kalerkantho

শনিবার । ৫ আষাঢ় ১৪২৮। ১৯ জুন ২০২১। ৭ জিলকদ ১৪৪২

রায়হান হত্যা মামলা

এসআই আকবরসহ ছয়জন অভিযুক্ত

পুরোপুরি সন্তুষ্ট নয় রায়হানের পরিবার

সিলেট অফিস   

৬ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



এসআই আকবরসহ ছয়জন অভিযুক্ত

সিলেটের বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে নিৎসতনে নিহত রায়হান আহমদ হত্যা মামলায় বরখাস্ত এসআই আকবরসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে তদন্তকারী সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। গতকাল বুধবার সকাল ১১টায় সিলেটের আদালতে পুলিশের প্রসিকিউশন শাখায় অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়।

অভিযোগপত্রে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির বরখাস্ত এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়াকে প্রধান অভিযুক্ত করা হয়েছে। অন্য অভিযুক্তরা হলেন—বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির বরখাস্ত সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আশেকে এলাহি, হাসান উদ্দিন, পুলিশের কনস্টেবল হারুনুর রশিদ, টিটু চন্দ্র দাস এবং কথিত সাংবাদিক আব্দুল্লাহ আল নোমান। নোমানের বিরুদ্ধে এসআই আকবরকে পালিয়ে যেতে সহযোগিতা ও রায়হানকে নিৎসতনের আলামত ধ্বংসের অভিযোগ আনা হয়েছে।

অভিযোগপত্র দাখিলের পর গতকাল দুপুরে পিবিআই কাৎসলয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান মামলার তদন্ত তদারকি কর্মকর্তা পিবিআই সিলেটের পুলিশ সুপার মুহাম্মদ খালেদ-উজ-জামান। তিনি জানান, গতকাল সকাল ১১টায় পুলিশের প্রসিকিউশন শাখার কাছে সিলেটের

আলোচিত এই হত্যা মামলাটির অভিযোগপত্র দাখিল করে পিবিআই। প্রসিকিউশন শাখা তা ভার্চুয়াল আদালতে উপস্থাপন করবে। নিৎসতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন ২০১৩-এর ১৫ (২)(৩)-এর পেনাল কোড ২০২/২০১/৩৪ ধারায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে বলে জানান পিবিআইয়ের এই কর্মকর্তা।

অভিযোগপত্রে বলা হয়, অভিযুক্ত ছয় আসামির মধ্যে আকবরসহ প্রথম চার আসামি রায়হানকে নিৎসতনে সরাসরি জড়িত ছিল এবং বাকি দুই আসামি মামলার আলামত নষ্ট করা ও প্রধান আসামি বরখাস্ত এসআই আকবরকে পালাতে সহায়তা করেন। পাঁচ আসামি কারাগারে থাকলেও নোমান পলাতক রয়েছেন।

