kalerkantho

বুধবার । ৭ আশ্বিন ১৪২৮। ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৪ সফর ১৪৪৩

প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনই এখন বড় চ্যালেঞ্জ

কাজী হাফিজ   

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনই এখন বড় চ্যালেঞ্জ

দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন এবং নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি বাড়ানোই এখন নির্বাচন কমিশনের (ইসি) জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ বর্তমান কমিশনের মেয়াদপূর্তির বাকি পাঁচ মাসে যেসব নির্বাচন হবে সেগুলো কতটা অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু হবে, তা নিয়ে সংশয় দূর হচ্ছে না।

কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন বর্তমান নির্বাচন কমিশন নভেম্বর মাসের মধ্যেই প্রায় সাড়ে চার হাজার ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) নির্বাচন করতে চায়। আগামী ২০ সেপ্টেম্বর প্রথম ধাপের স্থগিত ১৬১টি ইউনিয়ন পরিষদ ও ৯টি পৌরসভায় ভোট হতে যাচ্ছে।

জাতীয় সংসদের কুমিল্লা-৭ আসন এবং বিভিন্ন স্থানীয় সরকারের ২৩টি প্রতিষ্ঠানে আগামী ৭ অক্টোবর ভোটের তারিখ নির্ধারণ করে তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ১২টি উপজেলা পরিষদ, ছয়টি পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের পাঁচটি ওয়ার্ডের উপনির্বাচন। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের জন্যও প্রস্তুতি নিচ্ছে কমিশন।

প্রথম ধাপে ৩৭১ ইউপিতে নির্বাচন হওয়ার কথা। এর মধ্যে ৭৩টিতে বিনা ভোটে নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা ঘটে গেছে। বিএনপিসহ নিবন্ধিত বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল তাদের দলীয় প্রতীকে এ নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় পরবর্তী ধাপের নির্বাচনগুলোতেও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘটনা আরো বাড়তে পারে বলে নির্বাচন কর্মকর্তাদের আশঙ্কা।

আগামী ৭ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় উপজেলা পরিষদের উপনির্বাচনে নরসিংদী সদর, ফেনী সদর ও নেত্রকোনার খালিয়াজুরীতে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের তিন প্রার্থী ছাড়া অন্য কোনো প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দেননি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তৃণমূল পর্যায়ের এসব নির্বাচন ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণমূলক হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তা না হওয়াটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য অনুকূল নয়।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন খান এ অবস্থা সম্পর্কে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নির্বাচনের এ অবস্থা দেখে আমরা হতাশ। নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতিও কমেছে। ভোটারদের মনে এই ধারণা জন্মেছে যে ভোট দেওয়া না দেওয়ায় কিছু আসে যায় না। নানা ধরনের চাপ ও ভয়ভীতির কারণে অনেকে নির্বাচনে প্রার্থী হতে চান না। প্রার্থী হয়েও পরে প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হন। এর ফলে একক প্রার্থী বা বিনা ভোটে নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা বাড়ছে। দেশে নির্বাচন ব্যবস্থা যে ভেঙে পড়েছে তার উদাহরণ এই বিনা ভোটের নির্বাচন।’ 

গতকাল মঙ্গলবার ‘আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস ২০২১’ উপলক্ষে দেওয়া এক বিবৃতিতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “একটি দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কতটা শক্তিশালী, তা নির্ভর করে দেশটির নির্বাচন ব্যবস্থা এবং সংসদীয় কার্যাবলির মধ্য দিয়ে। কিন্তু অনেক বছর ধরেই আমাদের নির্বাচন কমিশন কেমন যেন রুটিন দায়িত্বের অংশ হিসেবে শুধু ভোটের আয়োজনেই সন্তুষ্ট; অংশগ্রহণমূলক, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোট হলো কি না, তা নিয়ে তাদের ‘মাথাব্যথা’ নেই।”

নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের তথ্য অনুসারে, ইউপি নির্বাচনের প্রথম ধাপে যে ৭৩টিতে চেয়ারম্যান পদে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন, তাতে বাগেরহাটের আছে ৪০টি ইউপি। ২০১৬ সালের ইউপি নির্বাচনেও বাগেরহাট এ ক্ষেত্রে শীর্ষে ছিল। এবার প্রথম ধাপে বাগেরহাট ছাড়াও বরিশাল জেলায় ১৪টি, পটুয়াখালীতে দুটি, পিরোজপুরে চারটি, ভোলায় সাতটি, গাজীপুরে দুটি এবং চট্টগ্রামে চারটি ইউপিতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘটনা ঘটেছে। চেয়ারম্যান পদ ছাড়াও সাধারণ সদস্য পদে ৬৮ জন এবং নারীদের জন্য সংরক্ষিত ওয়ার্ডের সদস্য পদে আটজন একইভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। নির্বাচন থেকে সরে এসেছেন বা প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছেন এক হাজার ৮০ জন। তাঁদের অনেককে ভয়ভীতি দেখিয়ে বা জোরপূর্বক নির্বাচন থেকে সরানোর অভিযোগ আছে।

নির্বাচন কমিশন প্রকাশিত ইউনিয়ন পরিষদ সাধারণ নির্বাচনের প্রতিবেদন অনুসারে, ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে ১০০ জন ইউপি চেয়ারম্যান ও ৬০০ জন ইউপি সদস্য বিনা ভোটে নির্বাচিত হন। ১৯৯২ সালে চারটিতে চেয়ারম্যান ও সদস্য সবাই এভাবে নির্বাচিত হন। ১৯৯৭ সালে ৩৭ জন চেয়ারম্যান, সংরক্ষিত ওয়ার্ডের ৫৯২ জন সদস্য এবং সাধারণ ওয়ার্ডের এক হাজার ৯৬ জন সদস্য বিনা ভোটে নির্বাচিত হন। ২০০৩ সালে ৩৪ জন চেয়ারম্যান, সংরক্ষিত ওয়ার্ডের ৪৫২ জন সদস্য এবং সাধারণ ওয়ার্ডের ৬৫১ জন সদস্যের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না। ২০১১ সালে এ ধরনের ঘটনার কোনো তথ্য নির্বাচন কমিশনে নেই। ২০১৬ সালের ইউপি নির্বাচনে প্রায় ২০০ চেয়ারম্যান বিনা ভোটে নির্বাচিত হন। জাতীয় সংসদ, উপজেলা ও পৌরসভা নির্বাচনেও একই ধরনের ঘটনা ঘটছে।

ফেনী স্টাইল : বিনা ভোটে নির্বাচিত হওয়ার ক্ষেত্রে ফেনীর নামটি আলোচিত। গত ৩০ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ফেনী পৌরসভার নির্বাচনে সংরক্ষিত ও সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলরের ২৪টি পদের মধ্যে ১৫টিতে বিনা ভোটে নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা ঘটে। ২০১৫ সালের পৌরসভা নির্বাচনেও এ পৌরসভায় মেয়র এবং সংরক্ষিত ও সাধারণ ওয়ার্ডের ২৩টিতে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী না থাকায় ভোটের প্রয়োজন হয়নি। গত ১৬ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ফেনীর দাগনভূঞা পৌরসভার নির্বাচনে সাধারণ ওয়ার্ডের চারজন এবং সংরক্ষিত তিনটি ওয়ার্ডের সবাই বিনা ভোটে নির্বাচিত হন। এ ছাড়া গত ১৪ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত পরশুরাম পৌরসভায় মেয়র, সংরক্ষিত ওয়ার্ড ও সাধারণ ওয়ার্ডের সব কটিতেই একক প্রার্থী থাকায়  সেখানেও ভোটের প্রয়োজন হয়নি। ২০১৫ সালেও একই কারণে এ পৌরসভায় ভোটারদের ভোট দিতে হয়নি। ওই সময় ফেনীর তিনটি পৌরসভায় ভোটের আগেই ৯০ শতাংশের বেশি প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হওয়ার নজির সৃষ্টি করেন। স্থানীয় সরকারের অন্যান্য নির্বাচনেও ফেনীতে একই অবস্থা সৃষ্টি হয়। এবার এই স্টাইলের নির্বাচন কুমিল্লার লাকসামসহ আরো কয়েকটি পৌরসভায় দেখা গেছে। বিনা ভোটে নির্বাচিতরা সবাই ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী।



সাতদিনের সেরা