kalerkantho

মঙ্গলবার । ৩ কার্তিক ১৪২৮। ১৯ অক্টোবর ২০২১। ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

পরীক্ষা ও চিকিৎসার আগেই মৃত্যু

ময়মনসিংহ মেডিক্যালে সাত দিনে মৃত্যু ১৩৩ জনের, উপসর্গে ৮২

নিয়ামুল কবীর সজল, ময়মনসিংহ   

৫ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে




পরীক্ষা ও চিকিৎসার আগেই মৃত্যু

করোনাভাইরাসের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু বেড়েছে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ (মমেক) হাসপাতালে। রোগীকে হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য আনা হয় দেরি করে বা গুরুতর অবস্থায়। রোগী বাড়িতে দীর্ঘদিন উপসর্গে ভুগলেও সময়মতো তার করোনা শনাক্তের পরীক্ষা করা হয় না। ফলে হাসপাতালে রোগ অনুযায়ী চিকিৎসা শুরুর আগেই রোগী মারা যায়। আবার কোনো কোনো রোগী মারা গেছে করোনা পরীক্ষার রিপোর্ট আসার আগেই। করোনা উপসর্গে বেশির ভাগ রোগীরই এভাবে মৃত্যু হয়েছে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।

করোনা ও করোনা উপসর্গ নিয়ে গত সাত দিনে মমেক হাসপাতালে মারা গেছে ১৩৩ জন। তাদের মধ্যে উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৮২ জন। বেশির ভাগের বয়স ৬০ বছরের ওপরে; ৭০, ৮০, ৯০ বছর বয়সী ব্যক্তিও আছে। আর বেশির ভাগ রোগীই গ্রাম এলাকার। অনেকেই পুরনো জটিল রোগে আক্রান্ত ছিল। উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়ার কারণে রোগীদের পরিবারের অনেকে বিষয়টি গোপনও করছে। এ ব্যাপারে তারা কারো সঙ্গে কোনো কথা বলতেও অনাগ্রহী।

চিকিৎসকসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, এখনো বিপুলসংখ্যক ব্যক্তি জ্বর, সর্দি-কাশি হলে এটাকে সাধারণ জ্বর বলেই মনে করছে। অনেকে বিষয়টিকে গুরুত্বও দিচ্ছে না। পরীক্ষা করাতে অনেকে আগ্রহী নয়। আবার অনেকের পরীক্ষা করানোর মতো পরামর্শদাতা ও সহযোগীর অভাব রয়েছে। এ জন্য এসব রোগী রয়ে গেছে করোনা পরীক্ষার বাইরে। কিন্তু যখন তীব্র শ্বাসকষ্ট শুরু হয় তখন তড়িঘড়ি করে তাদের মমেক হাসপাতালে আনা হয়। পরে অনেকেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

চিকিৎসকরা জানান, এসব ব্যক্তি আগে থেকেই অ্যাজমাসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত ছিল। এ জন্য তারা করোনা উপসর্গে বা করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর ধকল সামলাতে পারছে না। এ ছাড়া বয়স বেশি হওয়ায় গ্রাম থেকে তাদের নিয়ে হাসপাতালে এসে পরীক্ষা করানোটাও সহজ নয়। এ জন্য শ্বাসকষ্ট বেশি হলে হাসপাতালে এসে এরা পর্যাপ্ত চিকিৎসা নেওয়ার আগেই প্রাণ হারাচ্ছে।

