kalerkantho

রবিবার । ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ৫ ডিসেম্বর ২০২১। ২৯ রবিউস সানি ১৪৪৩

‘ছাওয়া-পোয়া নিয়া ঈদে খাবার পাইম’

রংপুরে ত্রাণ পেলেন ১৬০০ জন

স্বপন চৌধুরী, সীমান্ত সাথী ও নাজমুল হুদা, রংপুর থেকে   

১৬ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে




‘ছাওয়া-পোয়া নিয়া ঈদে খাবার পাইম’

রংপুর জিলা স্কুল মাঠে গতকাল কালের কণ্ঠ শুভসংঘের উদ্যোগে দুস্থদের হাতে খাদ্য সহায়তা তুলে দেন জেলা প্রশাসক আসিব আহসান। ছবি : কালের কণ্ঠ

জন্মগত প্রতিবন্ধী কিশোর শহিদুল ইসলাম। হাঁটতে পারেন না। হুইলচেয়ারে করে তাঁর মা রানু বেগম রংপুর জিলা স্কুল মাঠে নিয়ে এসেছেন। তাঁর হাতে বসুন্ধরা গ্রুপের ত্রাণসামগ্রী তুলে দেওয়া হয়। খাদ্য সহায়তা পেয়ে খুব খুশি শহিদুল ও তাঁর মা। রানু বেগম বলেন, ‘তোমরা হামাক ঈদের আগোত চাউল-ডাউল দেনেন বাহে। আল্লায় তোমাকগুলাক দুধে-ভাতে থুউক।’

কেশব চন্দ্র দাস নামে এক উপকারভোগী বলেন, ‘লাঠি ছাড়া দাঁড়িয়ে থাকপার পাও না। কোন কাম কইরবাও পাও না। খুব অভাবে দিন যায়। তোমারগুলার চাউল-ডাউল পায়্যা খুব উপকার হইলো। ছাওয়া-পোয়া নিয়া ঈদের দিনসহ দিন দশেক খাবার পাইম। মুই আশীর্বাদ করং, বসুন্ধরা গ্রুপের মালিককে আল্লায় বাঁচি থুক।’

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে রংপুর জেলায় ১৬০০ অসহায়, প্রতিবন্ধী ও করোনায় ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বসুন্ধরা গ্রুপের ত্রাণ সহায়তা পৌঁছে দিয়েছে কালের কণ্ঠ শুভসংঘের সদস্যরা। এ ছাড়া সবার মাঝে মাস্ক বিতরণ ও করোনা সুরক্ষায় সচেতনতামূলক পরামর্শ দেওয়া হয়। এর মধ্যে রংপুর জিলা স্কুল মাঠে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ৩০০ জনের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়।

ত্রাণ বিতরণে অংশ নিয়ে রংপুরের জেলা প্রশাসক আসিব আহসান বলেন, ‘এই মহতী উদ্যোগের জন্য বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহানকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানাই। একই সঙ্গে সুবিধাভোগীদের পক্ষ থেকেও ধন্যবাদ জানাচ্ছি। বর্তমানে দেশে করোনা খুব দ্রুতই সংক্রমিত হচ্ছে। আপনাদের মধ্যে কারো করোনার উপসর্গ দেখা দিলে বাইরে ঘোরাঘুরি করবেন না। ডাক্তারের পরামর্শসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলবেন। সবাই মাস্ক পরে থাকবেন। করোনা মোকাবেলা করতে সরকারকে সহযোগিতা করবেন।’

সেখানে ত্রাণ বিতরণে আরো উপস্থিত ছিলেন সামাজিক সংগঠন বাংলার চোখের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান সমাজসেবক তানবীর হোসেন আশরাফী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও শিক্ষক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক তাবিউর রহমান, রংপুর জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমান, শুভসংঘের জেলা শাখার সভাপতি ইরা হক, সহসভাপতি শুভ আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক গোলাম সারওয়ার রাব্বি, রংপুর সরকারি কলেজ শাখার সভাপতি দেলোয়ার হোসেন, সাধারণ সম্পাদক মারুফা আক্তার প্রমুখ।

