kalerkantho

বুধবার । ১২ মাঘ ১৪২৮। ২৬ জানুয়ারি ২০২২। ২২ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

তিন গুণ পর্যন্ত বাড়ছে খরচ

নিখিল ভদ্র   

৬ ডিসেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



তিন গুণ পর্যন্ত বাড়ছে খরচ

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বেশির ভাগ উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলছে ধীর গতিতে। এতে প্রকল্প বাস্তবায়নে খরচ তিন গুণ পর্যন্ত বাড়ছে। প্রকল্প শুরুর তিন বছর পরও অগ্রগতি শূন্য, এমন প্রকল্পও রয়েছে চারটি। আবার মেয়াদ শেষ হতে চললেও অর্ধেক উন্নয়ন প্রকল্পের ৭৫ শতাংশের বেশি কাজ বাকি রয়ে গেছে।

বিজ্ঞাপন

অনুমিত হিসাব সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পাঠানো প্রতিবেদনে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

সম্প্রতি জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে প্রতিবেদনটি নিয়ে আলোচনার সময় প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়। এ জন্য মন্ত্রণালয় করোনা পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করলেও সমন্বয়হীনতাকেই দায়ী করেছেন কমিটির সদস্যরা।

প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতায় কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগের ১১টি প্রকল্পের মধ্যে আটটির মেয়াদ চলতি বছরই শেষ হচ্ছে। এর ছয়টির অগ্রগতি ২০ শতাংশের কম। এর মধ্যে দুটির অগ্রগতি শূন্য এবং একটির অগ্রগতি মাত্র ৯ শতাংশ। সর্বোচ্চ অগ্রগতির দুটি প্রকল্পের যথাক্রমে ৬৫ ও ৮০ শতাংশ কাজ হয়েছে। এ ছাড়া মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের আওতায় চলমান ১৭টি প্রকল্পের মধ্যে আটটির অগ্রগতি ২৫ শতাংশের কম। ৫০ শতাংশের কম অগ্রগতি তিনটির। বাকি ছয়টির অগ্রগতি ৫০ শতাংশের বেশি। এর মধ্যে কয়েকটি প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতির থেকে আর্থিক অগ্রগতি বেশি।

সংসদীয় কমিটির সদস্যরা কয়েকটি প্রকল্পের খরচ বাড়ার কারণ হিসেবে ভূমি, মেশিনারি, ফার্নিচার ও সরঞ্জামের দাম বৃদ্ধির অজুহাত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। কমিটির বৈঠকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ সম্পন্ন ও প্রকল্পের খরচ কমাতে ছোট ছোট প্রকল্প গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। একই সঙ্গে প্রকল্প হাতে নেওয়ার আগে জমি অধিগ্রহণ, প্রকল্পের আকার নির্ধারণসহ সার্বিক বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে দেখার পরামর্শ দেওয়া হয়।

এ ব্যাপারে সংসদীয় কমিটির সভাপতি উপাধ্যক্ষ আব্দুস শহীদ জানান, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প বাস্তবায়নে কোনো সমন্বয় নেই। ধীরগতি ও সমন্বয়হীনতার কারণে প্রকল্পের খরচ বাড়ছে। পর্যালোচনা না করেই মন্ত্রণালয় বড় বড় প্রকল্প হাতে নেওয়ায় এমনটি হচ্ছে। তিনি বলেন, সংসদীয় কমিটির পক্ষ থেকে যেকোনো উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের আগে সার্বিক পর্যালোচনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় বাড়ানো রোধে পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা ও আগাম প্রস্তুতি নিয়ে প্রকল্প হাতে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

কমিটি সূত্র জানায়, ২০১৪ সালে কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগ ‘১০০টি উপজেলায় একটি করে টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ (টিএসসি) স্থাপন’ শীর্ষক প্রকল্প হাতে নেয়। ওই বছরের ১৯ জানুয়ারি অনুমোদিত ওই প্রকল্পের প্রথম দফা সংশোধন করে মেয়াদ জুন ২০১৬ থেকে বাড়িয়ে ডিসেম্বর ২০১৮ এবং দ্বিতীয় দফা ডিসেম্বর ২০২১ করা হয়। এখনো প্রকল্পের ৩৫ শতাংশ কাজ বাকি রয়েছে।

অথচ দুই দফা মেয়াদ বাড়ানোর কারণে প্রকল্পের খরচ ৯২৪ কোটি তিন লাখ টাকা থেকে বেড়ে দুই হাজার ৩৩৫ কোটি ৬৫ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এখন ওই প্রকল্পটির তৃতীয় দফা মেয়াদ বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

