kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ আশ্বিন ১৪২৮। ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৫ সফর ১৪৪৩

জালিয়াতি করে নিজেকে মহানগর নেতা দাবি!

কামরাঙ্গীর চরের বহিষ্কৃত ছাত্রলীগ নেতা বিপ্লবের কাণ্ড

জয়নাল আবেদীন   

২ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



জালিয়াতি করে নিজেকে মহানগর নেতা দাবি!

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের এক জ্যেষ্ঠ নেতাকে পিটিয়ে গুরুতর আহত করার দায়ে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল তাঁকে। মাদক সেবন ও বাণিজ্যের মতো ঘোরতর অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। সেই পারভেজ হোসেন বিপ্লবকে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সহসভাপতি নির্বাচিত করা হয়েছে—এমন একটি চিঠি ঘুরছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এ নিয়ে অভিনন্দনের জোয়ারে ভাসছেন বিপ্লব। তবে সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বশীলরা বলছেন, এটি সম্পূর্ণ ভুয়া। সম্পূর্ণ প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে বিপ্লব নিজেকে মহানগরের সহসভাপতি বলে গুজব ছড়িয়ে দিয়েছেন। এ বিষয়ে  শিগগির আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও বলছেন নেতারা।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া চিঠিতে দেখা যায়, গত ৩১ জুলাই বিপ্লবকে মহানগর দক্ষিণের সহসভাপতি পদে মনোনীত করা হয়। চিঠিতে দক্ষিণের সভাপতি মেহেদী হাসান ও সাধারণ সম্পাদক জুবায়ের আহমেদের সিল-সই রয়েছে। গতকাল রবিবার এই চিঠি বিপ্লব তাঁর ফেসবুক আইডিতে শেয়ারও করেছেন, যেখানে অভিনন্দনের জোয়ারে ভাসছেন তিনি।

এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জুবায়ের আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এটি পুরো একটি জালিয়াতির ঘটনা। এই সময়ের মধ্যে ছাত্রলীগের কোনো সভাই অনুষ্ঠিত হয়নি। কী করে আমার নাম ও স্বাক্ষর ওখানে গেল, সে বিষয়েও আমি রীতিমতো বিস্মিত। বিপ্লবকে গত বছর ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। এখন কী করে এত বড় জালিয়াতি হলো, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’

জুবায়ের ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সংগঠনের বিরুদ্ধে এমন দুঃসাহসিক জালিয়াতি করে, এমন সাহস কার। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। দোষীদের বিরুদ্ধে শিগগিরই আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বিপ্লবের মতো চিহ্নিত মাদকসেবী, অছাত্র এবং বিবাহিত ব্যক্তি কখনোই বাংলাদেশ ছাত্রলীগের মতো ঐতিহ্যবাহী সংগঠনের পদ পেতে পারেন না।’ এ বিষয়ে তিনি সবাইকে বিভ্রান্ত না হওয়ার অনুরোধ করেন।

জানা গেছে, পারভেজ হোসেন বিপ্লব নিজেকে এখনো কামরাঙ্গীর চর থানা ছাত্রলীগের সভাপতি হিসেবে পরিচয় দেন। এই পরিচয়ে এলাকায় তাঁর দাপটও দেখা যায়। অথচ প্রায় ১০ মাস আগে তাঁকে ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। সূত্র জানায়, গত বছর ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সহসভাপতি রেহান উল হক রাফিকে নির্মমভাবে পিটিয়ে গুরুতর আহত করেন বিপ্লব। এর জের ধরে শৃঙ্খলা পরিপন্থী অভিযোগ এনে ছাত্রলীগের সাধারণ সদস্য পদ থেকে তাঁকে বহিষ্কার করা হয়। গত বছরের ১২ অক্টোবর ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের সভাপতি আল-নাহিয়ান খান জয় ও সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, শৃঙ্খলা পরিপন্থী কার্যকলাপে জড়িত থাকায় পারভেজ হোসেন বিপ্লবকে ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়।

৯ মাস পেরোতেই একজন বহিষ্কৃত ব্যক্তি কী করে ছাত্রলীগের মহানগর শাখায় সহসভাপতি হিসেবে মনোনীত হন, সে বিষয়ে ক্ষুব্ধ সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা। তাঁরা বলছেন, বিপ্লবের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। কামরাঙ্গীর চরের মানুষ তাঁর নাম শুনলেই আঁতকে ওঠে। ইয়াবা ব্যবসায়ী হিসেবে তাঁর বেশ নামডাক। সে রকম একজনকে কিভাবে মহানগরের নেতা বানানো হয়? আর এ চিঠি যদি জালিয়াতির মাধ্যমে হয়ে থাকে, তাহলে দ্রুত তাঁর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

এ বিষয়ে কথা বলার জন্য একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও মহানগর দক্ষিণের সভাপতি মেহেদী হাসান কল রিসিভ করেননি।

তবে দপ্তর সম্পাদক আরিফ মুন্সী জানান, যে চিঠির সূত্র ধরে পারভেজ হোসেন বিপ্লব নিজেকে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সহসভাপতি বলে পরিচয় দিচ্ছেন, সেই চিঠিটি সম্পূর্ণ ভুয়া এবং জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে বানানো। এ ধরনের কর্মকাণ্ড ছাত্রলীগ কখনো প্রশ্রয় দেয় না। এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তিনি।

এদিকে একজন বিবাহিত ব্যক্তিকে বারবার ছাত্রলীগের পদে মনোনীত করার বিষয়টিও অনেকের মনে ক্ষোভের জন্ম দেয়। ২০১৮ সালের ১৭ আগস্ট বিয়ের পিঁড়িতে বসেন বিপ্লব। তাঁর বিয়ের একাধিক ছবি কালের কণ্ঠ’র হাতে রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী কোনো বিবাহিত ব্যক্তি ছাত্রলীগের পদে থাকতে পারেন না। এ বিষয়ে ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্রে বলা হয়েছে, ‘কোনো সদস্য বিয়ে করলে অথবা সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক উভয় পদে মোট দুইবার বহাল থাকলে অথবা দুইবার সভাপতি, দুইবার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হলে পরবর্তী নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অধিকার হারিয়ে ফেলবেন।’ তা সত্ত্বেও বিপ্লবকে কামরাঙ্গীর চর থানা ছাত্রলীগের সভাপতি মনোনীত করা হয়েছিল।  খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিপ্লবের নাম শুনলেই আঁতকে ওঠে কামরাঙ্গীর চর থানা এলাকার মানুষ। শুধু সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডই নয়, এলাকায় চিহ্নিত ইয়াবা আসক্ত এবং ইয়াবা কারবারি হিসেবেও পরিচিত তিনি। তাঁর বিরুদ্ধে রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। রাজনৈতিক প্রভাব দেখিয়ে নিরীহ মানুষকে আক্রমণ তো আছেই, আওয়ামী লীগের অনেক জ্যেষ্ঠ নেতার গায়েও হাত তুলেছেন তিনি। এসব কারণে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা বিপ্লবকে বহিষ্কার করার দাবি করে আসছিলেন দীর্ঘদিন ধরে।

 



সাতদিনের সেরা