kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৭ বৈশাখ ১৪২৮। ১০ মে ২০২১। ২৭ রমজান ১৪৪২

বি শে ষ লে খা

মা

ইমদাদুল হক মিলন

২৬ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



মা

সখীপুর এলাকার শাল-গজারি বনের ভেতর থেকে এক মহিলার কান্নার শব্দ ভেসে আসছে। রাত ৮টার দিকে কান্নার শব্দ শুনে সখীপুর গজারিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্যকে কান্নার শব্দের কথা জানায় স্থানীয় লোকজন। ওয়ার্ড সদস্য জানান চেয়ারম্যানকে। চেয়ারম্যানসহ বনের ভেতর ঢুকে মহিলার সন্ধান পাওয়া গেল। তাঁর বয়স পঞ্চাশের মতো। কিভাবে তিনি এই বনে এলেন, এখানে একা একা বসে কাঁদছেন, তাঁর মুখ থেকে ঘটনা শুনলেন চেয়ারম্যান ও অন্য লোকজন। মহিলার বাড়ি শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলায়। গাজীপুরের সালনার একটি গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিতে তাঁর ছেলে, দুই মেয়ে ও মেয়ের জামাইরা কাজ করে। ওই এলাকায়ই একটি বাসা ভাড়া করে থাকেন। ছেলেমেয়ে ও জামাতারা কাজে চলে যেত আর তাদের সংসার সামলাতেন এই মা। রান্নাবান্না করে খাওয়াতেন সবাইকে। কয়েক দিন ধরে তাঁর শরীর খারাপ। জ্বর আর সর্দি-কাশি। এ কথা শুনে আশপাশের বাড়ির লোকজন ভাবল মহিলার করোনা হয়েছে। এলাকা থেকে তাদের তাড়িয়ে দেওয়া হলো। তারপর একটি পিকআপ ভ্যান নিয়ে নালিতাবাড়ীর দিকে রওনা দিল পরিবারটি।

এই ঘটনা ঘটেছিল গত বছর এপ্রিল মাসের ১৪ তারিখে। নালিতাবাড়ী যাওয়ার পথে মহিলার ছেলেমেয়ে ও জামাতারা তাঁকে ওই শাল-গজারি বনে নামিয়ে দিয়ে বলল, ‘মা, তুমি এখানে থাকো। কাল সকালে তোমাকে এসে আমরা নিয়ে যাব।’ ছেলেমেয়েরাও সন্দেহ করেছিল মায়ের করোনা। সেই সন্দেহে বনে ফেলে গেল মাকে। তাঁর হদিস পেয়ে রাত ১২টার দিকে ইউএনওকে জানানো হলো। তিনি চিকিৎসার জন্য মহিলাকে ঢাকায় পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন। ব্যবস্থা করতে করতে রাত দেড়টা বেজে গেল। করোনার লক্ষণ থাকায় মায়ের সঙ্গে এই আচরণ করল ছেলেমেয়েরা। হয়তো তাঁর কান্নার শব্দ মানুষের কানে না পৌঁছলে বনের শিয়ালরা রাতের বেলা তাঁকে খেয়ে ফেলত। পরীক্ষা করার পর জানা গিয়েছিল মহিলা করোনায় আক্রান্ত নন। মাকে ফেলে সন্তানরা পালিয়ে গেল কিন্তু তার পাশে দাঁড়ালেন আমাদের দরদি স্বাস্থ্যকর্মীরা, এলাকার ওয়ার্ড মেম্বার, চেয়ারম্যান, ইউএনওসহ হৃদয়বান মানুষেরা।

