kalerkantho

রবিবার। ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৬ মে ২০২১। ০৩ শাওয়াল ১৪৪২

বিদায় শঙ্খ ঘোষ

থেমে গেল পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ

সফেদ ফরাজী   

২২ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



 থেমে গেল পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ

‘গহ্বরে মিলিয়ে যায় স্বর। স্তব্ধ শ্বাস। তারপর/তিনি ফিরে তাকালেন আমাদের দিকে।/বললেন, এবার আসুন এক শতাব্দী আমরা/নীরব হয়ে দাঁড়াই’—হ্যাঁ, আজ অশ্রুভেজা চোখে নীরব, শোকগ্রস্ত, বাকরুদ্ধ বাংলা সাহিত্যের জগৎ। কারণ কবি শঙ্খ ঘোষ পাড়ি জমিয়েছেন অনন্তলোকে। করোনায় আক্রান্ত হয়ে থেমে গেল ‘পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ’। এর সঙ্গে স্তব্ধ হয়ে গেল বাংলা কবিতার উজ্জ্বল একটা যুগও।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জীবনানন্দ দাশের পর বাংলা কবিতার স্বতন্ত্র ভাষাভঙ্গির খোঁজে যে তরুণ কবিরা কৃত্তিবাস বা শতভিষা পত্রিকাকে কেন্দ্র করে নতুন এক কাব্যজগতের সৃষ্টি করেছিলেন, শঙ্খ ছিলেন তাঁদের অন্যতম একজন। শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষ, উৎপলকুমার বসু ও বিনয় মজুমদার—এই পাঁচ কবিকে বলা হতো জীবনানন্দ-পরবর্তী বাংলা কবিতার পঞ্চপাণ্ডব। চারজন চলে গিয়েছিলেন আগেই। ৮৯ বছর বয়সে গতকাল বুধবার শঙ্খও চলে গেলেন।

গায়ে জ্বর আসায় গত সপ্তাহে করোনা পরীক্ষা করিয়েছিলেন কবি। ১৪ এপ্রিল রিপোর্ট এলে জানা যায় তিনি সংক্রমিত। কিন্তু যেতে চাননি হাসপাতালের কোলাহলের মধ্যে। তাই বাড়িতেই চলছিল চিকিৎসা। মঙ্গলবার রাতে হঠাৎ তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে শুরু করে। গতকাল সকালে তাঁকে নেওয়া হয় ভেন্টিলেটরে। কিন্তু দুপুর ১২টার দিকে চিরদিনের মতো চুপ হয়ে যান তিনি। বিকেলে নিমতলা শ্মশানে অনুষ্ঠিত হয় তাঁর শেষকৃত্য।

শঙ্খ ঘোষ ছিলেন কারো কাছে অভিভাবকসম, কারো কাছে অগ্রজের সমান, কারো বা পরম আশ্রয়। তাঁকে হারিয়ে শুধু পশ্চিমবঙ্গই নয়, বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা তাঁর ভক্ত-শুভানুধ্যায়ীরা শোকগ্রস্ত। তাঁর ‘কাব্যশিষ্য’ হিসেবে পরিচিত কবি জয় গোস্বামী বলেন, ‘বাংলা সাহিত্যজগতে মহাবটবৃক্ষের পতন ঘটল। তরুণ কবি এবং লেখকদের মাথার ওপর পিতা এবং অভিভাবকস্বরূপ বিরাজ করছিলেন উনি। জাতির বিবেক হিসেবে ছিলেন। মাথার ওপর থেকে সেই আশ্রয় সরে গেল। নিঃস্ব হলাম।’ তিনি বলেন, ‘আমার কী হারাল, তা আমিই জানি। আর বাংলা সাহিত্যজগৎ কী হারাল, তা যত দিন যাবে ততই বুঝবে সকলে।’

কথাসাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘শঙ্খদাকে শুধু কবি বললে ব্যাপারটা একপেশে হয়ে যায়। তিনি আসলে সাহিত্যের অভিভাবক। সত্যিকারের অভিভাবক সবাই হতে পারে না। একবার দেখলাম, জুনিয়র এক কবির কবিতা সংশোধন করছেন। এত বড় মাপের কবির কি এটা কাজ? কী দরকার ওঁর? কিন্তু ওই যে! দায়িত্ববোধ আর স্নেহ।’

মৃত্যুর পর তাঁর বহু কবিতা ও পঙক্তি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করছেন তাঁর ভক্তরা। সবচেয়ে বেশি শেয়ার হচ্ছে তাঁর ‘আয়ু’ কবিতাটি। যেখানে তিনি লিখেছেন, ‘এত বেশি কথা বলো কেন? চুপ করো/শব্দহীন হও/শষ্পমূলে ঘিরে রাখো আদরের সম্পূর্ণ মর্মর/লেখো আয়ু লেখো আয়ু...।’

শঙ্খ ঘোষের জন্ম ১৯৩২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের চাঁদপুরে। তাঁর পারিবারিক নাম চিত্তপ্রিয় ঘোষ। বাবা মণীন্দ্রকুমার ঘোষের পৈতৃক ভিটা ছিল বরিশালের বানারীপাড়ায়। তবে বাবার কর্মস্থলের সূত্রে শঙ্খ ঘোষের কৈশোরের একটি অংশ কেটেছে পাবনায়। সেখানে চন্দ্রপ্রভা বিদ্যাপীঠ থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন তিনি। দেশভাগের পর পরিবারের সঙ্গে চলে যান পশ্চিমবঙ্গে।