মমেক হাসপাতাল সূত্র জানায়, সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী গত ৪ আগস্ট ২২ জন রোগী মারা যায়। তাদের মধ্যে করোনায় ১০ আর উপসর্গ নিয়ে ১২ জনের মৃত্যু হয়। ১২ জনের মধ্যে ৯ জনেরই বয়স ৬০ বছরের ওপরে। ৩ আগস্ট ১৭ জন মারা যায়। তাদের মধ্যে করোনায় ছয়জন আর উপসর্গে ১১ জনের মৃত্যু হয়। উপসর্গ নিয়ে মৃত আটজনেরই বয়স ৬০ বছরের ওপরে। ২ আগস্ট মৃত্যু হয় ২৩ জনের (করোনায় সাত এবং উপসর্গে ১৬)। উপসর্গে মৃত রোগীর ১২ জনেরই বয়স ৬০ বছরের ওপরে। ১ আগস্ট মারা যায় ২১ জন রোগী (করোনায় ৯ আর উপসর্গে ১২)। উপসর্গে মারা যাওয়া সাতজনের বয়স ৬০ বছরের ওপরে। ৩১ জুলাই মারা যাওয়া ১৬ জনের মধ্যে আটজন করোনায় আক্রান্ত ছিল। আর উপসর্গ নিয়ে মৃত আটজনের মধ্যে সাতজনেরই বয়স ৬০ বছরের বেশি। ৩০ জুলাই মারা যায় ১৮ জন (করোনায় আট আর উপসর্গে ১০)। উপসর্গ নিয়ে মৃত সাতজনেরই বয়স ৬০ বছরের ওপরে। ২৯ জুলাই ১৬ জন মারা যায়। এর মধ্যে করোনায় তিনজনের মৃত্যু হয়। আর উপসর্গে মৃত ১৩ জনে মধ্যে পাঁচজনেরই বয়স ৬০ বছরের বেশি। মৃত ব্যক্তিদের মধ্যে ময়মনসিংহ জেলা ছাড়াও শেরপুর, নেত্রকোনা, জামালপুর ও টাঙ্গাইল জেলার রোগী আছে।

করোনা উপসর্গ নিয়ে মৃত ব্যক্তিদের একাধিক পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা এ বিষয়ে কথা বলতে চায়নি। কেউ কেউ বলেছে, তাদের পরিবারের কেউ করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যায়নি; হাসপাতালে যাওয়ার পর অন্য রোগে বা বয়সের কারণে মারা গেছে। একাধিক ব্যক্তি বলে, যেহেতু করোনা পরীক্ষা হয়নি, তাই তারা করোনার রোগী বলতে নারাজ। জানা গেছে, উপসর্গ নিয়ে মৃত রোগীদের মধ্যে অনেকের পরিবারের লোকজন এলাকায়ও বিষয়টি সেভাবে প্রকাশ করেনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সরকারি কর্মকর্তা ও চিকিৎসক এ ব্যাপারে বলেন, এবার করোনার প্রভাব পড়েছে গ্রাম এলাকায়ও। কিন্তু এখনো গ্রামের লোকজন সচেতন নয়। অনেকে জ্বর হওয়ার বিষয়টিকে গুরুত্বই দিচ্ছে না। আবার অনেকেরই হয়তো পরীক্ষা করানোর মতো আর্থিক সংগতি কিংবা লোকবলের অভাব আছে। অনেক পরিবারের লোকজনই হয়তো বিষয়টিকে আমলে নিচ্ছে না। এ জন্য রোগীকে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে আনার পর চিকিৎসকরা ঠিকই বুঝতে পারছেন যে রোগী করোনায় আক্রান্ত হয়েছিল অথবা এখনো করোনা পজিটিভ।

ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. চিত্তরঞ্জন দেবনাথ জানান, তাঁরা আরটি-পিসিআর টেস্ট করছেন প্রতিদিন গড়ে এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০-এর মতো। তিনি বলেন, পরীক্ষা করানোর ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা নেই। তাঁরা চান রোগীরা যেন পরীক্ষা করাতে আগ্রহী হয়।

ময়মনসিংহ বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. শাহ আলম বলেন, অসচেতনতার কারণে অনেকে পরীক্ষা করাচ্ছে না। আবার অনেকে জটিল রোগে আক্রান্ত। এ জন্য উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া রোগীর সংখ্যা বেশি। তিনি জানান, রোগীরা যেন দ্রুত ও সহজে করোনা পরীক্ষা করাতে পারে, সে জন্য তাঁরা সব উদ্যোগই নিয়েছেন।



সাতদিনের সেরা