kalerkantho

বুধবার । ১১ কার্তিক ১৪২৮। ২৭ অক্টোবর ২০২১। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

কভিড, নন-কভিড সব রোগীই আসছে এক পথে

নূপুর দেব, চট্টগ্রাম   

১৬ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



কভিড, নন-কভিড সব রোগীই আসছে এক পথে

জ্বরের পর অক্সিজেনের মাত্রা অনেক কমে যায় ফার্নিচার ব্যবসায়ী আবদুল জলিলের (৭২)। শ্বাসকষ্টের কারণে গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে তাঁকে নেওয়া হয় খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে স্থানান্তরের পরামর্শ দেন। এরপর অ্যাম্বুল্যান্সে অক্সিজেন লাগানো অবস্থায় মুমূর্ষু এই রোগীকে দুপুর আড়াইটার দিকে ভর্তির জন্য চমেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে আনা হয়।

অ্যাম্বুল্যান্স থেকে নামানোর সময় তাঁর অক্সিজেন খুলে ফেলা হয়। ট্রলিতে করে একবার জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়, সেখান থেকে আবার বের করে করোনা পরীক্ষার জন্য পার্শ্ববর্তী কর্নারে নেওয়া হয়। সেখানে প্রায় ২০ মিনিট বাইরে ট্রলিতে রাখা হয়। রিপোর্ট নেগেটিভ নিয়ে আবার জরুরি বিভাগে চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হয়। এসব কাজ সম্পন্ন করতে প্রায় এক ঘণ্টা সময় লেগে যায়। করোনা নেগেটিভ হলেও উপসর্গ থাকায় চিকিৎসক আবদুল জলিলকে তিনতলার ইয়েলো জোনে ভর্তি করান। এর আগ পর্যন্ত এক ঘণ্টার বেশি অক্সিজেন ছাড়াই ছিল ওই রোগী।

ওই ওয়ার্ডে ভর্তির ব্যাপারে জানতে চাইলে জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক সুস্মিতা কালের কণ্ঠকে জানান, ওই রোগীর (আবদুল জলিল) অক্সিজেন স্যাচুরেশন ৬০ শতাংশে নেমে এসেছে। করোনার রিপোর্ট নেগেটিভ হলেও শ্বাসকষ্টসহ করোনার উপসর্গ থাকায় তাঁকে ইয়েলো জোনে ভর্তি করানো হয়। তখনো ওই রোগী জরুরি বিভাগের সামনে থাকায় চিকিৎসক ওয়ার্ড বয়কে নির্দেশ দেন দ্রুত রোগীকে ওয়ার্ডে নেওয়ার জন্য।

এদিকে চট্টগ্রামের বাঁশখালী থেকে আবু তাহের নামের এক করোনা রোগীকে জরুরি বিভাগ থেকে রেড জোনে ভর্তি হতে অনেক সময় বিলম্বিত হয়। বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে রেড জোনের প্রবেশ পথ দিয়ে ঢুকতেই কথা হয় তাঁর শ্যালক মো. জয়নালের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ওনার হার্টের সমস্যা ছিল। করোনা আক্রান্ত হওয়ায় শ্বাসকষ্টের কারণে এখানে ভর্তি করা হচ্ছে।’

তখন রেড জোনের প্রবেশপথে কর্তব্যরত এক আনসার সদস্য বলেন, ‘আমি আড়াইটার দিকে ডিউটিতে এসেছি। এর মধ্যে  চার-পাঁচজন করোনা রোগী ভর্তি হয়েছে।

শুধু তারা নয়, চমেক হাসপাতালে করোনা রোগী ভর্তি বেড়ে গেছে। ৩০০ শয্যার করোনা ওয়ার্ডে গতকাল দুপুর পর্যন্ত ২৮৩ জন রোগী ভর্তি রয়েছে। এ ছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে করোনা আক্রান্ত হয়ে সাতজন মৃত্যুবরণ করেছে বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে।

এদিকে গতকাল দুপুর ২টা থেকে প্রায় বিকেল ৪টা পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিভাগের বৃহত্তম বিশেষায়িত এই হাসপাতালে জরুরি বিভাগ, রেড জোনসহ বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে দেখা গেছে, করোনা রোগীর ভর্তি বেড়েছে। সরকারি নির্দেশনা ছিল করোনা রোগী ভর্তি ও চিকিৎসাসেবা আলাদা করার। কিন্তু চমেক হাসপাতালে দেখা গেছে, জরুরি বিভাগের একমাত্র প্রবেশপথ দিয়ে কভিড-নন কভিড দুই ধরনের রোগীই আসছে। জরুরি বিভাগে নেওয়ার পর প্রথমে চিকিৎসকের রুমের সামনে যেতেই সেখানে রোগীর ঠাসাঠাসি। এরপর করোনা পরীক্ষা করাতে নেওয়া হচ্ছে। পজিটিভ ও নেগেটিভ উভয় রিপোর্টের ক্ষেত্রেই রোগীকে আবার জরুরি বিভাগের সরু পথ দিয়ে বিভিন্ন ওয়ার্ডে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এতে করে করোনার সংক্রমণ আরো বেড়ে যেতে পারে বলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের আশঙ্কা।

