোগ্য তেমন কাজ হবে না। প্রকল্প বাস্তবায়ন করা গেলে সুবিধা ভোগ করবে এত দিন কাগুজে মর্যাদা পাওয়া প্রায় ২০ লাখ বাসিন্দা।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘১৮টি ওয়ার্ডের উন্নয়নকাজ বাংলাদেশ আর্মিকে দেওয়া হয়েছে। সেখান থেকে জানানো হয়েছে, ১৫ দিনের মধ্যে কাজ শুরু করবে। তবে চার হাজার ২৫ কোটি টাকার মধ্যে পেয়েছি মাত্র ৮০ কোটি টাকা। বাকি টাকা দ্রুত পেলে কাজও দ্রুত শেষ করা যাবে। ’

জানা যায়, ২০১৬ সালের ২৮ জুন নাগরিক সেবা বাড়াতে হরিরামপুর, উত্তরখান, দক্ষিণখান, বাড্ডা, বেরাইদ, ডুমনি, সাঁতারকুল ও ভাটারা ইউনিয়ন পরিষদ ভেঙে ১১৪ বর্গকিলোমিটার এলাকা নতুন ১৮টি ওয়ার্ড হিসেবে করপোরেশনে যুক্ত হয়। ডিএনসিসির বিদ্যমান পাঁচটি অঞ্চলের বাইরে নতুন অন্তর্ভুক্ত ওয়ার্ডগুলো নিয়ে আরো পাঁচটি অঞ্চল তৈরি করা হয়। কিন্তু দীর্ঘদিনেও এই ওয়ার্ডগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়নে তেমন কোনো কাজ করতে পারেনি সংস্থাটি।

ডিএনসিসির প্রকৌশল বিভাগ সূত্র জানায়, প্রকল্পের আওতায় নতুন ওয়ার্ডে ১৮২ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ ও উন্নয়ন করার কথা। যার মধ্যে প্রধান সড়কগুলো চার লেনের ৩৩ কিলোমিটার করা হবে। দুই লেনের সড়ক হবে ৪০ কিলোমিটার। বিদ্যুৎ, টেলিফোন, ইন্টারনেট, কেবলসহ অন্যান্য তার মাটির নিচ দিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা। এ জন্য ৭৪৩ কোটি ৬৭ লাখ ৬০ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হবে ৯৭ কিলোমিটার ইউটিলিটি ডাক্ট (টানেল)। এ ছাড়া ২৩৩.৫৭ কিলোমিটার নর্দমা নির্মাণ ও উন্নয়নে ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ৫১ কোটি ২২ লাখ ৬০ হাজার টাকা। নতুন ওয়ার্ডগুলোতে রয়েছে ১৩টি খাল। যার দৈর্ঘ্য ২৮.৫১ কিলোমিটার। এই খালগুলোর উভয় পাশে ৫৮.৫৬ কিলোমিটার সাইকেল লেন ও ওয়াকওয়ে নির্মাণ করার কথা। যাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৮২ কোটি ৫৬ লাখ ছয় হাজার টাকা। এ ছাড়া ১২ হাজার ২৬৭টি এলইডি বাতি স্থাপনে ব্যয় ধরা হয় ১২০ কোটি ২৩ লাখ ৪৮ হাজার টাকা।

