kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ শ্রাবণ ১৪২৮। ৫ আগস্ট ২০২১। ২৫ জিলহজ ১৪৪২

একাধিক টিকায় নির্ভরতা বেশির ভাগ দেশের

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২৪ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



একাধিক টিকায় নির্ভরতা বেশির ভাগ দেশের

করোনাভাইরাস মোকাবেলায় টিকার দৌড়ে বেশির ভাগ দেশ একাধিক উৎস ঝুঁকছে। এর মাধ্যমে দেশগুলো যেমন প্রয়োজনীয় প্রতিষেধক নিশ্চিত করতে চাইছে, তেমনই ভিন্ন ভিন্ন কার্যকারিতার টিকাও হাতের নাগালে রাখতে চাইছে। গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ডিউক গ্লোবাল মেডিক্যাল ইনোভেশন সেন্টারের পরিসংখ্যান বলছে, এখন পর্যন্ত প্রায় এক হাজার কোটি ডোজের ক্রয়াদেশ এসেছে ১১৫টি দেশ, দুটি জোট ও কোভ্যাক্স উদ্যোগের পক্ষে। এর মধ্যে ১৬টি দেশ এখন পর্যন্ত একটি প্রতিষ্ঠান বা উৎস টিকার ক্রয়াদেশ দিয়েছে। আর চারটি দেশ এক উৎস ক্রয়াদেশ দিতে আলোচনা করছে। বাকি দেশ টিকার কোনো ফরমাশই দিতে পারেনি। টিকার বণ্টন নিয়ে সৃষ্ট এ বৈষম্য মহামারিকে আরো দীর্ঘায়িত করবে বলেই মনে করছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাব্লিউএইচও)।

বিশ্বজুড়ে করোনা ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে নতুন ধরনের বাস্তবতাকে মেনে নিতে হয়েছে মানুষকে। তবে এরই মধ্যে উন্নত দেশগুলো টিকাদানের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টায় আছে। কয়েক মাসের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বেশ কিছু দেশ হার্ড ইমিউনিটি অর্জন করবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ফলে যেসব দেশ টিকার দৌড়ে পিছিয়ে আছে, তারা অর্থনৈতিক ও সামাজিক দিক থেকে বেশ পিছিয়ে পড়তে যাচ্ছে বলে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। আবার এমন পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে যে অনেক উন্নত দেশ শিশুদের জন্য টিকাদান শুরু করছে, অথচ দরিদ্র দেশগুলো ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকেই প্রতিষেধক দিতে পারেনি। তা ছাড়া যেসব উন্নত দেশ প্রয়োজনের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি টিকার ফরমাশ দিয়েছে, তারা এখন উদ্বৃত্ত টিকা অন্য দেশগুলোকে সহায়তা হিসেবে দিতে চাইছে। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক ও ভূ-রাজনীতি আছে বলেও জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

ডিউক গ্লোবাল মেডিক্যাল ইনোভেশন সেন্টারের বিশ্লেষণ বলছে, বিশ্বজুড়ে হার্ড ইমিউনিটি অর্জন করতে ৭০ শতাংশ মানুষকে টিকা দেওয়ার প্রয়োজন। এ জন্য প্রয়োজন প্রায় এক হাজার ১০০ কোটি ডোজ টিকা। সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে সব কটি টিকা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান মিলে চলতি বছরেই এক হাজার ২০০ কোটি ডোজ টিকা উৎপাদন করতে পারবে। তবে তার বিতরণ ও প্রয়োগের ওপর পরিস্থিতির উন্নতি যেমন নির্ভর করছে। অবশ্য করোনার ধরন প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হওয়ায় এসব টিকার কার্যকারিতাও চ্যালেঞ্জের মুখে আছে।

করোনা মহামারি শুরু হওয়ার পরপরই ২০২০ সালের মে মাসে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার ফরমাশ দেয় যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। পরের কয়েক মাসে বেশ কিছু ধনী দেশের পাশাপাশি মধ্য আয়ের দেশও সবার আগে টিকা পেতে ক্রয়াদেশ দেয়। কারণ আগে এলে আগে পাবেন ভিত্তিতে টিকার ক্রয়াদেশ নিচ্ছে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রয়োজনের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি টিকার ফরমাশ দিয়ে যেমন রেখেছে, তেমনই বহু দরিদ্র দেশে টিকাই পৌঁছায়নি। চলতি বছরের শুরুতে এসে নিম্ন আয়ের কয়েকটি দেশ অল্পসংখ্যক টিকার ক্রয়াদেশ দিয়েছে।