এবারের এপ্রিল মাসের ১০ তারিখের ঘটনা। এই মায়ের বয়সও পঞ্চাশ বছর। তাঁর নাম রেহেনা পারভীন। ঝালকাঠির নলছিটিতে তাঁর বাড়ি। নলছিটি বন্দর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। ১০ এপ্রিল তিনি করোনা টেস্ট করান। সপ্তাহখানেক কেটে গেলেও রেজাল্ট পাননি। ১৭ এপ্রিল তাঁর শ্বাসকষ্ট শুরু হলো। তরুণ ব্যাংকার ছেলে জিয়াউল হাসান টিটু বাড়িতে অক্সিজেন সিলিন্ডার কিনে আনলেন। কিন্তু মায়ের অবস্থার উন্নতি হলো না। মাকে বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার জন্য অ্যাম্বুল্যান্স বা অন্য কোনো যানবাহনের ব্যবস্থা করতে পারলেন না জিয়াউল। কিন্তু মাকে বাঁচাতে হবে। সিদ্ধান্ত নিলেন, নিজের মোটরসাইকেলে করে ১৮ কিলোমিটার দূরের ওই হাসপাতালে মাকে নিয়ে যাবেন। গামছা দিয়ে নিজের পিঠে বাঁধলেন অক্সিজেন সিলিন্ডার। মায়ের মুখে মাস্ক পরিয়ে তাঁকে বসালেন মোটরসাইকেলের পিছনে। ১৮ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে মাকে নিয়ে এলেন বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। ছয় দিন চিকিৎসা নিলেন মা। কিন্তু তাঁর করোনা শনাক্ত হয়নি। মাকে নিয়ে জিয়াউল যখন হাসপাতালে ছুটছিলেন তখন তাঁর ছোট ভাই আরেকটি মোটরসাইকেল নিয়ে তাঁদের সঙ্গে রওনা দিয়েছিলেন। ভাইয়ের নাম রাকিব হাসান। সে ইউনিভার্সিটির ছাত্র। দুই দিন আগে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেন মা।

এই দুটি ঘটনাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বনে ফেলে যাওয়া মায়ের সন্তানদের যেমন নিন্দা জানিয়েছে মানুষ, তেমনি জিয়াউলের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য জিয়াউলের। তাঁর মা ও ছোট ভাইয়ের করোনার রেজাল্ট নেগেটিভ, তাঁর হয়েছে পজিটিভ। তাতেও জিয়াউলের মন খারাপ হয়নি। কালের কণ্ঠ’র বরিশাল ও ঝালকাঠি প্রতিনিধিকে তিনি বলেছেন, ‘তাতে কি! আমার মা তো সুস্থ আছে।’ এই সংবাদ পড়ে, মায়ের জন্য ছেলের আকুতি দেখে দেশের মানুষ আবেগে আপ্লুত হয়েছে।

মায়ের চেয়ে আপন কে আছে এই পৃথিবীতে! মায়ের চেয়ে বড় কে আছে! মায়ের চেয়ে বহুল উচ্চারিত শব্দ আর নেই। মাকে নিয়ে সারা পৃথিবীতে কত গল্পগাথা, কত গান কবিতা নাটক গল্প উপন্যাস সিনেমা। কত রূপকথা, কত লোকগাথা। গ্রাম্য কবি লেখেন, ‘মায়ের চেয়ে আপন কেহ নাই রে।’ আবার কোনো কবি লেখেন, ‘মধুর আমার মায়ের হাসি।’ মা-হারা এক গ্রাম্য কিশোরী গভীর জ্যোত্স্নারাতে মায়ের জন্য কাঁদে আর গায়— ‘মাগো তোমার মতো নেয় না কেহ আমায় বুকে টানি আঁচল দিয়া মোছায় না কেউ আমার চোখের পানি হায় রে মা জননী আমার, হায় রে মা জননী।’

পুরান ঢাকার নামকরা এক মাস্তানকে একবার দেখেছিলাম তার মায়ের লাশের সামনে শিশুর মতো গড়াগড়ি খেয়ে কাঁদছিল। যার ভয়ে এলাকা কাঁপে, মৃত মায়ের উদ্দেশে সে বলছে, ‘মাগো ওমা মা, আমারে তুমি কার কাছে রাইখা গেলা? আমি অহন থাকুম কার কাছে? কে আমারে দেখব?’

