kalerkantho

শনিবার । ১৬ শ্রাবণ ১৪২৮। ৩১ জুলাই ২০২১। ২০ জিলহজ ১৪৪২

কক্সবাজারে র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে সন্ত্রাসী নিহত

গফরগাঁওয়ে নিহত হত্যা মামলার দুই আসামি

বিশেষ প্রতিনিধি, কক্সবাজার ও গফরগাঁও (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি   

২০ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



কক্সবাজারে র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে সন্ত্রাসী নিহত

কক্সবাজারের সন্ত্রাসকবলিত রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে অব্যাহত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড দমনে র‌্যাবের অভিযান জোরদার করা হয়েছে। গতকাল সোমবার অভিযানের তৃতীয় দিনে র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন উখিয়ার কুতুপালং শিবিরের দুর্ধর্ষ রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী কলিমুল্লাহ প্রকাশ করিম (৩২)। আর ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন হত্যা মামলার আসামি আসাদুল (৩৮) ও সুমন মিয়া (৩০)।

কক্সবাজারে নিহত করিম কথিত ‘আরসা’ ও ‘আল-ইয়াকিন’ নামধারী রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গ্রুপের অন্যতম দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি কুতুপালং লম্বাশিয়া শিবিরের রোহিঙ্গা মীর আহমেদের ছেলে।

র‌্যাব-১৫-এর উপ-অধিনায়ক তানভীর হাসান জানান, গতকাল ভোরে কুতুপালং শিবির এলাকায় একটি রোহিঙ্গা ডাকাত দল অবস্থান করছে—এমন খবরে অভিযানে যান র‌্যাব সদস্যরা। র‌্যাবের অবস্থান টের পেয়ে ডাকাতদল গুলিবর্ষণ করলে আত্মরক্ষার্থে তারাও (র‌্যাব) পাল্টা গুলি চালায়। এক পর্যায়ে ডাকাতদলের সদস্যরা পিছু হটে যায়। পরে ঘটনাস্থল তল্লাশি করে দুটি বন্দুক, চার রাউন্ড গুলি ও ডাকাত সর্দার কলিমুল্লাহ প্রকাশ করিমের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।

এদিকে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী করিম গতকাল নিহতের পর তাঁর সমর্থিত সন্ত্রাসী দলের পক্ষে রোহিঙ্গাদের কাছে ছড়িয়ে দেওয়া অডিও ক্লিপে বলা হয়েছে, করিম রোহিঙ্গাদের জন্য একজন বীর পুরুষ ছিলেন। নিহত করিম অদম্য সাহসী রোহিঙ্গা। ভিন্নমতের স্থান তাঁর কাছে নেই। এ কারণেই রাখাইনের মংডুতে একজন রোহিঙ্গা চেয়ারম্যানকেও (ওকাট্টা) তিনি হত্যা করে এপারে পাড়ি জমান। রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী দল আরসার পক্ষে অডিও ক্লিপে বলা হয়, তাদেরই প্রতিপক্ষ আরএসও (রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন) নামধারী রোহিঙ্গা সংগঠনের লোকজনকে সহায়তায় বাংলাদেশের র‌্যাব বাহিনীর সদস্যরা রোহিঙ্গা শিবিরে অভিযান চালিয়ে তাদের লোকজনকে ধরে নিয়ে যাচ্ছেন।

কক্সবাজারের সন্ত্রাসকবলিত রোহিঙ্গা শিবির নিয়ে দেশের বিশিষ্ট নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল এ কে মোহাম্মদ আলী শিকদার পিএসসি (অব.) গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যথাসময়েই রোহিঙ্গা শিবিরে অভিযান শুরু করা হয়েছে। শিবিরগুলোতে অত্যন্ত গোপনে জঙ্গি কার্যক্রমও শুরু হয়েছিল। ভাগ্যিস এরই মধ্যে বাংলাদেশি তিন জঙ্গি ধরা পড়েছে। তারা শিবিরে এনজিওর আড়ালে জঙ্গি কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল।’ তিনি বলেন, আল-ইয়াকিন ও আরসা নামে পরিচিত রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা জঙ্গি মতাদর্শ নিয়েই কাজ করছে শিবির অভ্যন্তরে। মূলত সংগঠন একটি, তবে দুই নামে পরিচিত। সন্ত্রাসী রোহিঙ্গারা দেশের জন্যও হুমকিস্বরূপ বলে উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, পরিস্থিতি আয়ত্তের বাইরে যাওয়ার আগেই তাদের দমন করতে হবে।

কক্সবাজারের র‌্যাব-১৫-এর অধিনায়ক উইং কমান্ডার আজিম আহমদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বড়ই অশান্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছিল রোহিঙ্গা শিবিরে। রোহিঙ্গাদের মধ্যে পরস্পর বিরোধী নানা নামে এক ডজনেরও বেশি সন্ত্রাসী দল রয়েছে। তাদের হাতে রয়েছে অস্ত্রশস্ত্রও। এসব সশস্ত্র সন্ত্রাসীর কবলে লাখ লাখ সাধারণ রোহিঙ্গা জিম্মি হয়ে রয়েছে।’ তিনি বলেন, রোহিঙ্গা শিবিরের এসব সন্ত্রাসীর ভয়ে কেউ মুখ খুলতে পারছে না। একের পর এক খুনখারাবির ঘটনা লেগেই রয়েছে। শুধু রোহিঙ্গা শিবির নয়, শিবিরসংলগ্ন উখিয়া-টেকনাফে বসবাসকারী স্থানীয় বাসিন্দারাও প্রতিনিয়ত নির্যাতনের শিকার হচ্ছে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের হাতে।