ডিউক মেডিক্যালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত প্রায় এক হাজার কোটি ডোজ টিকার ক্রয়াদেশ নিশ্চিত করছে ১১৫টি দেশ, দুটি জোট ও কোভ্যাক্স উদ্যোগের পক্ষে। এর মধ্যে উচ্চ আয়ের দেশগুলোর ফরমাশের পরিমাণ ৫৯৩ কোটি ডোজ; উচ্চ মধ্যবিত্ত দেশগুলোর পরিমাণ ১৮১ কোটি ডোজ। আর নিম্ন মধ্যবিত্ত দেশের ক্রয়াদেশের পরিমাণ ৯৬ কোটি এবং নিম্ন আয়ের দেশ ক্রয়াদেশ দিয়েছে মাত্র ২৭ কোটি ডোজ। এ ছাড়া আরো ৮৫০ কোটি ডোজের ক্রয়াদেশ নিয়ে টিকা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে অনেক দেশের আলাপ-আলোচনা চলছে।

এখন পর্যন্ত টিকার একটি উৎসর ওপর নির্ভরশীল এমন তালিকায় ১৬টি দেশ আছে। দেশগুলো হলো আলজেরিয়া, আর্মেনিয়া, বেলারুশ, বেনিন, গুয়াতেমালা, মালদ্বীপ, মিয়ানমার, ওমান, প্যারাগুয়ে, সান ম্যারিনো, সেনেগাল, স্লোভাকিয়া, সোমালিয়া, তাইওয়ান ও জিম্বাবুয়ে। এ ছাড়া এই তালিকায় চীনের নাম থাকলেও দেশটি অভ্যন্তরীণ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান দিয়ে নিজেদের চাহিদা মেটাচ্ছে। আর এক উৎস ক্রয়াদেশ দিতে আলোচনায় চারটি দেশ হলো বসনিয়া, সাইপ্রাস, ম্যাকাও ও মলডোবা।

অন্যদিকে সাতটি কম্পানিতে ফরমাশ দেওয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের টিকার পরিমাণ ২৮৮ কোটি ডোজ। এই জোট আরো ১৫০ কোটি ডোজের ক্রয়াদেশ দেওয়ার ব্যাপারে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। আর আফ্রিকান ইউনিয়ন টিকার তিন প্রতিষ্ঠানে ফরমাশ দিতে পেরেছে মাত্র ২৭ কোটি ডোজ। আট কম্পানিতে যুক্তরাষ্ট্রের ফরমাশের পরিমাণ ১২১ কোটি ডোজ। যুক্তরাজ্যও নির্ভর করছে আট কম্পানির ওপর, তাদের ক্রয়াদেশের পরিমাণ সাড়ে ৫১ কোটি ডোজ। আর কানাডার ফরমাশের পরিমাণ ৩৮ কোটি ডোজ। এই ধনী দেশটি টিকার সাতটি কম্পানির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে।

করোনার টিকা নিয়ে সৃষ্ট বৈষম্য প্রসঙ্গে গত ১৭ মে ডাব্লিউএইচও মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রিয়েসাস বলেছেন, টিকা নিয়ে সারা বিশ্বে যেন ‘তেলা মাথায় তেল দেওয়া’ চলছে। প্রয়োজনের জায়গায় টিকা পৌঁছছে না। যেখানে পৌঁছছে, সেখানে উদ্বৃত্ত হচ্ছে।

সেদিন প্যারিস ফোরামের বৈঠকে গেব্রিয়েসাস আরো বলেন, উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ১৫ শতাংশ মানুষ থাকলেও সেখানে টিকা মজুদ আছে ৪৫ শতাংশ। অন্যদিকে জনবহুল মধ্য ও নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে মাত্র ১৭ শতাংশ টিকা পৌঁছেছে। করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে চাইলে আগে এই টিকা বৈষম্যের সমাধান করা হোক।

চলতি সপ্তাহেই শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের টিকা প্রদানের পরিকল্পনা নিয়েছে বেশ কিছু ধনী দেশ। এ প্রসঙ্গে গেব্রিয়েসাস বলেন, বহু দেশে এখনো বয়স্ক নাগরিক ও স্বাস্থ্যকর্মী টিকা পাননি। টিকা উদ্বৃত্ত হলে স্বাচ্ছন্দ্যে ওই সব দেশে প্রতিষেধক বণ্টন করে দেওয়া উচিত। অগ্রাধিকার বুঝে অধিক ঝুঁকিপ্রবণ এলাকাগুলোতেই আগে টিকাদান কর্মসূচি শেষ করার প্রয়োজন। তারপর শিশু-কিশোরদের টিকা দেওয়া হোক।

যেসব দেশ প্রয়োজনীয়সংখ্যক কিংবা একেবারেই টিকার ক্রয়াদেশ দিতে পারেনি, তারা তাকিয়ে আছে কোভ্যাক্স উদ্যোগের দিকে। ডাব্লিউএইচও নেতৃত্বাধীন এই উদ্যোগের সঙ্গে আছে কোয়ালিশন ফর এপিডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস ইনোভেশন (সিইপিআই) ও দাতব্য সংস্থা গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিন অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন (গ্যাভি)। কোভ্যাক্সের তরফে এখন পর্যন্ত ১৬০ কোটি ডোজ টিকার ক্রয়াদেশ নিশ্চিত করা হয়েছে। এসব টিকা সরবরাহ সম্পন্ন করতে বেশ সময় লেগে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।



সাতদিনের সেরা