kalerkantho

সোমবার । ৯ কার্তিক ১৪২৮। ২৫ অক্টোবর ২০২১। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন

সংবিধান অনুসারে আইন প্রণয়নের পক্ষে বেশি মত

কাজী হাফিজ   

১১ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



সংবিধান অনুসারে আইন প্রণয়নের পক্ষে বেশি মত

কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ শেষ হতে এখনো পাঁচ মাসের বেশি সময় বাকি। প্রধান নির্বাচন কমিশনার নুরুল হুদাসহ পাঁচ নির্বাচন কমিশনারের মেয়াদ শেষ হবে আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু এরই মধ্যে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকের প্রশ্ন, এবারও কি রাষ্ট্রপতি গঠিত একটি অনুসন্ধান কমিটির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন গঠন করা হবে, নাকি সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগের আইন প্রণয়ন করে সে আইনের মাধ্যমে কাজটি সম্পন্ন হবে।

আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক এ বিষয়ে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে সার্চ কমিটির মাধ্যমে যোগ্য ব্যক্তিদের নির্বাচন কমিশনের সদস্য হিসেবে নিয়োগ দিয়ে থাকেন। যদিও আমাদের সংবিধানে নির্বাচন কমিশনের সদস্যদের নিয়োগ দেওয়ার জন্য আইন করার কথা বলা আছে। এই আইনটি আমরা এখনো করতে পারিনি। এ কারণে সার্চ কমিটির মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। এটাও আইনসিদ্ধ। তবে আমরা নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগে আইন করার কথা খুবই গুরুত্ব সহকারে নিয়েছি। এটা নিয়ে আমরা সিরিয়াসলি কাজ করছি।’

তবে আগামী ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের আগে এই আইন প্রণয়ন সম্ভব কি না, সে বিষয়ে মন্ত্রী স্পষ্ট করে কিছু বলেননি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এবারও রাষ্ট্রপতি গঠিত সার্চ কমিটির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের সম্ভাবনা বেশি। তবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং সুধীসমাজের পক্ষ থেকেও নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের জন্য সংবিধান অনুসারে আইন প্রণয়নের ওপরই জোর দেওয়া হচ্ছে।

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা গোলাম মোহাম্মদ কাদের কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করার জন্য একটি আইন প্রণয়ন প্রয়োজন। সমাজের বিভিন্ন স্তরের বিশেষজ্ঞ এবং যেসব রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে; সংসদে যেসব দলের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে, এমন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে আইন তৈরি করে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করতে হবে। এমন একটি নির্বাচন কমিশন গঠন করতে হবে, যাদের নেতৃত্বে দেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।’

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক মো. শাহ আলম বলেন, প্রতিবার কমিশন গঠনের সময় বিতর্ক দেখা দেয়। অথচ এ সমস্যার স্থায়ী সমাধানে সংবিধানে আইন প্রণয়নের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ক্ষমতাসীন দলগুলো নির্বাচন কমিশনকে কুক্ষিগত রাখতে সেই কাজটি করেনি। তিনি বলেন, সংবিধানের নির্দেশনা মোতাবেক আইন প্রণয়নের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা উচিত। যদিও ভোটারবিহীন নির্বাচনে ক্ষমতাসীন সরকারের আমলে এটা হবে না। তাই জনগণের কাঙ্ক্ষিত নির্বাচন কমিশন গঠনের স্বার্থে গণ-আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

আইনের শিক্ষক ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে সার্চ কমিটি গঠন করে নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ দেওয়ার আইনগত কোনো ভিত্তি নেই। সংবিধান অনুসারে আইন না করে যেভাবে নির্বাচন কমিশন গঠন করা হচ্ছে, তা সংবিধানের পরিপন্থী। প্রায় ৫০ বছরে সংবিধান নির্দেশিত এ বিষয়ে আইন না হওয়াটা দুঃখজনক। আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোতেও এসংক্রান্ত আইন রয়েছে। আইন প্রণয়ন করে সে আইনের মাধ্যমে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্তদের মাধ্যমে সার্চ কমিটি গঠন করতে হবে। সার্চ কমিটি পাঁচজন নির্বাচন কমিশনারের জন্য সাতটির বেশি নাম দিতে পারবে না—এমন বিধানও রাখতে হবে। তা না হলে, বেশি নাম দিলে সরকার নিজের পছন্দের লোকজনকেই নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ দেবে। সরকারের পছন্দের লোকজন নির্বাচন কমিশনে দায়িত্ব পালন করবে—এটা কাম্য হতে পারে না।’

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বরকতউল্লা বুলু বলেন, ‘বুদ্ধিজীবী, সব রাজনৈতিক দল ও স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে গ্রহণযোগ্যতা থাকবে, যাদের মাধ্যমে ভোটে মানুষের আস্থা থাকবে সে ধরনের নির্বাচন কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া হলে আমরা আলোচনায় বসব।’