ভদ্রলোকের বয়স প্রায় ৭০। মায়ের বয়স ৯০-এর কাছাকাছি। ভদ্রলোকের বুক ব্যথা করছিল। দিশেহারা হয়ে ভাবলেন হার্টের ব্যথা। ছেলেমেয়েরা ডাক্তারের কাছে নিতে চাইল। তিনি বুকে হাত দিয়ে চলে গেলেন পাশের রুমে মায়ের কাছে। মা বিছানায় বসা। ছেলে তাঁর কোলের কাছে শুয়ে পড়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘আমার বুকটা খুব ব্যথা করছে মা। তুমি একটু হাত বুলিয়ে দাও।’

ছেলের বুকে হাত বোলাতে বোলাতে মা বললেন, ‘তোমার কিছু হয়নি বাবা। এমনি একটু ব্যথা হয়েছে। এখনই কমে যাবে। তার পরও ডাক্তারের কাছে যেয়ো।’

আশ্চর্যজনকভাবে ছেলের বুকের ব্যথা কমে গেল। তিনি হাসিমুখে নিজের রুমে ফিরে এলেন। ব্যাপারটা নিশ্চয় মানসিক। মায়ের জাদুমাখা হাত তাঁর মনের শক্তি বাড়িয়ে দিয়েছিল।

সৃষ্টিকর্তার পর মা-ই হচ্ছেন মানুষের সবচেয়ে বড় স্নেহের আশ্রয়স্থল। সন্তানের হৃদয়ে শান্তি স্বস্তি সবই এনে দিতে পারেন মাত্র একজন মানুষ। তিনি মা। আর এই মায়ের সঙ্গেই আমরা এমন অমানবিক আচরণ করি? বনে ফেলে যাই তাঁকে।

করোনার এই দুঃসহকাল অনেক কিছু শিখিয়েছে আমাদের। আমরা যেমন অমানবিক হয়েছি, আবার মানবিকও হয়েছি। গত এক বছরে কত সংগঠনের ছেলেমেয়েরা জীবন বাজি রেখে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে! আমাদের পুলিশ বাহিনী দাঁড়িয়েছে। ডাক্তার আর স্বাস্থ্যকর্মীরা দাঁড়িয়েছেন। কত ডাক্তার আর স্বাস্থ্যকর্মী করোনা রোগী বাঁচাতে গিয়ে নিজেরা আক্রান্ত হয়েছেন, প্রাণ দিয়েছেন। কত পুলিশ ভাই আক্রান্ত হয়েছেন, জীবন দিয়েছেন। করোনায় মারা যাওয়া ব্যক্তির জানাজা পড়াতে চাননি কেউ। ইউএনও নিজে জানাজা পড়িয়েছেন। বিনামূল্যে অক্সিজেন সিলিন্ডার সরবরাহ করছেন যুবকরা। করোনায় মৃত মানুষের লাশ বহন করছেন, দাফন করছেন। দুঃসময়ে মানুষের পাশে মানুষকে দাঁড়াতে হয়। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের একটি সংগঠন ‘বৃহন্নলা’। তাঁরা প্ল্যাকার্ড হাতে হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে থাকেন। অ্যাম্বুল্যান্স থেকে রোগী নামাতে সাহায্য করেন। হাসপাতালে ভর্তি করতে সাহায্য করেন, যত রকমের সহযোগিতা একজন রোগীর দরকার, নিজেদের জীবনের মায়া না করে তা করছেন। বাঙালি জাতির বড় সম্পদ তাদের আবেগ। আমরা সেই আবেগ, মায়া-মমতা ও ভালোবাসা নিয়ে এই ঘোরতর বিপদের দিনে যেন মানুষের পাশে দাঁড়াই। যার যতটুকু সামর্থ্য আছে তাই নিয়ে অসহায় মানুষকে সহযোগিতা করি। আর যেন কোনো মাকে কোনো সন্তান বনে ফেলে না যায়। অমানবিক যেন না হই আমরা একজনও। মানুষ মানুষের জন্য—কথাটা যেন আমরা মনে রাখি। সন্তানের অবহেলায় যেন চোখের জলে না ভাসেন কোনো মা। আমরা যেন জিয়াউল হাসান টিটুর মতো হই। মায়ের জন্য সবকিছু করতে তৈরি থাকি। হিব্রু ভাষায় একটি প্রবাদ আছে, “ঈশ্বর যেহেতু সব জায়গায় থাকতে পারেন না সেজন্য তিনি ‘মা’ সৃষ্টি করেছেন।”

 



সাতদিনের সেরা