সরেজমিনে দেখা যায়, ৩৯ নম্বর ওয়ার্ডের নূরেরচালা পশ্চিম, নূরেরচালা পূর্ব, খিলবাড়িরটেক পশ্চিম ও খিলবাড়িরটেক পূর্ব এলাকায় সড়কের বেহালদশা। কোনো কোনো অলিগলিতে অনেকটা বন্দিদশায়ও দিন পার করছে বাসিন্দারা। বেশির ভাগ সড়ক নোংরা পানিতে ডুবে আছে। দেখে বোঝার উপায় নেই, এটি কী সড়ক নাকি ড্রেন। যান চলাচল প্রায় বন্ধ। নূরেরচালা মসজিদ মার্কেট থেকে পূর্বদিকে ভাটারা সাঈদনগর পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৬০০ মিটার সড়কের অবস্থা সবচেয়ে বেশি খারাপ। পানির কারণে সড়কে হেঁটে চলাচল কঠিন। দুর্ভোগ আর ঝুঁকির শেষ নেই। পানি নিষ্কাশনে কংক্রিটের স্ল্যাব উঠিয়ে রাখা হয়েছে। তাতে মানুষের চলাচলে ঝুঁকি আরো বেড়েছে। হাঁটতে গিয়ে পথচারীরা প্রায়ই স্ল্যাবের গর্তে পড়ে আহত হচ্ছে। ওয়ার্ড কাউন্সিলর শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘কয়েক দিন পর পর রাস্তা মাপে! মানুষ দুর্বিষহ জীবন যাপন করছে। কোনো প্রতিকার নেই। কবে রাস্তার কাজ করবে, ড্রেনেজের কাজ কবে করবে, কিছুই জানি না। ’

একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা গেছে, ৪২ নম্বর ওয়ার্ডের বড় বেরাইদ পূর্বপাড়া, বড় বেরাইদ ভূঁইয়াপাড়া, বড় বেরাইদ ঋষিপাড়া, বড় বেরাইদ আরাদ্দাপাড়া, ছোট বেরাইদ ডগরদিয়া, আশকারটেক, চান্দারটেক, পাঁচদিরটেক, হারারদিয়া, বড় বেরাইদ মোড়লপাড়া (উত্তর), বড় বেরাইদ মোড়লপাড়া (দক্ষিণ), বড় বেরাইদ আগারপাড়ায়। এলাকাবাসী জানায়, ইউনিয়ন পরিষদের অধীনে থাকার সময়ের সড়কেই চলতে হচ্ছে এখনো। কোনো নতুন রাস্তা তো দূরের কথা, এ পর্যন্ত কোনো সংস্কারও করা হয়নি।

আর ৪৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাবুরপাড়া, বড়বাগ, ওজাপাড়া, রাজাবাড়ী, মুণ্ডা, পুলারটেক, ভাটুলিয়া, মাউছাইদ, বাদুরীপাড়া, চানপাড়া, ফৌজারবাড়ী, গোবিন্দপুর, খঞ্জুরদিয়া, সাওরারটেক ও উজানপুর গিয়ে দেখা যায়, বেশির ভাগ রাস্তাঘাট কাঁচা, নেই সড়কবাতি ও ফুটপাত। ওয়ার্ড কাউন্সিলর জাইদুল ইসলাম মোল্লা বলেন, ‘এসব নিয়ে এখন আর বলতে ভালো লাগে না। তাই কী করতে পারলাম আর কী করব কিছু বলতে চাই না। ’

নগর বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, একটি আদর্শ ওয়ার্ডে নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে হলে প্রশস্ত রাস্তা, ড্রেনেজ ও স্যুয়ারেজ ব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, চিকিৎসাকেন্দ্র, শরীর চর্চা কেন্দ্র, গ্রন্থাগার, কমিউনিটি সেন্টার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জাদুঘর ও নাট্যমঞ্চ, খেলার মাঠ, পার্ক, পশু জবাইখানা, গণশৌচাগার, বাস টার্মিনাল থাকা আবশ্যক। যা নতুন ওয়ার্ডগুলোতে অনুপস্থিত। নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, নতুন ওয়ার্ডের জন্য পর্যাপ্ত সরকারি জায়গা থাকলেও তা বেদখল হয়ে গেছে। বেশির ভাগ স্থানে বহুতল ভবন উঠে গেছে। আবার অনেক সরকারি জায়গা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামে রেকর্ডভুক্ত হয়েছে। এসব অধিগ্রহণ করে প্রকল্পের কাজ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষকে শক্ত অবস্থান নিতে হবে।

 

 

 



সাতদিনের সেরা