পীরগঞ্জ উপজেলায় ৩০০ অতি দরিদ্র পরিবারকে ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। খালাশপীর বঙ্গবন্ধু ডিগ্রি কলেজ মাঠে স্বাস্থ্যবিধি মেনে এই ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়। ত্রাণ পেয়ে সুফিয়া বেগম বলেন, ‘তোমাদের ত্রাণ দিয়া আমার কিছু দিন চলে যাইব। আমি একলা মানুষ অনেক দিন খাইতে পারব। কেউ আমারে সাহায্য করে না। তোমরা আজ খাবার দিলা, বেঁচে থাকো তোমরা। অনেক দোয়া করি তোমাগো বসুন্ধরা গ্রুপকে।’

সেখানে উপস্থিত ছিলেন পীরগঞ্জ উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) আলাউদ্দীন ভূঞা জনী, খালাশপীর বঙ্গবন্ধু ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মমিনুল ইসলাম, থানার পুলিশের উপপরিদর্শক আতাউল গণি, শুভসংঘের পীরগঞ্জ উপজেলার উপদেষ্টা জুলফিকার হায়দার আলী, মিজানুর রহমান মিজান, সভাপতি আহসান হাবীব প্রমুখ। পীরগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ত্রাণ সহায়তা দেওয়ায় বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহানকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান অতিথিরা।

মিঠাপুকুর ডিগ্রি কলেজ মাঠে স্বাস্থ্যবিধি মেনে গতকাল ৩০০ অসহায় পরিবারের হাতে ত্রাণসামগ্রী তুলে দেওয়া হয়। ত্রাণ বিতরণে উপস্থিত হয়ে মিঠাপুকুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মামুন ভূইয়া বলেন, ‘ধন্যবাদ জানাই বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যানকে, তিনি দেশের প্রতি জেলার অসহায় মানুষকে খাদ্য সহায়তা দিচ্ছেন। কিছুদিন আগেও অসহায় মানুষের জন্য সরকার থেকে সাহায্য করা হয়েছে। আপনাদের কখনো খাদ্যের অভাব হবে না। তাই আপনারা করোনা সুরক্ষায় সচেতন থাকবেন। অযথা কেউ ঘর থেকে বের হবেন না।’

রোজিয়া খাতুন নামে এক উপকারভোগী বলেন, ‘আল্লায় বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকের ওপর রহমত দেক। তাঁকে বেহেশত দেক। এই ত্রাণ দিয়া কয়দিন খাইতে পারব। অনেক অনেক শুকরিয়া করি।’

সেখানে ত্রাণ বিতরণে আরো উপস্থিত ছিলেন মিঠাপুকুর প্রেস ক্লাবের সভাপতি শেখ সাদী সরকার, সাধারণ সম্পাদক সবুজ আহমেদসহ মিঠাপুকুর উপজেলার শুভসংঘের বন্ধুরা।

বদরগঞ্জ উপজেলায় ৪০০ অতি দরিদ্র ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের মাঝে ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সবাইকে মাস্ক ও করোনা সুরক্ষায় সচেতনতামূলক পরামর্শ দেওয়া হয়। গতকাল বদরগঞ্জ মডেল বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে স্বাস্থ্যবিধি মেনে এই ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়।

ত্রাণ পেয়ে লিজা নামের তৃতীয় লিঙ্গের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমরা কোনো কাজ করতে পারি না। মানুষের থেকে সাহায্য চেয়ে সেটা দিয়ে নিজেরা খাই, পড়াশোনার খরচ চালাই। আমাদের সাহায্য করার জন্য বসুন্ধরা গ্রুপকে ধন্যবাদ জানাই।’

