kalerkantho

রবিবার । ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২৮ নভেম্বর ২০২১। ২২ রবিউস সানি ১৪৪৩

চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজ

সবুজ ক্যাম্পাসের ৬০ বছর

কর্নেল মুজিবুল হক সিকদার, পিবিজিএম

১৭ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সবুজ ক্যাম্পাসের ৬০ বছর

চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজের কৃতী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষকরা। ছবি : সংগৃহীত

বাংলাদেশের অন্যতম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজের হীরক জয়ন্তী আজ। ১৯৬১ সালের এই দিনে যাত্রা শুরু হয়েছিল প্রতিষ্ঠানটির। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রতিষ্ঠানটির স্বাভাবিক যাত্রা ব্যাহত হয়েছিল। পাকিস্তান সেনাবাহিনী এই প্রতিষ্ঠানে স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের আটকে রেখে করেছিল নির্দয় নিপীড়ন। বন্দিশিবির হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। স্বাধীনতা লাভের পরপরই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশনায় প্রতিষ্ঠানটি পুনরায় চালু হয়। সুদীর্ঘ সময়ের অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে প্রতিষ্ঠানটি আজ একটি ঐতিহ্যমণ্ডিত অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে।

ষাট বছরের ইতিহাসে এই প্রতিষ্ঠানের অর্জন উল্লেখ করার মতো। ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠানটি জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি লাভ করে। দীর্ঘ বিরতির পর সরকার ২০১৬ সাল থেকে পুনরায় জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ উদযাপনের নীতিমালার আলোকে শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঘোষণার কর্মসূচি গ্রহণ করে। ২০১৬ সাল থেকে ২০১৯ পর্যন্ত পর পর চারবার চট্টগ্রাম বিভাগের শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।

একাডেমিক সাফল্যের ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠানটির ধারাবাহিক সাফল্য ঈর্ষণীয় পর্যায়ের। ১৯৯৫ সালে তৎকালীন কুমিল্লা  শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এইচএসসি পরীক্ষায় ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ থেকে সম্মিলিত তালিকায় প্রথম স্ট্যান্ড করার গৌরব অর্জন করে প্রতিষ্ঠানের ছাত্রী কাজী ফারহানা হক। ১৯৯৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় মানবিক শাখা থেকে সম্মিলিত তালিকায় প্রথম হন শায়লা শিমুল। ১৯৯৭ সালে এসএসসি বিজ্ঞান বিভাগ থেকে সম্মিলিত প্রথম স্ট্যান্ড করেন এহসানুল হক ইমন। ১৯৯৮ সালে এইচএসসি সম্মিলিত প্রথম স্ট্যান্ড করেন সৈয়দ আতিকুল কবির মাহমুদ।

কর্মক্ষেত্রেও এই প্রতিষ্ঠানের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অবদান রেখে চলেছেন। বর্তমানে ব্রাজিলে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এই প্রতিষ্ঠানের ১৯৮৬ এসএসসি ব্যাচের ছাত্রী সাদিয়া ফয়জুন্নেসা। দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রেও এ প্রতিষ্ঠানের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। সংরক্ষিত আসন-৬-এর সংসদ সদস্য খাদিজাতুল আনোয়ার এই প্রতিষ্ঠানেরই প্রাক্তন শিক্ষার্থী।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের এই যুগে বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও অবদান রেখে চলেছেন এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। ২০১৬ সালের এসএসসি ব্যাচের কৃতী ছাত্রী দেবযানী ঘোষ জার্মানিতে আরো দুজন সহবিজ্ঞানীর সঙ্গে প্রথম কার্বন নিঃসরণমুক্ত বিমান আবিষ্কার করেন। আঞ্চলিক ও জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় প্রতিষ্ঠানের রয়েছে ধারাবাহিক সাফল্য। ডিজিটাল বাংলাদেশ পুরস্কার-২০২১-এ জেলা পর্যায়ে মনোনীত হয়েছে এ প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিযোগিতায়ও জাতীয় পর্যায়ে পুরস্কার লাভ করবে বলে আশা করা যায়।

যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলা চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজের বর্তমান পরিসর বেশ বড়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম সেনানিবাসের দক্ষিণ-পূর্ব পাশে ২০ একর জায়গা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত। ১৯৬১ সালে স্থাপিত দোতলা মূল ভবনের বাইরেও রয়েছে আধুনিক একাডেমিক ভবন। গুণগত শিক্ষা নিশ্চিতকল্পে শিক্ষা উপযোগী যে অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা প্রয়োজন, এর সবই এখানে বিদ্যমান। স্কুল শাখার বাংলা ও ইংরেজি ভার্সনের শিক্ষার্থীদের জন্য ডিজিটাল শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনার উপযোগী শ্রেণিকক্ষসহ পাঁচতলা একাডেমিক ভবন রয়েছে। উচ্চ মাধ্যমিক শাখার বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভার্সনের জন্য রয়েছে ছয়তলা একটি একাডেমিক ভবন। বিবিএ প্রফেশনাল ও ব্যবস্থাপনা (সম্মান) শ্রেণির কার্যক্রম পরিচালনার জন্য রয়েছে তিন ও চারতলা দুটি পৃথক ভবন। ভবনগুলো সবুজ পাহাড়ঘেরা এবং আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন। ভবনগুলোর স্থান নির্বাচনেও বিবেচনা করা হয়েছে পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার যৌক্তিকতা।

প্রতিটি ভবন থেকেই অবারিত সবুজ অবলোকনের সুযোগ রয়েছে। চিরসবুজ এই ক্যাম্পাস জীববৈচিত্র্যের এক অভয়ারণ্য। শিক্ষার্থীরা এখানে অনায়াসে দেখতে পায় মুক্ত প্রকৃতিতে বিচরণ করা হরিণ, বন্য বরাহ, বানর, অজগর, গুইসাপসহ রকমারি সরীসৃপ প্রাণী। প্রায় ৪০০ প্রজাতির বিপুল পরিমাণ লতা, গুল্ম ও বৃক্ষরাজিতে এখানে নিরাপদ বাস গড়েছে কোকিল, টিয়াসহ পাখিকুল।

জাতীয় বৃক্ষরোপণ প্রতিযোগিতায় এ প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে অর্জন করেছে প্রধানমন্ত্রী পদক। প্রাণিবৈচিত্র্য আর সবুজের সজীবতায় এমন সুন্দর ক্যাম্পাস বাংলাদেশে দ্বিতীয়টি মেলে না।

স্কুল, কলেজের জন্য রয়েছে পৃথক অত্যাধুনিক কম্পিউটার ল্যাব। কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে মজুদ আছে প্রায় ১৩ হাজার বই। দেড় হাজার বই সংরক্ষিত আছে সম্মান শাখার সেমিনারকক্ষে। সহপাঠ কার্যক্রম পরিচালনা ও সভা-সেমিনার করার জন্য আছে এক হাজার ২০০ আসনের একটি মিলনায়তন। খেলাধুলা ও প্রাত্যহিক সমাবেশ পরিচালনার জন্য আছে পৃথক দুটি বিস্তৃত পরিসরের খেলার মাঠ।

অভিভাবকদের জন্য রয়েছে আধুনিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত অপেক্ষাগার। বিএনসিসি, রোভার স্কাউট, গার্ল গাইডস, রেড ক্রিসেন্ট, সাংস্কৃতিক ক্লাব, বিজ্ঞান ক্লাব, সংগীত ক্লাব, বিতর্ক ক্লাব, ফটোগ্রাফি ক্লাব, বিজনেস ক্লাবসহ নানা সহপাঠ কার্যক্রমে রয়েছে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততা। সাম্প্রতিক অতীতে করোনা মাহামারিতে প্রতিষ্ঠানের রোভার স্কাউট দল চট্টগ্রাম মহানগরীর ২৮টি পয়েন্টে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে এবং মাস্ক বিতরণ করে।

দেশের জন্য যোগ্য, দক্ষ ও সুশৃঙ্খল সুনাগরিক গড়ার প্রত্যয় নিয়ে মানবসম্পদ তৈরির ক্ষেত্রে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজ। বিগত দিনে শুধু বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতেই অফিসার পদে যোগদান করেছেন শতাধিক শিক্ষার্থী। দিনে দিনে অগ্রসরমান এই প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক কার্যক্রম আরো প্রসারিত হতে চলেছে। স্নাতকোত্তর পর্যায়ে এমবিএ প্রগ্রাম প্রতিষ্ঠানে অচিরেই চালু হতে যাচ্ছে।

জাতীয় পর্যায়ে অবদান রেখে চলা প্রতিষ্ঠানটির গৌরবের হীরক জয়ন্তী উদযাপনের লক্ষ্যে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, মনুমেন্ট উদ্বোধন, হীরক জয়ন্তী উপলক্ষে প্রকাশিত স্মারকগ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, স্মৃতিচারণাসহ নানা অনুষ্ঠানে সাজানো হয়েছে এই বিশেষ দিবসের আয়োজন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল মো. সাইফুল আবেদীন।

লেখক : অধ্যক্ষ, চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজ



সাতদিনের সেরা