kalerkantho

বুধবার । ৪ কার্তিক ১৪২৮। ২০ অক্টোবর ২০২১। ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

কেউ অসুস্থ হলে বিপদ

নিখিল ভদ্র, উপকূল থেকে ফিরে   

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কেউ অসুস্থ হলে বিপদ

পদ্মপুকুর ইউনিয়নের পাখিমারা গ্রাম থেকে নৌকায় দুই ঘণ্টার পথ মুন্সীগঞ্জ বাজার। সেখান থেকে গাড়িতে আরো এক ঘণ্টার দূরত্বে শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। ফলে জরুরি চিকিৎসাসেবার প্রয়োজন পড়লে কঠিন বিপদে পড়তে হয় ওই গ্রামের মানুষকে। আগে ইউনিয়ন কমিউনিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র চালু থাকলেও পানিবন্দি হয়ে পড়ার পর থেকে সেটিও বন্ধ।

সাতক্ষীরার শ্যামনগরের পাখিমারা গ্রামের অন্তঃসত্ত্বা সাহিদা খাতুন (২৮) নিজে বাঁচলেও সন্তানকে বাঁচাতে পারেননি। হাসপাতালে নেওয়ার পথে নৌকাতেই প্রসব হয় নবজাতকের। চিকিৎসাসেবার অভাবে জন্মের পর মারা যায় কন্যাসন্তানটি।

একই ধরনের দুঃখের কাহিনি শোনান আশাশুনির প্রতাপনগর গ্রামের দিনমজুর নূর ইসলাম। তিনি জানান, গেল বছর ঘূর্ণিঝড় আম্ফান আঘাতের পর এলাকা ছিল পানির নিচে। এর মধ্যেই তাঁর স্ত্রী হালিমার সন্তান প্রসবের সময় হয়। তখন গ্রামের ডাক্তারের কাছে নেওয়া হলেও কাজ হয়নি। পরে তিনি নৌকায় হালিমাকে নিয়ে যান নদীর ওপারে শ্যামনগরের একটি ক্লিনিকে। মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যেই হালিমা মা হতে পারলেও নবজাতক নিউমোনিয়াসহ ঠাণ্ডাজনিত অসুখে পড়ে। শেষ পর্যন্ত তাকেও বাঁচানো যায়নি।

সুচিকিৎসা না পাওয়ার কারণে মা হওয়ার আগেই মারা গেছেন কয়রার আংটিহারা গ্রামের খাদিজা আক্তার (২৬)। একই ছবি কয়রার হাজতখালী গ্রাম কিংবা আশাশুনির কুড়িকাহুনিয়া গ্রামের। উপকূলের দুর্গম এলাকাগুলোতে মাতৃ ও শিশু মৃত্যুহারও ২ থেকে ৩ শতাংশ বলে জানিয়েছে শ্যামনগর উপজেলা পরিষদ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, লবণ পানির আগ্রাসন এবং বারবার দুর্যোগকবলিত হওয়ায় খুলনা-সাতক্ষীরা অঞ্চলে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। প্রান্তিক এলাকায় চিকিৎসাব্যবস্থা অপ্রতুল। স্থানীয় পর্যায়ের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় মানুষের আস্থা নেই। প্রাকৃতিক দুর্যোগ এসব অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। এর ওপর চিকিৎসার মতো জরুরি প্রয়োজনে অতিরিক্ত ব্যয় করা তাদের পক্ষে কঠিন।

প্রত্যন্ত গ্রামগুলো থেকে চিকিৎসাসেবা কেন্দ্র অনেক দূরে। ওয়ার্ড পর্যায়ের কমিউনিটি স্বাস্থ্য ক্লিনিক অথবা ইউনিয়ন পর্যায়ে ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মানুষের ভরসা নেই। এরপর বেড়িবাঁধ ভেঙে এলাকা লবণ পানিতে প্লাবিত হওয়ায় অনেক স্বাস্থ্যকেন্দ্র বন্ধ আছে। যোগাযোগব্যবস্থা খারাপ হওয়ায় সড়কপথে উপজেলা সদরে যাওয়া কঠিন। মুমূর্ষু রোগী নিয়ে যাতায়াতে একমাত্র ভরসা নদীপথ। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স শুধু দূরে তাই নয়, আছে সেবার অপ্রতুলতা। কয়েকজন চিকিৎসক থাকলেও সেখানে নেই কোনো বিশেষজ্ঞ। তাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা সম্ভব না হলে বিভাগীয় সদর খুলনা বা জেলা সদর সাতক্ষীরায় যেতে হয়।

ভিটেমাটি ছেড়ে বাঁধের ওপর বাসকারী বন্যাতলা গ্রামের হাফিজুর রহমান বলেন, ‘রাতে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে বিপদের শেষ থাকে না। এখান থেকে শহরের ভালো ডাক্তারের কাছে রোগী পাঠানো খুবই কঠিন। তাই অনেক সময় গ্রাম্য ডাক্তারের কাছে যেতে হয়। তখন মুমূর্ষু রোগীর জীবন বাঁচানো যায় না। চারদিকে লোনা পানিতে সবাই বন্দি হয়ে আছে।’