র‌্যাবের অধিনায়ক বলেন, শিবিরগুলোকে জিম্মি করে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা মিয়ানমার থেকে চালানে চালানে ইয়াবা এনে মজুদ গড়ে তোলে। দেশের নানা এলাকার কারবারিদের কাছে শিবির থেকেই সরবরাহ দেওয়া হয় ইয়াবার চালান। ইয়াবার কারবার করেও রোহিঙ্গাদের এসব সন্ত্রাসী দলের সদস্যরা হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। তিনি মিয়ানমার সীমান্তে দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে ইয়াবা প্রতিরোধের অভিজ্ঞতার আলোকে বলেন, মিয়ানমারের সঙ্গে ইয়াবা কারবারে জড়িত রয়েছে শতকরা ৮০ জন রোহিঙ্গা। এসব কারণে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে র‌্যাব সদস্যরা সন্ত্রাস দমনে সাঁড়াশি অভিযানে নেমেছেন বলে জানান র‌্যাব অধিনায়ক।

সাধারণ রোহিঙ্গারা জানায়, শিবিরগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে হত্যা, অপহরণ, সন্ত্রাসী, ডাকাতি, ছিনতাই, রাহজানির সঙ্গে জড়িত এই সন্ত্রাসী ভয়ংকর মাপের একজন কিলার হচ্ছেন নিহত করিম। আরসা নামের সন্ত্রাসী দলের অন্যতম কমান্ডার হচ্ছেন করিম। এ ছাড়া দলের ফিল্ড কমান্ডার হচ্ছেন আবদুল হালিম নামের আরো একজন দুর্ধর্ষ রোহিঙ্গাকেও খুঁজছেন র‌্যাব সদস্যরা। কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরের সাধারণ রোহিঙ্গারা জানায়, শিবিরে বহু নিরীহ রোহিঙ্গাকে হত্যার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এ ছাড়া অনেক রোহিঙ্গা নারীকে অপহরণপূর্বক ধর্ষণের অভিযোগও রয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে শিবিরগুলোতে আরসা ও আল-ইয়াকিন নামের রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী দলের সশস্ত্র সদস্যরা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তারা রোহিঙ্গা শিবির ছাড়াও আশপাশের গ্রাম এলাকায়ও সন্ত্রাস চালিয়ে আসছিল। গতকাল ভোরে শিবির এলাকায় র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে করিম সন্ত্রাসী নিহত হওয়ার খবর চাউর হলে সাধারণ রোহিঙ্গা এবং শিবিরসংলগ্ন স্থানীয় গ্রামবাসী উল্লাসে মেতে ওঠে। শিবিরের সাধারণ রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি স্থানীয় গ্রামবাসীও রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের হাতে নির্যাতিত হয়ে আসছে দীর্ঘদিন ধরে।

গফরগাঁওয়ে নিহত হত্যা মামলার দুই আসামি

ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে হত্যা মামলার আসামি আসাদুল ও সুমন মিয়া নিহত হয়েছেন। গতকাল ভোরে উপজেলার যশরা ইউনিয়নের ভারইল গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নিহত আসাদুল পাশের রাওনা ইউনিয়নের ধোপাঘাট নামাপাড়া গ্রামের মো. নূরুল হকের ছেলে এবং সুমন মিয়া একই গ্রামের মৃত জামাল উদ্দিনের ছেলে।

বন্দুকযুদ্ধে নিহতরা গত ৪ জুলাই বিকেলে স্থানীয় শিবগঞ্জ বাজারে যাত্রীছাউনির সামনে পার্শ্ববর্তী পাঁচুয়া গ্রামের আব্দুস সাত্তারের ছেলে মতিউর রহমান মোহন নামের এক যুবককে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা মামলার আসামি।

র‌্যাব সূত্র জানায়, গত রবিবার দিবাগত রাত ৩টার দিকে উপজেলার যশরা ইউনিয়নের ভারইল গ্রামের নূরুল ইসলামের ফিশারিসংলগ্ন এলাকায় ময়মনসিংহ র‌্যাব-১৪-এর একটি দল অভিযান চালায়। এ সময় দুর্বৃত্তদের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধ বাধে। তখন র‌্যাবের তরফ থেকে গফরগাঁও থানায় ফোন করে পুলিশের সহযোগিতা চাওয়া হয়। খবর পেয়ে বারবাড়িয়া ইউনিয়নের বাড়া এলাকায় থাকা পুলিশের টহলদল ঘটনাস্থলে আসে। পরে ভোরে র‌্যাব-পুলিশ ঘটনাস্থলের আশপাশ থেকে আহত অবস্থায় দুজনকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিলে চিকিৎসক তাঁদের মৃত ঘোষণা করেন।

গফরগাঁও থানার ওসি অনুকুল সরকার বলেন, ‘রবিবার দিবাগত শেষরাতের দিকে র‌্যাব সদস্যরা আমাদের জানান, ভারইল গ্রামে র‌্যাবের সঙ্গে দুর্বৃত্তদের বন্দুকযুদ্ধ চলছে; পুলিশের সহযোগিতা প্রয়োজন। পরে বাড়া এলাকায় থাকা আমাদের টহলদল ঘটনাস্থলে যায়।’