সংবাদ সম্মেলনে পিবিআই সিলেটের বিশেষ পুলিশ সুপার হুমায়ুন কবির জানান, গত বছরের ১১ অক্টোবর রাত পৌনে ২টার দিকে গোলাপগঞ্জের সাইদুল শেখ ও রনি শেখ সিলেট নগরীর কাস্টঘর সুইপার কলোনিতে গিয়ে ইয়াবা কেনেন। পরে ইয়াবা আসল নাকি নকল তা নিয়ে সন্দেহ হলে বাকবিতণ্ডা হয়। এ নিয়ে এক পৎসয়ে দুজনকে মারপিট করেন রায়হান। তিনি রনি শেখের একটি মোবাইল ফোন ও নগদ ৯ হাজার ৭০০ টাকা নিয়ে যান। রাতে এই এলাকায় দায়িত্বরত পুলিশ ফাঁড়ির সিয়েরা-৪ ও রোমিও-৫ টিমের কাছে মৌখিকভাবে ছিনতাইয়ের অভিযোগ করেন তাঁরা। তাঁদের অভিযোগের ভিত্তিতে কলোনির চুলাই লালের ঘর থেকে ভিকটিম রায়হান আহমদকে (৩৪) আটক করে পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে যায় দায়িত্বরত পুলিশরা। ফাঁড়িতে ছিনতাইয়ের টাকা ও মোবাইল ফোন উদ্ধার করতে পুলিশের এসআই আকবরসহ আসামিরা বেতের লাঠি দিয়ে রায়হানকে বেধড়ক পেটান। এতে গুরুতর আহত হয়ে পড়লে তাঁকে ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর পর সকাল ৭টা ৫০ মিনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রায়হানের মৃত্যু হয়। কিন্তু আসামিরা ঘটনাটি ভিন্ন খাতে নিতে ভিকটিম রায়হান আহমদ কাস্টঘরে ছিনতাইকালে গণপিটুনির শিকার হয়েছে বলে তথ্য সরবরাহ করে ঘটনাসংশ্লিষ্ট সিসি ক্যামেরার ফুটেজসহ অন্যান্য আলামত ধ্বংস করে। পিবিআই সিলেটের পুলিশ সুপার মুহাম্মদ খালেদ-উজ-জামান জানান, এ ঘটনায় তিন পুলিশ কর্মকর্তা, ফৌজদারি কার্যবিধিতে ১৬৪ ধারায় সাক্ষী দেওয়া ১০ জনের জবানবন্দিসহ মোট ৬৯ জনের সাক্ষী গ্রহণ করা হয়েছে।

তিনি জানান, অভিযোগপত্রভুক্ত ছয়জনের মধ্যে পাঁচ পুলিশ সদস্য কারাগারে এবং নোমান পলাতক রয়েছেন। এই ঘটনায় তৌহিদ মিয়া নামে আরেক পুলিশ কনস্টেবলকে গ্রেপ্তার করা হলেও সম্পৃক্ততা পাওয়া না যাওয়ায় তাঁকে অভিযুক্ত করা হয়নি।

সিলেট নগরীর আখালিয়ার বাসিন্দা রায়হান একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিকিত্সকের সহযোগী হিসেবে চাকরি করতেন। গত বছরের ১০ অক্টোবর মধ্য রাতে তাঁকে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে তুলে নিয়ে নিৎসতন করা হয়। পরের দিন সকালে তাঁর মৃত্যু হয়। ওই দিন রাতেই হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে রায়হানের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন। এ ঘটনায় মহানগর পুলিশের একটি অনুসন্ধান কমিটি ঘটনার সত্যতা পেয়ে ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়াসহ চারজনকে ১২ অক্টোবর সাময়িক বরখাস্ত ও তিনজনকে প্রত্যাহার করা হয়। ১৩ অক্টোবর পুলিশি হেফাজত থেকে পালিয়ে যান আকবর। পরে গত বছর ৯ নভেম্বর সিলেটের কানাইঘাট সীমান্ত থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এদিকে পিবিআইর পক্ষ থেকে এ অভিযোগপত্রকে যথাযথ উল্লেখ করা হলেও পুরোপুরি সন্তুষ্ট নয় রায়হানের পরিবার। রায়হানের মা সালমা আক্তার বলেন, ‘আমি পুরোপুরি সন্তুষ্ট না। কারণ চার্জশিটে যে পাঁচ পুলিশ সদস্যকে অভিযুক্ত করা হয়েছে এর বাইরেও আরো দু’-তিনজন রায়হান হত্যায় জড়িত রয়েছে। ঘটনার দিন রাতে কনস্টেবল তৌহিদ মিয়ার মোবাইল ফোন থেকে টাকা চেয়ে ফোনকল আসে। সে যদি জড়িত না থাকে তাহলে কল আসে কিভাবে? এ ছাড়া আরো পুলিশ এ ঘটনায় জড়িত আছেন।’

অভিযোগপত্রে নারাজি দেবেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘চার্জশিট মাত্র দেওয়া হলো। এটা আদালতে জমা হবে। চার্জশিটের কপি হাতে পাওয়ার পর আইনজীবীর সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’