ত্রাণ বিতরণে উপস্থিত হয়ে বদরগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান ফজলে রাব্বি সুইট বলেন, ‘কালের কণ্ঠ শুভসংঘ বদরগঞ্জ উপজেলায় খাদ্য সহায়তা দেওয়ায় তাদের ধন্যবাদ জানাই। আমরা সবাই মিলে বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যানের জন্য দোয়া করি, যিনি সারা বাংলাদেশের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ান। আজ আপনাদেরকেও ত্রাণ সহায়তা দিলেন। তাঁকে যেন আল্লাহ দীর্ঘজীবী করেন।’

এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মেহেদী হাসান, পৌর মেয়র আহাসানুল হক চৌধুরী টুটুল, শুভসংঘের জেলা শাখার সভাপতি ইরা হক, বদরগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সভাপতি মাহফুজার রহমান, শুভসংঘ বদরগঞ্জ উপজেলা শাখার উপদেষ্টা সাইদুল হক, আশরাফুল আলম, সাধারণ সম্পাদক আসরাফুজ্জামান বাবু প্রমুখ।

তারাগঞ্জ উপজেলায়ও ৩০০ অতিদরিদ্র পরিবারকে ত্রাণ দেওয়া হয়েছে। তারাগঞ্জ ও/এ দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে স্বাস্থ্যবিধি মেনে এই ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়। বিয়ে না করেই জীবনের ৫৫ বছর পার করেছেন মরিয়ম বেগম। পৃথিবীতে তাঁর এক বোন ছাড়া কেউ নেই। ভিক্ষাবৃত্তি করে নিজের ভরণ-পোষণ করেন তিনি। ত্রাণ পেয়ে বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যানের জন্য দোয়া করেন তিনি। মরিয়ম বলেন, ‘আল্লায় যেন তাঁর ভালো করেন। তাঁর দেওয়া চাল-ডালে আমার ঈদ ভালোই কাটবি এবার। সুখে থাকবেন তিনি।’

মরিয়মের মতো ভিক্ষাবৃত্তি করেন জুলহাস মিয়াও। ত্রাণ পেয়ে তিনিও খুশি। জুলহাস বলেন, ‘ভিক্ষা কইরা খাই। বাসায় কেউ নাই আমার। নিজে রানতে পারি না, হোটেলত ভাত খাই। আপনাগো ত্রাণ পাশের বাড়িত নিয়া দিমু। হেরা আমারে রাইন্দা দিব কয়দিন, আমি খামু। এই কয়দিন আমার মাইনষের কাছোত টাকা চাইতে হইব না। একলগে অনেক চাল পাইছি আইজ। আপনারা শান্তিতে থাকেন। আমাদের আরো সাহায্য দিয়েন।’

ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমে উপস্থিত হয়ে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক তাবিউর রহমান বলেন, ‘বসুন্ধরা গ্রুপের সহায়তায় কালের কণ্ঠ শুভসংঘ পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি জেলার অসহায় মানুষদের ত্রাণ সহায়তা দিচ্ছে। করোনায় ঘরবন্দি সময় শুভসংঘের সদস্যরা মানুষের দুয়ারে খাবার পৌঁছে দিচ্ছে। তাই তাদেরকে আমি ধন্যবাদ জানাই। আপনাদের কাছে বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যানের জন্য দোয়া প্রার্থনা করছি। তিনি যেন এই মহৎ কার্যক্রম অব্যাহত রাখেন। সব সময় আপনাদের পাশে দাঁড়াতে পারেন।’

সেখানে আরো উপস্থিত ছিলেন শুভসংঘের রংপুর জেলা শাখার সভাপতি ইরা হক, তারাগঞ্জ শাখার উপদেষ্টা লায়লা সরকার ও রুশদ আল ফেরদৌস মিশু, সভাপতি এনামুল হক দুখু, সাধারণ সম্পাদক অঙ্কন দত্ত প্রমুখ। ত্রাণ বিতরণের সব অনুষ্ঠানে কালের কণ্ঠ শুভসংঘের পরিচালক জাকারিয়া জামান, কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক শামীম আল মামুন, সদস্য শরীফ মাহ্দী আশরাফ জীবন উপস্থিত ছিলেন।



সাতদিনের সেরা