kalerkantho

শনিবার ।  ২১ মে ২০২২ । ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ১৯ শাওয়াল ১৪৪৩  

পিরোজপুর আ. লীগ

মন্ত্রী ও সাবেক এমপির দ্বন্দ্ব

যুবলীগকর্মীর কবজি কর্তন

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৬ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মন্ত্রী ও সাবেক এমপির দ্বন্দ্ব

পিরোজপুরে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার দুপুরে সদর উপজেলার কদমতলা ইউনিয়নে যুবলীগের কর্মী নাদিম খানের কবজি কর্তন করা হয়। এই সহিংসতার নেপথ্যে রয়েছে দুটি পক্ষের বিরোধ। একটি পক্ষের নেতৃত্বে সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম এ আউয়াল।

বিজ্ঞাপন

অন্য পক্ষে আছেন প্রাণিসম্পদমন্ত্রী রেজাউল করিম। প্রথম ধাপে কদমতলা ইউপির নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন নিয়ে আগের বিরোধ চেনা রূপে ফিরে আসে। রেজাউল করিমের অনুসারীরা দলীয় মনোনয়ন থেকে বঞ্চিত হন। নৌকার প্রার্থীর বিরুদ্ধে ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হয়ে জিতে যান শিহাব উদ্দিন। তিনি রেজাউলের লোক হিসেবে পরিচিত। এই নির্বাচনকে ঘিরে সেখানে অন্তত আটটি সহিংস ঘটনা ঘটেছে।

এ কে এম এ আউয়াল নিজে পিরোজপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। তাঁর স্ত্রী লায়লা পারভীন জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। আউয়ালের ভাই হাবিবুর রহমান ওরফে মালেক জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও পিরোজপুর পৌরসভার মেয়র। আরেক ভাই মজিবুর রহমান ওরফে খালেক জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান।

আর আউয়ালের ছোট ভাই মসিউর রহমান ওরফে মহারাজ পিরোজপুর চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি ও যুবলীগের সাবেক নেতা। তিনি জেলা বাস ও মিনিবাস মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি। একসময় পিরোজপুরে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে এই পরিবার ছিল দণ্ডমুণ্ডের মূলে, যার নেতৃত্বে ছিলেন পিরোজপুর-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আউয়াল।

দলীয় ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পিরোজপুর-১ আসনে নবম সংসদ নির্বাচনে মহাজোটের শরিক দল জাতীয় পার্টি থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয় সাবেক মন্ত্রী মোস্তফা জামাল হায়দারকে। আউয়াল নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেন। ওই নির্বাচনে সংসদ সদস্য হন আউয়াল।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আবার সংসদ সদস্য হন আউয়াল। নির্বাচিত হওয়ার পর জেলার রাজনীতি পুরোটা তাঁর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। দুই মেয়াদে সংসদ সদস্য থাকাকালে তাঁর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, নিয়োগ বাণিজ্য, সরকারি সম্পদ অবৈধভাবে দখলে নেওয়াসহ নানা অভিযোগ ছিল। স্ত্রী লায়লা পারভীন আউয়ালের ভাইদের পাত্তা দিচ্ছিলেন না। এ নিয়ে পারিবারিক বিরোধ দেখা দেয়।

বিরোধ ভাইয়ে ভাইয়ে

২০১৬ সালে বেকুটিয়া ফেরিঘাট ও বলেশ্বর সেতুর টোল আদায়ের ইজারা নিয়ে আউয়াল তাঁর ভাই পৌরসভার মেয়র হাবিবুরের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন। আউয়ালের স্ত্রী লায়লার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সুভাষ এন্টারপ্রাইজ ও বুশরা এন্টারপ্রাইজ ফেরিঘাট ও সেতুর টোল আদায়ের ইজারা নেওয়ার জন্য দরপত্র জমা দেয়। দরপত্র জমা দেন হাবিবুরও। এ নিয়ে আউয়ালের সঙ্গে তাঁর তিন ভাই হাবিবুর রহমান, মজিবুর রহমান ও মসিউর রহমানের বিরোধ দেখা দেয়।

গত জাতীয় নির্বাচনের সময় মনোনয়ন দৌড়ে হাবিবুর হেরে যান। পরে তিনি হাত মেলান পিরোজপুর-১ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রাপ্ত শ ম রেজাউল করিমের সঙ্গে। ভোটে রেজাউল করিম নির্বাচিত হন। পরে স্থানীয় রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই দুজনের মধ্যেও বিরোধ তৈরি হয়।

মন্ত্রীর সঙ্গে আউয়াল পরিবারের দ্বন্দ্ব

প্রাণিসম্পদমন্ত্রী রেজাউল করিমের সঙ্গে আউয়াল পরিবারের কোনো যোগাযোগ নেই। গেল সংসদ নির্বাচনের বছর না ঘুরতেই দ্বন্দ্ব শুরু হয়। আউয়াল দম্পতির বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মামলা করার পর সেই বিরোধ প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে।

আদালতে আউয়াল দম্পতির জামিন নামঞ্জুর হওয়ার পর পিরোজপুর শহরে দলীয় কর্মীরা তাণ্ডব শুরু করেন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাঁদের জামিন দেওয়া হয়।

পরবর্তী সময়ে মেয়র হাবিবুর দম্পতির বিরুদ্ধে দুদক মামলা করে। এমন পরিস্থিতিতে নিজেদের পারিবারিক প্রভাব ঠিক রাখতে এক হয়ে যান আউয়াল, হাবিবুরসহ অন্য ভাইয়েরা। এখন ভাইদের কাঁধে ভর দিয়ে আবার মাঠ নিয়ন্ত্রণে নিতে চাইছেন আউয়াল। শ ম রেজাউলকে কোণঠাসা করে রেখে আবার নিজেদের একক পারিবারিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে এই পরিবার। মন্ত্রীর পক্ষে মাঠে আছেন পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান বায়েজীদ হোসেন।

মেয়র হাবিবুর রহমান মালেক বলেন, ভাইদের সঙ্গে বিরোধ ছিল। কিন্তু সেটা মিটে গেছে। তিনি বলেন, ‘সংসদ সদস্য (রেজাউল) বহিরাগত ক্যাডার দিয়ে দলীয় কর্মীদের ওপর হামলা-মামলা করিয়ে দলের বারোটা বাজাতে চাইছেন।

দলীয় ত্যাগী কর্মীরা তা রুখে দেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। ’

জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম এ আউয়াল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রেজাউল করিম হঠাৎ করে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন। তাঁর নিজের উপজেলা বাদে অন্য দুটিতে কোনো অনুসারী নেই। বলতে গেলে তিনি দলীয় নেতাকর্মী থেকে বিচ্ছিন্ন।

তাই নিজের আত্মীয়দের দিয়ে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের কর্মীদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছেন। দলীয় এক কর্মীরও কবজি বিচ্ছিন্ন করেছেন। ’

এ বিষয়ে জানতে গতকাল শনিবার রাতে মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিমের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি ধরেননি। পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান বায়েজীদ হোসেন বলেন, আওয়ামী লীগ আউয়াল পরিবারের মুঠোয় বন্দি। সেই বন্দিদশা থেকে মুক্তির জন্য প্রধানমন্ত্রী দলীয় মনোনয়ন দিয়ে শ ম রেজাউল করিমকে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু যখনই তিনি দলকে সংগঠিত করার চেষ্টা করেছেন, তখনই আউয়াল পরিবার হামলা-মামলা করে প্রতিহত করার চেষ্টা করছে।



সাতদিনের সেরা