kalerkantho

শনিবার । ১৫ মাঘ ১৪২৮। ২৯ জানুয়ারি ২০২২। ২৫ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

জাগুয়ার

এখন পরিণত জুটি

শাহীন আকন্দ, গাজীপুর (আঞ্চলিক)   

১ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



এখন পরিণত জুটি

গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কে জাগুয়ার জুটি। ছবি : কালের কণ্ঠ

দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন জঙ্গলের রাজাখ্যাত প্রাণী জাগুয়ার। বাঘ-সিংহের চেয়েও হিংস্র। দেখতে চিতাবাঘের মতো, কিন্তু চিতাবাঘের চেয়ে বড় আর বলিষ্ঠ। শিকারে জলে-স্থলে সমান দক্ষ।

বিজ্ঞাপন

দৌড়ানোর চেয়ে ফাঁদ পেতে শিকার ধরতে ওস্তাদ। চোখের পলকে যেকোনো গাছের মগডালে উঠে পড়ার দক্ষতা রয়েছে জাগুয়ারের। প্রায়ই গাছ থেকে নিশানা ঠিক করে আর ঝাঁপিয়ে পড়ে শিকারের ওপর। এদের এক কামড়ই শিকারকে নিস্তেজ করে দিতে পারে।

ব্রাজিল, গায়ানা ও মেক্সিকোর জাতীয় পশু জাগুয়ার। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘের (আইইউসিসিএন) তালিকা অনুসারে জাগুয়ার ঝুঁকিতে থাকা প্রাণীগুলোর একটি। বাংলাদেশের কোথাও জাগুয়ারের অস্তিত্বই ছিল না। তবে ২০১৭ সালের ১৩ নভেম্বর বাংলাদেশ হয়ে পাচারকালে উদ্ধার করা হয়েছিল দুটি জাগুয়ার শাবক। পরে বন বিভাগের মাধ্যমে বাচ্চা

দুটিকে গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কে দেওয়া হয়। সেখানে বন্য প্রাণী চিকিৎসা কেন্দ্রে প্রাণী দুটি শিশু বয়স পেরিয়ে যৌবনে পা দিয়েছে।

সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও সহকারী বন সংরক্ষক মো. তবিবুর রহমান জানালেন চমকপ্রদ আরেক তথ্য। তা হলো জাগুয়ার দুটির একটি মাদি, আরেকটি মর্দা। ফলে শিগগিরই প্রাণী দুটির বংশবৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখছেন তাঁরা।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মনিরুল এইচ খান কালের কণ্ঠকে জানান, সাফারি পার্কে থাকা মাদি জাগুয়ারটি শাবকের জন্ম দিলে তা হবে দারুণ সুখবর। তবে প্রাণী দুটির জন্য দরকার এদের স্বভাবজাত অনুকূল পরিবেশ।

সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, পরিকল্পনা করা হয়েছে। সব ঠিকঠাক থাকলে এক বছরের মধ্যে বাঘ বেষ্টনীর উত্তর পাশে বড় পরিসরে শেড নির্মাণ করে প্রাণী দুটিকে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে।

দেশের একমাত্র জাগুয়ার জুটির দিন কেমন কাটছে তা দেখতে গতকাল রবিবার সেখানে যান এই প্রতিবেদক। সাফারি পার্কের ভেতর সোজা সড়ক ধরে প্রায় ২০০ গজ দূরে বাঁ পাশ দিয়ে আরেকটি সংযোগ সড়ক। সংযোগ সড়কে পা ফেলতেই শোনা গেল ভয়ংকর গর্জন। এই সড়ক ঘেঁষা বন্য প্রাণী চিকিৎসা কেন্দ্রটি। সেখানে উত্তর পাশের পশ্চিমে থাকা বড় ঘরটিই জাগুয়ার দুটির ঠিকানা। ঘরটির ভেতর আবার লোহার

