kalerkantho

রবিবার । ১ কার্তিক ১৪২৮। ১৭ অক্টোবর ২০২১। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

উদ্যোক্তার ভরসা সমিতি!

ফারজানা লাবনী   

২১ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



উদ্যোক্তার ভরসা সমিতি!

দেশের ৭০ শতাংশ এসএমই (ক্ষুদ্র ও মাঝারি) উদ্যোক্তা ঋণ নিতে ব্যাংকে না গিয়ে তাঁর এলাকার মধ্যে অবস্থিত বিভিন্ন এনজিও বা সমিতির কাছে যান। এসএমই উদ্যোক্তাদের ৬৫ শতাংশই মনে করে বড় ব্যবসায়ীরাই শুধু ব্যাংক থেকে ঋণ পাবেন। ৪৫ শতাংশ এসএমই উদ্যোক্তা জানেন না ব্যাংকে কার সঙ্গে যোগাযোগ করলে ঋণ পাওয়া যাবে।

ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিতে আগ্রহী এসএমই উদ্যোক্তার ৭৮ শতাংশেরই ট্রেড লাইসেন্স, ইটিআইএন বা দোকান ভাড়ার চুক্তিপত্রসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নেই। এতে তারা ঋণ, সরকারি প্রণোদনা, অনুদানসহ অন্যান্য সুবিধা পায় না।   

এসএমই খাতের চলমান সমস্যা ও সমাধান নিয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন এসএমইএসডিপি শাখা, এসএমই ফাউন্ডেশন, উন্নয়ন অন্বেষণ, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের উদ্যোক্তাদের সংগঠন নাসিব এবং বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ (পিআরআই) থেকে পাওয়া পৃথক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এই চিত্র পাওয়া যায়। 

শিল্পসচিব জাকিয়া সুলতানা কালের কণ্ঠকে বলেন, এসএমই খাতের উন্নয়নে সরকার বেসরকারি খাত ও অর্থনীতি বিশ্লেষকদের নিয়ে সুশৃঙ্খলভাবে কাজ করছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও অর্থনীতি বিশ্লেষক ড. আতিউর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এসএমই খাত বাদ দিয়ে দেশের শিল্প খাতের উন্নয়ন হবে না। এই খাতের উদ্যোক্তাদের বিভিন্ন সুবিধা দিতে হলে তাদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে কাজ করতে হবে।’

প্রতিবেদন দুটি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এই খাতে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সরকারের তহবিল আছে, যা বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে ঋণ হিসাবে দেওয়া হয়। কিন্তু এই তথ্য তৃণমূলের এসএমই উদ্যোক্তাদের ৩৩ শতাংশই জানে না। নারী উদ্যোক্তারা সঠিকভাবে ঋণ পরিশোধ করলে ৫ শতাংশ ক্যাশ ইনসেনটিভ পাবেন, তা ৬৭ শতাংশই জানে না। অনলাইন ব্যবসার যন্ত্রপাতি (মোবাইল, ল্যাপটপ) কেনার জন্য ঋণ দেওয়া হয়, তা-ও জানা নেই তাদের। অনেক ধরনের এসএমই ঋণের জন্য নারী উদ্যোক্তাদের কোনো ‘গ্যারান্টার’ দরকার নেই কিংবা ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তথ্য জানতে বা ঋণ নিতে গেলে ভোগান্তির শিকার হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের হেল্পলাইন নম্বর ৯৫৩০২২০-এ যোগাযোগ করা যায়, সে তথ্যও এ দেশের এসএমই খাতের বেশির ভাগ নারী উদ্যোক্তা জানেন না।

প্রতিবেদন দুটিতে বলা হয়েছে, এসএমই উদ্যোক্তারা নিজেদের উৎপাদিত পণ্যের ২৫ শতাংশ এলাকার মধ্যে, ৬৫ শতাংশ কাছাকাছি এলাকায় এবং বাকিগুলো রাজধানীতে বিক্রি করেন।      

প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এসএমই খাতের অবদান ২৫ শতাংশ। এ ছাড়া মোট শিল্প খাতের ৯০ শতাংশই এসএমই। ২০১৩ সালের অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান অনুসারে দেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৭৮ লাখের বেশি। করোনাভাইরাসের কারণে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের ব্যবসা শিল্প থেকে রাজস্ব আদায় ৬৬ শতাংশ কমেছে, ৭৬ শতাংশ পণ্য অবিক্রীত আছে। এই খাতের ৪২ শতাংশ কর্মীকে আংশিক বেতন দেওয়া সম্ভব হলেও ৪ শতাংশকে বেতনই দেওয়া যায়নি। এসএমই শিল্প প্রতিষ্ঠান শহরের চেয়ে উপজেলা পর্যায়ে বেশি গড়ে উঠেছে। এসএমই উদ্যোক্তাদের মধ্যে পুরুষের চেয়ে নারীর সংখ্যা বেশি। সাধারণত নারীরা তাঁদের নিজের গয়না ও বাবার বাড়ি থেকে প্রাপ্ত সম্পত্তি বিক্রি করে, ধারদেনার অর্থে বা অল্প অল্প করে নিজের জমানো কিছু সঞ্চয় দিয়ে এসএমই খাতের ব্যবসা শুরু করেন।

প্রতিবেদন দুটিতে বলা হয়েছে, এসএমই উদ্যোক্তাদের ৯০ শতাংশই পণ্যের বাজার সম্প্রসারণে বিজ্ঞাপন ও পণ্যের গুণগত মানের উন্নয়নে প্রযুক্তির ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতন না। পর্যাপ্ত পুঁজির অভাবে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে পারে না ৬৯ শতাংশ। কিস্তিতে যন্ত্রপাতি কেনার তথ্য এসএমই উদ্যোক্তাদের ৭৩ শতাংশই জানে না।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খুব সহজ উপায়ে পর্যাপ্ত পুঁজি প্রকৃত এসএমই উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। ভারত এসএমই খাতে করোনাকালীন প্রণোদনা প্যাকেজের ৩৮ শতাংশ, থাইল্যান্ড ৩৩ শতাংশ, মালয়েশিয়া ২৪ শতাংশ এবং বাংলাদেশ ২২ শতাংশ বরাদ্দ দিয়েছে।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, এ দেশে এসএমই খাতের উন্নয়নে ক্লাস্টারভিত্তিক কৌশল নিতে হবে। ঋণ বিতরণ প্রক্রিয়ায় ব্যাংক ও মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সংযোগ তৈরি, ব্যাংক-গ্রাহক সম্পর্কের উন্নয়ন, রপ্তানিমুখী এসএমই উদ্যোক্তা ও নারী উদ্যোক্তাদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সুফল পেতে হলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বা আইসিটির ব্যবহার বাড়াতে হবে। পণ্যের গুণগত মানের উন্নয়নে এসএমই শিল্প-কারখানায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে আর্থিক সহায়তা বা অল্প সুদে ঋণ দিতে হবে। এসএমই খাতের উন্নয়নে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে। এসএমই খাতের সংগঠনের মাধ্যমে এসএমই উদ্যোক্তাদের সহযোগিতা করা সহজ হবে।

 



সাতদিনের সেরা