kalerkantho

বুধবার । ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ৮ ডিসেম্বর ২০২১। ৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৩

চুইঝালে মিষ্টি স্বপ্ন

মণিরামপুরে ৭০০ তরুণের সমবায়

ফিরোজ গাজী, যশোর   

২৮ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



চুইঝালে মিষ্টি স্বপ্ন

চুইঝালগাছ। ছবি : কালের কণ্ঠ

চুইঝাল রোপণ করে মিষ্টি এক আগামীর স্বপ্ন বুনে চলেছেন যশোরের সাত গ্রামের ৭০০ তরুণ-যুবক। সমবায়ের ভিত্তিতে তাঁরা এক হয়েছেন ভাগ্য ফেরাতে। স্বপ্নবাজ এই তরুণরা গঠন করেছেন ‘খানপুর চুইঝাল প্রজেক্ট’। মসলাজাতীয় লতা চুইঝালের কাণ্ড বা লতা মাছ ও মাংসের তরকারিতে আনে বিশেষ স্বাদ, যা বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের অনেক জায়গায় খুব জনপ্রিয়।

‘খানপুর চুইঝাল প্রজেক্ট’-এর আওতায় মণিরামপুর উপজেলার ১৩ নম্বর খানপুর ও ১২ নম্বর শ্যামকুড় ইউনিয়নের চারটি গ্রামে ১০ হাজার গাছে চাষ করা হয়েছে চুইঝাল। আরো তিনটি গ্রামে চলছে চারা রোপণের তোড়জোড়। তিন বছর পর এই চুইঝাল বিক্রির উপযোগী হলে প্রতিটি গাছ গড়ে পাইকারি বিক্রি হবে কমপক্ষে দুই হাজার টাকায়। উদ্যোক্তাদের লক্ষ্য, আগামী ছয় বছরে এই সাত গ্রামের কয়েক লাখ গাছের প্রতিটিতে জড়িয়ে থাকবে চুইঝালের লতা! চুইঝাল প্রকল্পের এই তরুণ-যুবকদের একত্রিত করেছেন তরুণ মাসুদুর রহমান সবুজ।

কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যক্তি উদ্যোগে বাণিজ্যিকভাবে চুইঝালের চাষ হলেও দেশে সমবায় ভিত্তিতে লতাটির চাষ তাঁদের জানা মতে এই প্রথম।

চুইঝাল মসলাজাতীয় উদ্ভিদ। এর বৈজ্ঞানিক নাম চরঢ়বৎ পযধনধ। চুইঝাল গাছ দেখতে পানের লতার মতো। পাতা কিছুটা লম্বা ও পুরু। এর কাণ্ড বা লতা কেটে ছোট টুকরা করে মাছ-মাংস, ছোলা বা ডাল রান্নায় ব্যবহার করা হয়। রান্নার পর এর টুকরা চুষে বা চিবিয়েও খাওয়া যায়। মাংস রান্নায় চুইঝালের ব্যবহার বেশি। এটি মাংসের তরকারিতে আনে বিশেষ স্বাদ। নামে ‘চুইঝাল’ হলেও এটি খেতে খুব বেশি ঝাল নয়। চুইঝালের কিছু ঔষধি গুণের কথাও বলা হয়। আগে মূলত যশোর, খুলনা, সাতক্ষীরা এলাকায় এর ব্যবহার হলেও প্রচারমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বদৌলতে চুইঝালের কথা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এ কারণে দিন দিন বাড়ছে এর চাহিদাও। বাজারে চুইঝাল আকৃতিভেদে ৩০০ থেকে এক হাজার ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়ে থাকে। 

মণিরামপুর উপজেলার ১৩ নম্বর খানপুর ইউনিয়নের নিভৃত, সবুজে ছাওয়া গ্রাম মুন্সি খানপুর। এই গ্রামেরই হাজি আনসার মোড়লের ছেলে মাসুদুর রহমান সবুজ। গতকাল বুধবার সকালে তাঁর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, আশপাশের বেশির ভাগ গাছেই বেয়ে উঠেছে চুইঝালের লতা। দেখা গেল, প্রতিবেশীসহ গ্রামের বেশির ভাগ মানুষের বাড়িতেই কমবেশি একই দৃশ্য। সবই মূলত তাঁদের প্রজেক্টের অংশ। পাশের লাউড়ি, সুন্দলপুর ও জামলা গ্রামের গাছগুলোতেও রয়েছে অংশীদারির ভিত্তিতে তাঁদের লাগানো চারা। এগুলোর পরিচর্যা ও পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব পালন করেন প্রজেক্টের সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট গ্রামের বাসিন্দা তরুণ-যুবকরা।

