kalerkantho

সোমবার । ২ কার্তিক ১৪২৮। ১৮ অক্টোবর ২০২১। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

যমুনা নদীর আট পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ওপরে

► দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে ফের নদীভাঙন
► তলিয়ে যাচ্ছে ফসলি জমি

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৩১ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



যমুনা নদীর আট পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ওপরে

বন্যার পানিতে ডুবে গেছে বাড়িঘর। নিরাপদ আশ্রয় নিতে অনেকেই ঠাঁই নিয়েছে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে। গতকাল কুড়িগ্রাম শহরসংলগ্ন বেলাকোপা গ্রামে। ছবি : কালের কণ্ঠ

যমুনা নদীতে অস্বাভাবিক হারে পানি বাড়ছে। গতকাল সোমবার আটটি পয়েন্টে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে যমুনা। এ ছাড়া পাঁচটি নদীর পাঁচটি পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ওপরে রয়েছে। পানি বৃদ্ধির ফলে দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে আবারও ভাঙন শুরু হয়েছে। বিভিন্ন জেলার নিম্নাঞ্চলের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। তলিয়ে যাচ্ছে বসতবাড়ি ও ফসলি জমি।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো) সূত্র জানায়, যমুনা নদীর ফুলছড়ি, বাহাদুরাবাদ, সারিয়াকান্দি, কাজিপুর, সিরাজগঞ্জ, পোড়াবাড়ী, মথুরা ও আরিচা পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ওপরে রয়েছে। এ ছাড়া ধরলা নদী কুড়িগ্রাম পয়েন্টে, ব্রহ্মপুত্র চিলমারীতে, আত্রাই বাঘাবাড়ীতে, ধলেশ্বরী এলাসিনে ও পদ্মা নদীর পানি গোয়ালন্দ পয়েন্টে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র গতকাল সকাল ৯টার তথ্যে জানায়, যমুনা নদীর পানি স্থিতিশীল থাকলেও ব্রহ্মপুত্র ও পদ্মায় পানি বাড়ছে। আগামী ৪৮ ঘণ্টায় এই তিন নদীর পানিই বাড়তে পারে। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে মেঘনা অববাহিকার মনু ও খোয়াই ছাড়া প্রধান নদীগুলোর পানি কমছে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, বগুড়া, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, মানিকগঞ্জ, রাজবাড়ী ও ফরিদপুর জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে।

জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে যমুনা নদীর পানি অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়ে গতকাল বিপৎসীমার ১৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এতে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়ে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে হাজারো মানুষ। নিমজ্জিত হচ্ছে ফসলি জমি। বন্যার পানির তোড়ে ভেঙে গেছে শিশুয়া-বাগমারা সেতুর ২০ মিটার সংযোগ সড়ক। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে যোগাযোগব্যবস্থা। দুর্ভোগে পড়েছে সরিষাবাড়ী উপজেলার সাতপোয়া ইউনিয়নেরচরাঞ্চলসহ পাশের মাদারগঞ্জ, কয়রা, বগুড়ার সারিয়াকান্দি ও সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলার প্রায় ৪০ গ্রামের দুই লাখ মানুষ।

বগুড়ার ধুনট উপজেলায় ভাণ্ডারবাড়ী ইউনিয়নে যমুনা নদীর কূল উপচে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের পূর্ব দিকের লোকালয়ে প্রবেশ করছে পানি। এতে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের অভ্যন্তরে ভাণ্ডারবাড়ী  ইউনিয়নের কয়েক গ্রামের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।

পদ্মায় পানি বৃদ্ধির ফলে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের দৌলতদিয়া ৪ নম্বর ফেরিঘাট ও পাশের সিদ্দিক কাজীরপাড়া গ্রাম এলাকায় নদীভাঙন শুরু হয়েছে। গতকাল সকাল থেকে ভাঙনের কবলে পড়ে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে স্থানীয় জামে মসজিদসহ আট পরিবারের বসতভিটা।

দৌলতদিয়া ঘাটে কর্মরত বিআইডাব্লিউটিএর সহকারী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম জানান, ৪ নম্বর ফেরিঘাটটি ভাঙনের হুমকির মুখে রয়েছে। বালুভরা জিও ব্যাগ ডাম্পিংয়ের মাধ্যমে ভাঙন রোধের চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

ধরলা ও ব্রহ্মপুত্রের পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় কুড়িগ্রামে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আবারও অবনতি হয়েছে। জেলার ৯টি উপজেলার আড়াই শতাধিক চর ও নদীসংলগ্ন গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি রয়েছে অন্তত ৬০ হাজার মানুষ।

