kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৯ জুলাই ২০২১। ১৮ জিলহজ ১৪৪২

মামলায় ঝুলছে ১০ দেশ থেকে অর্থ ফেরানো

মাসুদ রুমী   

২১ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মামলায় ঝুলছে ১০ দেশ থেকে অর্থ ফেরানো

আইনি জটিলতায় ঝুলে আছে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়া। বাংলাদেশ থেকে ১০টি দেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে অন্তত ২৩টির বেশি মামলা এখনো শেষ হয়নি। এগুলো শেষ হলে হাজার কোটি টাকার বেশি ফেরত আনা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তবে কিছু দেশ থেকে অর্থ ফেরত আনতে বিদ্যমান আইন এবং আন্তর্জাতিক চুক্তির পাশাপাশি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরসহ উভয় সরকারের মধ্যে চুক্তির প্রয়োজন হবে। সেসব করার প্রক্রিয়াও চলছে বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে অর্থপাচার রোধে একটি নীতিমালা তৈরি করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, হুন্ডি ও বাণিজ্যের আড়ালে দেশ থেকে অর্থপাচার বেশি হয়। পাচারকৃত অর্থ চিহ্নিতকরণ ও ফেরত আনার প্রক্রিয়া খুবই জটিল। প্রথমে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে পাচারকৃত অর্থ চিহ্নিত করে তদন্তের পর মামলা করতে হয়। এরপর আদালত রায় দিলেই শুধু প্রক্রিয়া শুরু করা যায়। তবে অনুসন্ধান বা তদন্ত পর্যায়ে পাচারের বিষয়টি নিশ্চিত হলে তদন্তকারী সংস্থা ওই দেশে পাচারের অর্থ অবরুদ্ধ করার জন্য মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স বা এমএলএর জন্য অনুরোধ করতে পারে। অর্থ অবরুদ্ধ করার অনুমতি নিয়ে কয়েকটি ধাপের পর দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রীয় সংস্থার মাধ্যমে পাচারের অর্থ ফেরতের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে ওই দেশের আদালতের কাছে বিষয়টি প্রমাণ সাপেক্ষে গ্রহণযোগ্য হতে হবে। এ ছাড়া তৃতীয় দেশের মাধ্যমে টাকা পাচার হলে সেটা ফেরত আনা কষ্টসাধ্য।

গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে, ২০২০ সালে সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানতের স্থিতি ৫৬ কোটি ২৯ লাখ ফ্রাংক, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় পাঁচ হাজার ২৯১ কোটি টাকা। টানা তিন বছর ধরে বাংলাদেশিদের আমানত কমছে। সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রতিবেদনে বাংলাদেশিদের আমানতের স্থিতির হিসাব দিলেও কোন বাংলাদেশি তাঁর নাগরিকত্ব গোপন রেখে টাকা জমা রেখেছেন, তার তথ্য এই প্রতিবেদনে নেই। দেশের অর্থনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানতের স্থিতি কমার কারণ খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা গ্লোবাল ফিন্যানশিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) তথ্য অনুসারে, ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে প্রায় পাঁচ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। এর আগে প্রকাশিত পানামা ও প্যারাডাইস পেপার্সে ৮৪ জন বাংলাদেশির টাকা পাচারের তথ্য উঠে আসে। এর বাইরে সেকেন্ড হোমসহ নানা মাধ্যমে মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে দেদার পাচার হয়ে যাচ্ছে অর্থ।

সম্প্রতি ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের (বিএফআইইউ) ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে অর্থপাচার হয় এমন ১০টি দেশ চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব দেশ হলো সিঙ্গাপুর, কানাডা, মালয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, অস্ট্রেলিয়া, হংকং ও থাইল্যান্ড।

জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী কনভেনশনের আওতায় পাচারের প্রেরক ও প্রাপক—এই দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে পারস্পরিক আইনি সহায়তা চুক্তির মাধ্যমে অর্থ-সম্পদ ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি যারা পাচারে লিপ্ত তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব বলে জানান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যেমনটি হয়েছিল অন্তত একটি ক্ষেত্রে, যখন অল্প হলেও সিঙ্গাপুর থেকে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা হয়েছিল।’

জানতে চাইলে বিএফআইইউয়ের প্রধান আবু হেনা মোহাম্মদ রাজী হাসান গত শনিবার কালের কণ্ঠকে বলেন. ‘বিদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে বিচারাধীন মামলা আছে অনেক। এসব মামলা থেকে কয়েকটিতে সফলতার সম্ভাবনা আছে। তবে অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়া অনেক দীর্ঘ। সে কারণে পৃথিবীর সব দেশে এ ক্ষেত্রে সফলতা কম।’

সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে রাখা বাংলাদেশিদের অবৈধ অর্থ ফেরত আনার ক্ষেত্রে ভারতের মতো চুক্তি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিএফআইইউয়ের প্রধান বলেন, ‘ভারত ট্যাক্সের বিষয়ে চুক্তি করেছে। তারা পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে পারেনি, কিছু ট্যাক্স সংগ্রহ করেছে। আমরা এখনো চুক্তি করতে পারিনি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলো মিলে কাজ করছে। সংশ্লিষ্ট দেশের সহযোগিতা ছাড়া অর্থ ফেরত আনা সহজ নয়। অর্থপাচার নিয়ে আমাদের নীতিমালা তৈরির বিষয়টি এখনো প্রক্রিয়াধীন। এটি সম্পন্ন হলে কী পথে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে হবে তার একটি লিখিত নির্দেশনা আমরা দিতে পারব।’

সুইজারল্যান্ডের ব্যাংক থেকে বাংলাদেশিদের অবৈধ অর্থ ফেরত আনতে গেলে কী ধরনের আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে, সেটা জানিয়েছেন বিএফআইইউয়ের সাবেক পরামর্শক দেব প্রসাদ দেবনাথ। তবে তিনি কালের কণ্ঠকে এটাও বলেছেন যে ‘জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী কনভেনশনের আওতায় পাচার হওয়া অর্থ সিঙ্গাপুর থেকে ফেরত আনতে তথ্য আদান-প্রদান করে আদালতের রায় নিতে হয়েছে এবং ওই দেশের আদালতের প্রক্রিয়া শেষ করতে হয়েছে। তিনি বলেন, ‘সুইস ব্যাংক থেকে অর্থ ফেরত আনতে কোনো চুক্তি লাগবে না। যেহেতু তারাও জাতিসংঘের সদস্য, তাই এই কনভেনশনের আওতায় এটি ফেরত আনা সম্ভব। আমরা ফিলিপাইন থেকে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ছাড়াই ১৫ মিলিয়ন ডলার ফেরত আনতে পেরেছি।’

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, পাচারের অর্থ ফেরত আনার পাশাপাশি অর্থপাচার রোধে দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি ও আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও দুর্নীতি কমাতে জোরালো উদ্যোগ নিতে হবে। এ জন্য সাংঘর্ষিক নীতিগুলো বদলাতে হবে। অর্থপাচারকারীরা যাতে নিরাপদ বোধ না করতে পারে, সেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে। তাদের ওপর চাপ না এলে তারা কালো টাকা সাদা করবে না, বিদেশে পাচার করে দেবে।

অর্থনীতি বিশ্লেষক মামুন রশীদ শনিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশে আইনের শাসন ও অর্থনৈতিক সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে অর্থপাচারের প্রবণতা কমবে। সেই সঙ্গে দেশের আন্তর্দেশীয় বাণিজ্য, করপোরেট করহার এবং বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবস্থাপনা বা নীতিমালাকে অন্যান্য প্রতিযোগী দেশের প্রচলিত নীতিমালার আলোকে যুগোপযোগী এবং সহজ করতে হবে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাংলাদেশ এগমন্ট গ্রুপের (বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ফিন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের সমন্বয়ে গঠিত একটি আন্তর্জাতিক ফোরাম) সদস্য। এমএলএর মাধ্যমে সুইজারল্যান্ডে যোগাযোগ করে অর্থ ফেরত আনার চেষ্টা করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে দক্ষতা উন্নয়নের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।’ তিনি মনে করেন, অর্থপাচার ঠেকাতে দুর্নীতি রোধের পাশাপাশি রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অর্থপাচার রোধে সরকারের কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে আগামীকাল অর্থ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে। বৈঠকটি ভার্চুয়ালি হওয়ার কথা রয়েছে।

অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের দেশের টাকা যারা বিদেশে অবৈধভাবে পাচার করেছে, তাদের বিষয়ে আমরা কাজ করছি। কাজ করার সময় আগামীতে হয়তো দেখা যাবে সেই সংখ্যা বেড়ে গেছে। সুতরাং এটা একটা ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।’ তিনি বলেন, ‘বিদেশে পাচার হওয়া টাকা ফেরতের বিষয়ে বেশ অগ্রগতি আছে। আমরা শিগগিরই আমাদের কাজের অগ্রগতি নিয়ে বৈঠকে বসব।’