কথা হলো প্রজেক্টের উদ্যোক্তা মাসুদুর রহমান সবুজের সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘সাতটি গ্রাম নিয়ে এই প্রজেক্ট গড়ে তোলা হয়েছে। এরই মধ্যে মুন্সি খানপুর, লাউড়ি, সুন্দলপুর ও জামলা—এই চার গ্রামের ১০ হাজার গাছের গোড়ায় চুইঝালের চারা রোপণ শেষ হয়েছে। প্রজেক্টের বাকি তিনটি গ্রাম তেঘরি, ধলিগাতি ও গোবিন্দপুরে চারা রোপণের প্রক্রিয়া চলছে।’

সমবায় ভিত্তিতে চাষ প্রসঙ্গে সবুজ বলেন, ‘আগে ব্যক্তিগতভাবে চুইঝাল চাষ ও চারা বিক্রি করতাম। তাতে ভালোই লাভ হতো। হঠাৎ মনে হলো, বড় পরিসরে এই চুইঝাল চাষ করে বেকার বন্ধুদের, গ্রামের কর্মহীন যুবক ও অল্প আয়ের মানুষের অবস্থার উন্নতি করা সম্ভব।’

সবুজ জানিয়েছেন, পরে কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে ইতিবাচক সাড়া পান। এরপর ২০২০ সালের ১ জুন ১৩ জন মিলে খানপুর চুইঝাল প্রজেক্ট গঠন করেন। বর্তমানে দুই ইউনিয়নের সাত গ্রামে এর সদস্যসংখ্যা ৭০০।

সবুজ বললেন, এরই মধ্যে তিনি প্রজেক্টের চারা তৈরিসহ অন্যান্য কাজে ১০ লাখ টাকার মতো বিনিয়োগ করেছেন। তবে এই প্রজেক্টের অন্য সদস্যদের এবং যাঁদের জমির গাছ চুই চাষে ব্যবহার হবে, তাঁদের কোনো অর্থ বিনিয়োগ করতে হবে না। তাঁদের মূল কাজ চারা রোপণের পর এর রক্ষণাবেক্ষণ করা। তিন বছর পর চুইঝাল বিক্রির পর তাঁরা প্রাপ্ত অর্থের ৩০ শতাংশ পাবেন। জমির মালিক পাবেন ৩০ শতাংশ। মূূূল বিনিয়োগকারী হিসেবে তিনি নেবেন ৩০ শতাংশ। বাকি ১০ শতাংশ অর্থ প্রজেক্টের পক্ষ থেকে কল্যাণমূলক কাজে ব্যবহারের জন্য রাখা হবে।

সবুজ বলেন, ‘আমরা এমনভাবে এগোচ্ছি যে আগামী ছয় বছর পর এই সাত গ্রামে যে কয় লাখ গাছ আছে, তার প্রতিটি বেয়ে থাকবে চুইগাছের লতা। কোনো গাছ খালি থাকবে না।’

প্রজেক্টের সদস্য ওলিয়ার রহমান ছিলেন তাঁর নিজের ভাষায় ‘প্রায় বেকার’। সামান্য জমিতে চাষ করে সংসার চালাতে হিমশিম খেতেন। এখন চুইঝাল প্রকল্পে যুক্ত হয়ে সুদিনের স্বপ্ন দেখছেন। ‘লতা বিক্রির পর আমরা সদস্যরা একেকজন কয়েক লাখ টাকা হাতে পাব। এ টাকা আমি বড় কাজে লাগাতে পারব’, বললেন ওলিয়ার।

একই রকম আশা প্রজেক্টের আরেক তরুণ সদস্য রাসেল হোসেনের। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে চাকরি করেন। সামান্য বেতনে চলছিল না। তাই চাকরির পাশাপাশি চুইঝাল চাষ করছেন।

মণিরামপুর উপজেলা কৃষি অফিসার মো. আবুল হাসান বললেন, ‘মাসুদুর রহমান সবুজ মণিরামপুরের একজন উদ্যোগী কৃষক। সবুজের খানপুর চুই প্রজেক্ট ছাড়া দেশে অন্য কোথাও চুইঝাল সমবায় ভিত্তিতে বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে বলে আমার জানা নেই। এমন সমবায় ভিত্তিতে চুই চাষ দেখে অন্য এলাকার তরুণ-যুবকরাও এতে উৎসাহী হবেন।’

 



সাতদিনের সেরা