এ ছাড়া রেড জোন ও ইয়েলো জোনে স্বজনদের আনাগোনা বেশি দেখা গেছে। তাদের যথাযথ সুরক্ষাসামগ্রীও নেই। করোনা রোগী আসা-যাওয়ার একই পথে নন-কভিডসহ তাদের স্বজনদেরও যাতায়াত। পাশে ফার্মেসি। সেখানেও সব রোগীর স্বজনরা যাচ্ছে। অনেকের মাস্কও নেই।  

জরুরি বিভাগের সামনে নাম প্রকাশ না করে হাসপাতালের এক সিনিয়র স্টাফ নার্স বলেন, ‘করোনা পরীক্ষা যেখানে করা হচ্ছে, সেখানে টেকনিশিয়ান নেই। ওয়ার্ড বয়রা করছে। তারা অবৈধভাবে যার কাছ থেকে যেভাবে পাচ্ছে সেভাবে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।’

এ সময় এক স্বজনের সঙ্গে কথা বলার সময় ওয়ার্ড বয়দের একজন অন্য একজনকে (অস্থায়ী) পাঠিয়ে প্রতিবেদক কী লিখছেন তা জানতে চান? পরিচয় দিলে সেখান থেকে সরে পড়েন।

মানিকছড়ি থেকে আসা রোগী আবদুল জলিলের ছোট ছেলে মামুন মিয়া বলেন, ‘সকাল ১০টা থেকে দেড় ঘণ্টা মানিকছড়ি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ছিলাম। কিন্তু কোনো চিকিৎসা হয়নি। এখানে (চমেক) আনার পর প্রায় এক ঘণ্টা চলে গেছে। কিন্তু এখনো চিকিৎসা শুরু হয়নি।’ তিনি বলেন, করোনা পরীক্ষা করাতে ৫০ টাকা নিয়েছে।

শুধু করোনা পরীক্ষা করার ওই কক্ষ নয়, কভিড ও নন-কভিড রোগী ভর্তি করাতে পদে পদে স্বজনদের ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। ওয়ার্ড বয়দের উৎকাচ না দিলে তাঁরা রোগীও ধরছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে।

এর আগে চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার এস এম হুমায়ুন কবির তাঁর কক্ষে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আজকে নন-কভিড রোগী চিকিৎসাধীন আছে এক হাজার ৬৮৫ জন। এ ছাড়া ৩০০ শয্যার কভিড ওয়ার্ডে ১০টি আইসিইউ ও ১০টি এইচডিইউসহ ২৮৩ জন রোগী ভর্তি আছে।’

সংকটের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘লোকবলসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতির সংকট রয়েছে। সেগুলোর চাহিদাপত্রে আমরা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে জানিয়েছি। যেভাবে করোনা রোগী ভর্তি বাড়ছে, তাতে আমাদের আশঙ্কা রোগী আরো বাড়তে পারে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু চমেক হাসপাতাল নয়, সরকারি চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ১৫৮ শয্যার মধ্যে ১৪৫ জন (১৮টি আইসিইউ ও এইচডিইউসহ), বিআইটিআইডি হাসপাতালে ৪৫ শয্যার মধ্যে ৩৭ জন করোনা রোগী ভর্তি রয়েছে। চট্টগ্রামের প্রধান সরকারি এই তিন হাসপাতালে গতকাল পর্যন্ত করোনার চিকিৎসাসেবার মোট শয্যা ৫০৩টির মধ্যে ৪৬৫ জন ভর্তি আছে; যা মোট শয্যার ৯২.৪৫ শতাংশ। এ ছাড়া নগরের বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ ও এইচডিইউসহ আইসোলেশনের কোনো শয্যা খালি নেই বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান।

এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে দুই হাজার ৪২১টি নমুনা পরীক্ষায় ৭৬৮ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। শনাক্তের হার ৩১.৭২ শতাংশ। এ দিন মৃত্যুবরণকারী ১০ জনের মধ্যে সাতজন জেলায় ও নগরে তিনজন। এ নিয়ে চট্টগ্রামে করোনায় মারা যায় ৮১০ জনের মধ্যে নগরে ৫১১ ও জেলায় ৩১৯ জন। সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গতকাল পর্যন্ত চট্টগ্রামে পাঁচ লাখ ২৪ হাজার ৬১৬টি নমুনা পরীক্ষা করানো হয়েছে। এর মধ্যে শনাক্ত হয়েছে ৬৮ হাজার ৫৫৫ জন। নমুনা অনুপাতে বর্তমানে শনাক্তের হার ১৩.০৭ শতাংশ। আর শনাক্ত অনুপাতে মৃত্যুহার ১.১৮ শতাংশ।