দলের ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, নিরপেক্ষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যদি নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয় তাহলে বিএনপি আলোচনায় অংশ নেবে। অন্য কোনো প্রক্রিয়ায় গেলে বিএনপি আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায় করবে।

প্রসঙ্গত, ড. হুদার নেতৃত্বাধীন কমিশন বিদায় নেওয়ার আগে ২০১১ সালে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের জন্য আইন প্রণয়নের যে প্রস্তাব নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে বসে তাতে একজন প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও একজন নারীসহ দুজন নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের কথা বলা হয়েছিল। ‘প্রমাণিত প্রশাসনিক দক্ষতা’ হবে এ পদের অন্যতম যোগ্যতা। এ নিয়োগে প্যানেল তৈরির জন্য একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠন করা হবে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এই কমিটির সদস্য ও আহ্বায়ক থাকবেন।

এ ছাড়া প্রধান বিচারপতি মনোনীত হাইকোর্টের একজন বিচারক, দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান, সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান এবং মহাহিসাব রক্ষক ও নিয়ন্ত্রক এ কমিটির সদস্য হবেন। কমিটি প্রতিটি পদের জন্য তিনজনের নাম নির্ধারণ করবে। কমিটির কাজ পরিচালনার নিয়মাবলিও ওই কমিটি তৈরি করবে। প্যানেল প্রস্তুতের পর তা জাতীয় সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটির পরীক্ষার জন্য প্রধানমন্ত্রীর অফিসে পাঠাতে হবে। সাধারণভাবে সৎ বলে বিবেচিত না হলে, বৈধ আয়ের ভিত্তিতে জীবন নির্বাহ না করলে, জাতীয় ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের সদস্য হলে, কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলে এবং ঋণখেলাপি হলে কোনো ব্যক্তিকে ওই প্যানেলে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না। ওই প্যানেল থেকে রাষ্ট্রপতি যেকোনো ব্যক্তিকে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ করবেন। এসব পদে নিয়োগ পাওয়ার জন্য যোগ্যতার ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকবে না। কার্য উপদেষ্টা কমিটি ওই প্যানেল পরীক্ষা করে চূড়ান্ত করবে।

কিন্তু আইন প্রণয়ন না করেই ২০১২ সালের ২২ জানুয়ারি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের উদ্যোগে গঠন করা হয় নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগের জন্য সার্চ কমিটি। এ ধরনের কমিটি গঠন ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে চার সদস্যের ওই সার্চ কমিটির কাছে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত আওয়ামী লীগসহ ২৩টি দল নাম প্রস্তাব পাঠালেও বিএনপিসহ ১৬টি দল কোনো প্রস্তাব পাঠায়নি। বিএনপি ও তাদের জোটের দলগুলো ওই সার্চ কমিটি প্রত্যাখ্যান করে প্রথমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানায়।

বর্তমান নির্বাচন কমিশনও গঠন করা হয় রাষ্ট্রপতির গঠন করা সার্চ কমিটির মাধ্যমে। ১৮ ডিসেম্বর থেকে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সঙ্গে বঙ্গভবনে মোট ৩১টি রাজনৈতিক দলের সংলাপ হয়। এই সংলাপের পর রাষ্ট্রপতি নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের লক্ষ্যে আপিল বিভাগের একজন বিচারপতির নেতৃত্বে ছয় সদস্যের সার্চ কমিটি করে দেন। সার্চ কমিটিকে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে তাদের সুপারিশ রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠাতে বলা হয়। এ ছাড়া বলা হয়, তিন সদস্যের উপস্থিতিতে কমিটির কোরাম গঠিত হবে। কমিটি ন্যূনপক্ষে একজন নারীসহ প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের সুপারিশ করবে। প্রতিটি পদের বিপরীতে কমিটি দুটি করে নাম দেবে। কমিটির সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে এসব নাম চূড়ান্ত হবে। সিদ্ধান্তের সমতার ক্ষেত্রে সভায় সভাপতিত্বকারীর সিদ্ধান্ত দেওয়ার এখতিয়ার থাকবে। এই কমিটি সভার কার্যপদ্ধতি নির্ধারণ করতে পারবে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ওই কমিটিকে সাচিবিক সহায়তা দেয়। ওই সার্চ কমিটি দেশের ১২ জন বিশিষ্ট নাগরিকের সঙ্গেও মতবিনিময় করে। রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে পাওয়া ১২৫ জনের নামের মধ্যে যোগ্যতা যাচাইয়ের পর ২০ জনের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা করে সার্চ কমিটি। দুটি দল সিপিবি ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (রব) সার্চ কমিটিকে কোনো নামের তালিকা না পাঠিয়ে কেন পাঠানো হয়নি—বিষয়টি জানিয়ে চিঠি দেয়। দল দুটির মধ্যে সিপিবির যুক্তি ছিল, কোনো রাজনৈতিক দল যদি কোনো নাম সুপারিশ করে, সে নাম ‘ডিসকোয়ালিফাই’ করা উচিত।

 



সাতদিনের সেরা