kalerkantho

বুধবার । ১ বৈশাখ ১৪২৮। ১৪ এপ্রিল ২০২১। ১ রমজান ১৪৪২

পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ১২ বছর

সময় পার হলেও আপিল করেনি অর্ধেক আসামি

► হত্যা মামলার বিচার চূড়ান্ত পর্যায়ে
► বিস্ফোরক মামলা এখনো নিম্ন আদালতেই

এম বদি-উজ-জামান   

২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সময় পার হলেও আপিল করেনি অর্ধেক আসামি

পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহ ও নৃশংস হত্যাযজ্ঞের ১২ বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ বৃহস্পতিবার। ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন বিডিআর (বর্তমান বিজিবি) সদর দপ্তর পিলখানায় এই বাহিনীর একদল সদস্যের হাতে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনকে হত্যার ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে দুটি মামলার মধ্যে হত্যা মামলায় এরই মধ্যে নিম্ন আদালত ও হাইকোর্ট থেকে রায় দেওয়া হয়েছে। এখন মামলাটির বিচার চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে আপিল বিভাগে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই মামলায় হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ও যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা ৩২টি আপিল করেছেন এবং যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ও অন্যান্য মেয়াদে সাজাপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে আপিল করার অনুমতি চেয়ে (লিভ টু আপিল) ৩৯টি আবেদন করা হয়েছে। সব মিলিয়ে মোট ৭১টি আবেদন করা হয়েছে আপিল বিভাগে। এর মধ্যে আসামিপক্ষে ৫১টি এবং রাষ্ট্রপক্ষ থেকে সাজা বাড়াতে ২০টি আবেদন করা হয়েছে। হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার নির্ধারিত সময়সীমা এরই মধ্যে পার হলেও এখনো সাজাপ্রাপ্ত প্রায় অর্ধেক আসামি কোনো আবেদন করেননি।

সব আবেদন দাখিল করা শেষ হলে প্রত্যেকের ক্ষেত্রে আলাদা মামলার সারসংক্ষেপ দাখিল করা হবে। এরপর তা আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতির আদালত হয়ে আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে যাবে। ফলে আপিল বিভাগে কখন এ মামলার বিচার শুরু হবে, তা নির্ভর করছে প্রধান বিচারপতির সিদ্ধান্তের ওপর। তবে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে চলতি বছরেই শুনানির উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।

একই ঘটনায় বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে অভিন্ন আসামিদের বিরুদ্ধে করা মামলায় নিম্ন আদালতে এখনো বিচার সম্পন্ন হয়নি। এই মামলায় ২০১০ সালে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হলেও গত ১০ বছরে এক হাজার ২৬৪ জন সাক্ষীর মধ্যে মাত্র ১৮৫ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে। ফলে এ মামলায় নিম্ন আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণ পর্ব শেষ হয়ে রায় প্রদানে আরো কয়েক বছর লেগে যেতে পারে বলে ধারণা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের।

হত্যা মামলায় ২০১৭ সালের ২৬ ও ২৭ নভেম্বর প্রকাশ্য আদালতে সংক্ষিপ্ত রায় দেওয়া হয়। গত বছরের ৮ জানুয়ারি ২৯ হাজার ৫৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। রায়ে ১৩৯ জনকে ফাঁসি, ১৮৫ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ২০০ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এ ছাড়া নিম্ন আদালতের সাজার বিরুদ্ধে ২৮ জন আপিল না করায় তাঁদের সাজা বহাল রাখা হয়। সব মিলিয়ে ৫৫২ জনকে সাজা দেন হাইকোর্ট। হাইকোর্টের রায়ে ২৮৩ জনকে খালাস দেওয়া হয়। সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে যাঁদের সাজা খাটা হয়ে গেছে তাঁরাও মুক্তি পাচ্ছেন না। বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলার আসামি হওয়ায় ওই মামলার বিচার সম্পন্ন না হওয়ায় তাঁরা এখনো কারাবন্দি।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, প্রত্যেক আসামির জন্য পৃথকভাবে একটি করে পেপারবুক দিয়ে আপিল করার নিয়ম থাকলেও এ মামলায় তার ব্যতিক্রম করা হয়েছে। এ মামলায় এক হাজার ৯৬০ খণ্ডে একটি পেপারবুকেই ৬৬ হাজার পৃষ্ঠার নথি হওয়ায় হয়রানি ও খরচ এড়াতে প্রধান বিচারপতি প্রশাসনিক ক্ষমতাবলে বিশেষ সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। তাঁর সিদ্ধান্তের পরই একটি পেপারবুক দিয়ে লিভ টু আপিল আবেদন দাখিল করা হয়েছে। অন্য আসামিরা পেপারবুক ছাড়াই শুধু মেমো দিয়ে আবেদন দাখিল করেছেন। সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে অর্ধেক আসামি আপিল বিভাগে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন করতে পেরেছেন। যাঁরা এখনো আবেদন করতে পারেননি তাঁরাও বিলম্ব মওকুফের আবেদন দিয়ে আদালতের অনুমতি নিয়ে লিভ টু আপিল আবেদন করার সুযোগ পেতে পারেন।