বেড়া দিয়ে ঘেরা তিনটি কক্ষ। তিন কক্ষেরই দরজা উন্মুক্ত। একটি কক্ষে টেবিলের ওপর দাঁড়িয়ে মাদি জাগুয়ার। আরেক কক্ষে দরজা ঘেঁষে শুয়ে আছে মর্দা সঙ্গীটি। কিছু সময় পরপরই মাদি জাগুয়ার মাথা ঘুরিয়ে সঙ্গীটিকে দেখছিল অভিমানের সঙ্গে। এরপর পা টিপে সঙ্গীটির কাছে যায় মাদিটি। গা ঘেঁষে দাঁড়াতেই আচমকা আক্রমণ চালায় মর্দাটি। পরাস্ত হয়ে মাদি জাগুয়ার ফিরে যায় তার কক্ষে। এরপরই ঘরের সামনে মানুষের উপস্থিতি দেখে আক্রমণাত্মক হয় দুটিই। শুরু হয় গর্জন। একবার লাফিয়ে ওঠে পড়ে কক্ষে রাখা শুকনো ডালে; সেখান থেকে হঠাৎ লাফিয়ে আক্রমণের চেষ্টা করে। ব্যর্থ হয়ে লোহার বেড়া দিয়ে হাত বাইরে বের করে ধরার চেষ্টাও করে।

সাফারি পার্কের ভেটেরিনারি সার্জন হাতেম সাজ্জাদ মোহাম্মদ জুলকারনাইন জানান, প্রাণী দুটির মধ্যে দারুণ সখ্য। তবে এই মুহূর্তে এদের অভিমানপর্ব চলছে। দুটিরই এখন যৌবনকাল। দেশে এদের বংশবৃদ্ধির সুখবর আসতে পারে যেকোনো মুহূর্তে।

মো. তবিবুর রহমান জানান, শুরু থেকেই প্রাণী দুটিকে নিবিড় পরিচর্যা আর পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। দুটি প্রাণীই এখন প্রায় পূর্ণবয়স্ক। দুর্দান্ত ক্ষিপ্রতা এদের। এদের স্বভাব বিবেচনায় শেড নির্মাণের জন্য পরিকল্পনা করা হয়েছে। তিনি জানান, জাগুয়ার দুটিকে খাবার হিসেবে প্রতিদিন বিকেলে সাড়ে তিন কেজি করে সাত কেজি গরুর মাংস দেওয়া হয়। শুক্রবার দেওয়া হয় সমান পরিমাণ মুরগি। মঙ্গলবার অভুক্ত রাখা হয় এদের।

সাফারি পার্কের কর্মকর্তারা জানান, পূর্ণবয়স্ক জাগুয়ারের ওজন ৬৮ থেকে ১৩৬ কেজি। এদের শরীরের দৈর্ঘ্য ১৫০ থেকে ১৮০ সেন্টিমিটার। লেজের দৈর্ঘ্য ৭০ থেকে ৯০ সেন্টিমিটার। মাদি ১২ থেকে ২৪ মাস, আর মর্দা জাগুয়ার ২৪ থেকে ৩৬ মাস বয়সে প্রজননক্ষম হয়। এদের গর্ভকাল ৯১ থেকে ১১১ দিন। গড়ে দুটি বাচ্চা দেয়; চারটি বাচ্চা প্রসবেরও নজির রয়েছে।

জন্মের পর মা জাগুয়ারের ওপর নির্ভর করতে হয় বাচ্চাদের। প্রায় দুই সপ্তাহ এরা চোখও মেলে না। পাঁচ থেকে ছয় মাস পর্যন্ত মায়ের দুধ খায়। বড় হতে হতে শিকার করা শেখে এবং একাই চলাফেরা করে। এদের গড় আয়ু ১১ থেকে ১২ বছর। তবে বন্দি অবস্থায় ২০ বছরও বাঁচে। প্রাণীটি নিশাচর হলেও এরা দিনের বেলায়ও শিকার করে বেড়ায়।



সাতদিনের সেরা