কয়রার সর্ব দক্ষিণের গ্রাম ঘড়িলালের দূরত্ব উপজেলা সদর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার। এই গ্রামের বাসিন্দা কামরুল ইসলাম সিকদার বলেন, ‘উপজেলা সদরে গিয়ে জরুরি চিকিৎসা নেওয়া কঠিন। যোগাযোগব্যবস্থা খুবই খারাপ। বেশির ভাগ সময় নৌপথে যাতায়াত করতে হয়।

পানিবন্দি এলাকার নারীদের গর্ভধারণ ও সন্তান জন্মদানে সমস্যার কথা জানালেন সেখানকার নারীরা। এলাকার বেশির ভাগ নারীর প্রথম সন্তান গর্ভপাতের কারণে নষ্ট হচ্ছে। অনেকে গর্ভপাতের কারণে দীর্ঘ সময় সন্তান নিতে পারছেন না। এমন ঘটনা ঘটছে অহরহ। ২০১২ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে ১২ হাজার ৮৬৭ জন অন্তঃসত্ত্বা নারীকে নজরদারিতে রেখেছিল ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ডায়রিয়াল ডিজিজ রিসার্চ, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি)। তাঁদের মধ্যে উপকূলীয় ও পাহাড়ি এলাকার নারীরা রয়েছেন।

সমীক্ষায় দেখা গেছে, পাহাড়ি বা উঁচু এলাকায় বসবাসকারী নারীদেও চেয়ে উপকূলীয় এলাকা বা সমুদ্রের ২০ কিলোমিটারের মধ্যে বসবাসকারী নারীদের গর্ভপাত হওয়ার প্রবণতা বেশি। যার হার ১১ শতাংশ। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, আপাতত পার্থক্যটি কম বলে মনে হলেও সমুদ্রের কাছে সমতলে থাকা নারীদের মধ্যে এই প্রবণতা বাড়ছে। তাঁরা যে পানি খাচ্ছেন, এর মধ্যে কী পরিমাণ লবণ রয়েছে তার ওপর এই পার্থক্যটি নির্ভর করে।

খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক মিঠুন দেবনাথ বলেন, ‘এই অঞ্চলের প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ লবণাক্ত পানি পান করছে। অন্তঃসত্ত্বা নারীদের জন্য এটা বড় সমস্যার কারণ। কেননা লবণের কারণে উচ্চ রক্তচাপ বাড়ছে। অন্তঃসত্ত্বা নারীদের উচ্চ রক্তচাপ দেখা দিলে এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে অনেক ধরনের সমস্যা দেখা দেয়।’ তিনি আরো বলেন, ‘লবণ পানির কারণে এই এলাকার মানুষের চর্মরোগ, পেটের পীড়া ও উচ্চ রক্তচাপ কমন সমস্যা। তবে সবচেয়ে বেশি সমস্যা অন্তঃসত্ত্বা নারীদের। এখানকার নারীদের অপরিণত সন্তান প্রসব, ভ্রূণ নষ্ট হওয়া এবং জরায়ু রোগে আক্রান্ত হওয়ার হার অন্য যেকোনো উপজেলার চেয়ে বেশি।

শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে গিয়েছিলেন বুড়িগোয়ালিনী গ্রামের কাকলি ঘরামী। চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ফেরার পথে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। তিনি জানান, বেশির ভাগ সময় তাঁর পেটের সমস্যা থাকে। সারা দিন লবণ পানিতে কাজ করায় এই এলাকার বেশির ভাগ মানুষেরই চামড়া সাদাটে হয়ে গেছে। এমনকি ঘাও দেখা দেয়।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা লিডার্সের ‘ইমপ্যাক্ট অব স্যালাইনিটি অন উইমেন হেলথ ইন কোস্টাল বাংলাদেশ’ শীর্ষক সমীক্ষায় দেখা গেছে, মাত্রাতিরিক্ত লোনা পানি দৈনন্দিন ব্যবহারের ফলে নারীরা জরায়ুসংক্রান্ত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন, যা পরবর্তী সময়ে ক্যান্সারে রূপান্তরিত হওয়ার শঙ্কা থাকে।

সাতক্ষীরা-২ আসনের সংসদ সদস্য মীর মোস্তাক আহমেদ রবি বলেন, ‘প্রান্তিক জনপদের মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে এখনো অনেক সমস্যা আছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা বড় বাধা। এখনো অনেক স্থানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পদগুলো পূরণ করা যায়নি। অনেক স্থানে অবকাঠামোগত সমস্যা আছে। তবে সংকট উত্তরণে প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার এরই মধ্যে কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছে। দ্রুতই এসব সমস্যার সমাধান হবে।’

 



সাতদিনের সেরা