একইভাবে তিন গুণেরও বেশি খরচ বেড়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের ‘সদর দপ্তর ও জেলা কার্যালয় স্থাপনের মাধ্যমে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর শক্তিশালীকরণ’ শীর্ষক প্রকল্পে। ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ওই প্রকল্পের প্রথম মেয়াদ শেষ হয় ২০১৬ সালের জুনে। প্রকল্পের সর্বশেষ মেয়াদ ২০২৩ সালের জুনে নির্ধারণ করা হলেও অর্ধেক কাজ হয়েছে। এই প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ১১৮ কোটি ৬২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৮৩ কোটি ১২ লাখ ১৪ হাজার টাকা।

মন্ত্রণালয়ের দেওয়া প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগের ‘ইমপাওয়ারিং সিটিজেনস ফর ইনক্লুসিভ সাসটেইনেবল গ্রোথ’ শীর্ষক প্রকল্প ও ‘উপজেলা পর্যায়ে ৩২৯টি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ স্থাপন’ প্রকল্পের অগ্রগতি শূন্য। এর মধ্যে ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে শুরু হওয়া প্রথম প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হবে এই ডিসেম্বরে। আর মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের ‘সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার পাঁচটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পটি ২০২০ সালের অক্টোবরে অনুমোদন হলেও এখনো কাজই শুরু হয়নি। এ ছাড়া ঢাকা, মাদারীপুর ও রংপুরের তিনটি কলেজের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পটির বাস্তবায়ন কাজ আগামী জুনে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনো অগ্রগতি শূন্য।

কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগের অধীন ‘সিলেট, বরিশাল, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগে চারটি মহিলা ইনস্টিটিউট স্থাপন’ প্রকল্পের মেয়াদ গত জুনে শেষ হয়েছে। প্রকল্পটির অগ্রগতি ২০ শতাংশ। গত জুনে ‘বাংলাদেশ ভূমি জরিপ শিক্ষার উন্নয়ন’ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও কাজের অগ্রগতি ১৯ শতাংশ। মেয়াদ পার হলেও মাত্র ৯ শতাংশ কাজ হয়েছে ‘২৩টি জেলায় পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপন’ প্রকল্পের। একই সময়ে মেয়াদ শেষ হওয়া ‘চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে একটি করে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ স্থাপন’ প্রকল্পের কাজ ৯০ শতাংশ এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীন ৬৪ জেলায় টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজের সক্ষমতা বৃদ্ধি’ প্রকল্পের কাজ ৮০ শতাংশ অবাস্তবায়িত রয়ে গেছে।

এ ছাড়া মাদরাসা অধিদপ্তরের ‘মাদরাসা এডুকেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম সাপোর্ট স্থাপন’ প্রকল্পের মেয়াদ এক দফা বাড়িয়ে আগামী জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। কিন্তু কাজ এখনো প্রায় ২০ শতাংশ অবাস্তবায়িত। গত জুনে শেষ হওয়া ‘দেশের ৬৫৩টি মাদরাসায় মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন’ প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। প্রকল্পটির কাজ প্রায় অর্ধেক বাকি রয়েছে।

‘কিশোরগঞ্জ জেলার হাওর এলাকার নির্বাচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে। প্রকল্পটির মাত্র ৫ শতাংশ কাজ হয়েছে। আর ‘মাদারীপুর জেলার সদর উপজেলার সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজের অবকাঠামো উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পের মেয়াদ বাস্তবায়ন কাজ ২২ শতাংশ বাকি রয়েছে। ওই প্রকল্পের মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে। গোপালগঞ্জ ও ফেনীর দুটি সরকারি ও একটি বেসরকারি কলেজের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে আগামী জুনে। এই প্রকল্পের কাজ ৫৩ শতাংশ অবাস্তবায়িত রয়েছে। দুই বছরে ‘হাওর এলাকার নির্বাচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পের কাজ মাত্র ৫ শতাংশ হয়েছে।

বৈঠকে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সরকার গৃহীত প্রকল্পগুলোর যথাযথ বাস্তবায়নে আন্তরিক। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির কারণে অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্পের বাস্তবায়নকাজ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তার পরও প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করার জন্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তাগিদ দেওয়া হচ্ছে।

এ ব্যাপারে কথা বলতে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. মাহবুব হোসেন এবং কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. আমিনুল ইসলাম খানের মোবাইলে গতরাতে কয়েকবার চেষ্টা করা হলে দুজনেরই ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।



সাতদিনের সেরা