চুপচাপ থাকতে পছন্দ করলেও তাঁর রক্তের ভেতর একই সঙ্গে ছিল প্রেম ও বিদ্রোহ। এ জন্যই বিদ্রোহ থেকে শুরু করে প্রেমের অনুভূতি—শব্দকে হাতিয়ার করে সর্বত্রই অনায়াস বিচরণ করেছেন শঙ্খ। প্রতিবাদকে ভাষায় ফোটাতে কলমকে সঙ্গী করেছেন। সে ভাষায় কথা বলেছে অগণিত মানুষ। তাঁর চলে যাওয়ায় প্রতিবাদের ভাষার জগতেও সৃষ্টি হলো গভীর শূন্যতা।

শঙ্খ ঘোষের রোমান্টিক কাব্যভাষা প্রেমের লহরি বাজিয়েছে বাঙালি মধ্যবিত্তের বাস্তবতায় ভিন্ন এক ব্যঞ্জনায়। আবার তা প্রতিবাদী হয়েও দ্যুতি ছড়িয়েছে প্রায়ই। জরুরি অবস্থার মধ্যে দুঃশাসনের বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিবাদ এসেছে ছন্দের ছদ্ম আবরণে। আবার কখনো তা অনেক সরাসরি তীব্র শ্লেষের তীর হয়ে বিঁধেছে।

তিনি ছিলেন একাধারে কবি, গদ্যশিল্পী, রবীন্দ্র গবেষক, সাহিত্য সমালোচক ও শিক্ষক। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক শেষ করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর করেন। পরে পেশা হিসেবে শিক্ষকতাকে বেছে নেন। কলকাতার বঙ্গবাসী কলেজ, সিটি কলেজ ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করার পর ১৯৬৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক লেখক কর্মশালায় যোগ দেন। পরে ফিরে এসে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়, সিমলার ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্সড স্টাডিজ এবং বিশ্বভারতীতে তিনি অধ্যাপনা করেন।

শঙ্খ ঘোষের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘দিনগুলি রাতগুলি’ প্রকাশিত হয় ১৯৫৬ সালে। এরপর তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—‘মূর্খ বড় সামাজিক নয়’, ‘বাবরের প্রার্থনা’, ‘তুমি তো তেমন গৌরী নও’, ‘পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ’, ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’, ‘বন্ধুরা মাতি তরজায়’, ‘ধুম লেগেছে হৃত্কমলে’, ‘লাইনেই ছিলাম বাবা’, ‘গান্ধর্ব কবিতাগুচ্ছ’, ‘শবের উপরে শামিয়ানা’, ‘ছন্দের ভিতরে এত অন্ধকার’, ‘মাটিখোঁড়া পুরোনো করোটি’, ‘বহুস্বর স্তব্ধ পড়ে আছে’, ‘শুনি নীরব চিৎকার’, ‘এও এক ব্যথা উপশম’ ইত্যাদি। কবিতায় যেমন নিজস্ব একটা ঘরানা তৈরি করেছিলেন, তেমনি গদ্যেও। তাঁর গদ্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—‘ওকাম্পোর রবীন্দ্রনাথ’, ‘নিঃশব্দের তর্জনী’, ‘ছন্দের বারান্দা’, ‘উর্বশীর হাসি’, ‘শব্দ আর সত্য’, ‘নির্মাণ আর সৃষ্টি’, ‘কবিতার মুহূর্ত’, ‘কবির অভিপ্রায়’, ‘সময়ের জলছবি’, ‘লেখা যখন হয় না’ ইত্যাদি। শঙ্খ ঘোষ ছোটদের জন্যও বেশ কিছু বই লিখেছেন।

‘বাবরের প্রার্থনা’ কাব্যগ্রন্থের জন্য ১৯৭৭ সালে ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরস্কার ‘সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার’ পান শঙ্খ ঘোষ। কন্নড় ভাষা থেকে বাংলায় অনূদিত ‘রক্তকল্যাণ’ নাটকটির জন্য ১৯৯৯ সালে আবারও তিনি ‘সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার’ পান। এ ছাড়া রবীন্দ্র পুরস্কার, সরস্বতী সম্মান, জ্ঞানপীঠ পুরস্কার পাওয়া এ সাহিত্যিককে ২০১১ সালে পদ্মভূষণ পদকে সম্মানিত করে ভারত সরকার।

তাঁর মৃত্যুতে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, ‘কভিডে মারা গেছেন শঙ্খদা। তা সত্ত্বেও যাতে রাষ্ট্রীয় সম্মানের সঙ্গে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন করা যায়, মুখ্য সচিবকে তেমন নির্দেশ দিয়েছি। তবে শঙ্খদা গান স্যালুট

পছন্দ করতেন না। তাই সেটা বাদ রাখছি।’

‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’ কবিতায় শঙ্খ ঘোষ লিখেছিলেন, ‘একলা হয়ে দাঁড়িয়ে আছি/তোমার জন্যে গলির কোণে/ভাবি আমার মুখ দেখাব/মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে...।’ সত্যি সত্যিই আজ তিনি একলা হয়ে গেলেন। কিন্তু সাহিত্যবোদ্ধাদের মতে, তিনি তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে পাঠকের মনে আরো বহু বহুদিন বেঁচে থাকবেন আলোক শিখা হয়ে।