ভারি বর্ষণ আর দফায় দফায় উজান থেকে নেমে আসা ঢলে তিস্তার পানি বাড়া-কমার সঙ্গে নদীভাঙনে দিশাহারা হয়ে পড়েছে রংপুরের গঙ্গাচড়ায় তিস্তাপারের মানুষ। অব্যাহত ভাঙনে তিস্তা পাল্টে দিয়েছে গঙ্গাচড়ার বিনবিনা চরের মানচিত্র। ১৫ দিন ধরে পানিবন্দি চার হাজার পরিবার।

গত এক মাসে তিস্তার ভাঙনে কোলকোন্দ ইউনিয়নের বিনবিনা চরের মানচিত্র পাল্টে গেছে। ওই চর গ্রামে বসবাসরত তিন শতাধিক পরিবার আবাদি জমি ও গাছপালাসহ বসতভিটা হারিয়ে এখন নিঃস্ব। সেখানকার প্রায় এক হাজার পরিবারসহ মটুকপুর, চিলাখাল, সাউদপাড়া, কুড়িবিশ্বা, ইচলী, পাইকান হাজীপাড়া, মিনার বাজার, ছালাপাক, মর্নেয়া চরসহ নিম্ন এলাকার প্রায় চার হাজার পরিবার গত ১৫ দিন ধরে পানিবন্দি অবস্থায় মানবেতর জীবন যাপন করছে। লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের পশ্চিম ইচলী এলাকায় ভাঙনে বিলীন হয়েছে ১৫০ পরিবারের ঘরবাড়ি।

গতকাল সরেজমিনে বিনবিনা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, দফায় দফায় বন্যা আর ভাঙনে পর্যুদস্ত হয়ে পড়েছে সেখানকার বাসিন্দারা। কয়েক শ একর আবাদি জমি চলে গেছে তিস্তার পেটে। বিনষ্ট হয়েছে  সদ্য রোপণকৃত আমনের ক্ষেত। চার কিলোমিটার বেড়িবাঁধটি ভেঙে যাওয়ায় গ্রামটির প্রায় এক হাজার পরিবার ১৫ দিন ধরে পানিবন্দি হয়ে আছে।

কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক কৃষিবিদ মঞ্জুরুল হক জানান, গতকাল পর্যন্ত জেলায় ১৫ হাজার ৫২০ হেক্টর জমির ফসল নিমজ্জিত হয়েছে। এর মধ্যে রোপা আমন ১৫ হাজার ১১৫ হেক্টর, শাক-সবজি ২৭০ হেক্টর এবং বীজতলা ৯৫ হেক্টর।

চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদার বিভিন্ন এলাকার নিচু জমিতে পানি জমে আউশ, আমন ধান ও সবজি চাষের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

নীলফামারীতে তিস্তার বাঁধ ভেঙে ঝুনাগাছ চাপানী ইউনিয়নে চার গ্রামের হাজারো পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। অব্যাহত ভাঙনের কবলে ওই ইউনিয়নের কুটিপাড়া আশ্রয়ণ প্রকল্পটি হুমকির মুখে রয়েছে। গতকাল শতাধিক পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ে সরে গেছে।

ঝুনাগাছ চাপানী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমিনুর রহমান বলেন, বাঁধ ভেঙে ইউনিয়নের ভাবনচুর, দক্ষিণ সোনাখুলি, ভেণ্ডাবাড়ী ও কুটিপাড়া আশ্রয়ণ প্রকল্পসহ এক হাজার পরিবার বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে।

টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ময়নুল হক বলেন, ‘ইউনিয়নের টাপুর চরে স্বেচ্ছাশ্রমে নির্মিত তিন কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁধের ৭০০ মিটার নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বালুর বস্তা ফেলেও বাঁধটি রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না।’

সিরাজগঞ্জের কাছে যমুনা নদীর পানি স্থিতিশীল থাকলেও জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। রবিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে গতকাল সকাল ৬টা পর্যন্ত গত ১২ ঘণ্টায় যমুনা নদীর সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে পানি স্থিতিশীল ছিল। গতকাল সকালে সিরাজগঞ্জের যমুনা নদীর হার্ড পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ৩৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। তবে জেলার অভ্যন্তরীণ নদ-নদীসহ নিম্নাঞ্চলে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।

জেলার চলনবিল, ইছামতী, করতোয়া, ফুলজোড় ও বড়াল নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় সিরাজগঞ্জ সদর, কাজিপুর, বেলকুচি, শাহজাদপুর ও চৌহালী উপজেলার লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ৫৯ বছর পর সিরাজগঞ্জ শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত কাটাখালীতে যমুনা নদীর পানি প্রবেশ করেছে। পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে চৌহালী ও এনায়েতপুরের বেশ কয়েকটি স্থানে শুরু হয়েছে তীব্র নদীভাঙন।

[প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা]

 



সাতদিনের সেরা