জানা গেছে, হাইকোর্ট যাঁদের খালাস দিয়েছেন এঁদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে আবেদন করা হয়েছে। এ ছাড়া সাজা কম দেওয়া হয়েছে এমন কয়েকজনের বিরুদ্ধেও রাষ্ট্রপক্ষ থেকে সাজা বাড়াতে আবেদন করা হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ থেকে এ রকম ২০টি আবেদন করা হয়েছে বলে জানা গেছে। আর সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে ২০৩ জনের পক্ষে ৪৯টি আবেদন দাখিল করা হয়েছে। কয়েকজন আসামির পক্ষে কারাগার থেকে দুটি আবেদন (জেল আপিল) করা হয়েছে।

নিয়ম অনুযায়ী, হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হলে এই আপিলের বিচারের মধ্য দিয়ে মামলাটির বিচারপ্রক্রিয়া চূড়ান্তভাবে সম্পন্ন হবে। যদিও এরপর রিভিউ আবেদন করার সুযোগ থাকবে। রিভিউ আবেদন নিষ্পত্তি হওয়ার পর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চেয়ে আবেদন করা ছাড়া আর কোনো সুযোগ থাকবে না। এই নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডের পর সরকার বাহিনীর নাম পরিবর্তন করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) নামকরণ করেছে।

আপিল বিভাগে শুনানির বিষয়ে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন বলেন, সব আপিল দাখিল হওয়ার পর মামলার শুনানির তারিখ নির্ধারণের জন্য আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতির আদালতে আবেদন করা হবে। তিনি বলেন, স্বাভাবিক নিয়মে এই বছরের শেষ দিকে এ মামলার শুনানি হতে পারে। তবে এরও আগে যাতে শুনানি করা যায় সে জন্য রাষ্ট্রপক্ষ থেকে তারিখ নির্ধারণের জন্য আবেদন করা হবে।

আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, হত্যা মামলায় হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার অনুমতি চেয়ে লিভ টু আপিল আবেদন করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী প্রত্যেক আসামির ক্ষেত্রে মামলার সারসংক্ষেপ তৈরি করা হবে। চেম্বার বিচারপতির আদালতে আবেদন জানানো হবে। চেম্বার আদালত তা আপিল বিভাগের ফুল কোর্টে পাঠালে সারসংক্ষেপ দাখিল করা হবে। এরপর প্রধান বিচারপতি শুনানির তারিখ নির্ধারণ করবেন। তিনি বলেন, হাইকোর্টের রায়ে যাঁরা খালাস পেয়েছেন বা যাঁদের কম সাজা হয়েছে, এরই মধ্যে সাজা খাটা হয়ে গেছে তাঁরা রায়ের সুবিধা পাচ্ছেন না। কারণ হলো, এই মামলার অনেক আসামি বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলারও আসামি। ওই মামলায় জামিন না পাওয়ায় অনেকেই অহেতুক হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

বহুল আলোচিত পিলখানা হত্যা মামলায় বিচার শেষে ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর ঢাকার তৃতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত রায় দেন। রায়ে ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ১৬০ জনকে যাবজ্জীবন এবং ২৫৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয় আর ২৭৮ জনকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়। এরপর ফাঁসির আসামিদের সাজা অনুমোদনের জন্য নিম্ন আদালত থেকে হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স পাঠানো হয়। কারাবন্দি আসামিরা সাজার বিরুদ্ধে আপিল করেন। এ ছাড়া সরকারের পক্ষ থেকেও পৃথক তিনটি আপিল করা হয়। সব আবেদনের ওপর শুনানি শেষে হাইকোর্ট রায় দেন।

 

মন্তব্য