kalerkantho

মঙ্গলবার । ১২ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৭ জুলাই ২০২১। ১৬ জিলহজ ১৪৪২

শহীদ মিনার ঘিরে পরিকল্পনা কবে আলোর মুখ দেখবে

আজিজুল পারভেজ   

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে




শহীদ মিনার ঘিরে পরিকল্পনা কবে আলোর মুখ দেখবে

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে গেলেই প্রবেশপথের বাঁ পাশে চোখে পড়বে বিশাল এক কালো বোর্ড। তাতে লেখা রয়েছে মহান একুশে ফেব্রুয়ারি ও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নিয়ে হাইকোর্টের দেওয়া আটটি নির্দেশনা। তবে বাস্তবতার সঙ্গে এসব নির্দেশনার কোনো মিল নেই। এগুলোর বেশির ভাগ দীর্ঘ ১০ বছরেও বাস্তবায়িত হয়নি।

আট নির্দেশনার প্রথমটি ছিল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের নির্ধারিত এলাকায় সার্বক্ষণিক পাহারার ব্যবস্থা করা। কিন্তু এ নির্দেশনা আমলেই নেওয়া হয়নি। সারা বছরই শহীদ মিনার অরক্ষিত অবস্থায় থাকে। কোনো নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা, এমনকি আলোও থাকে না। ফলে ছিনতাইসহ নানা অপরাধমূলক ঘটনা ঘটে অহরহ। সর্বশেষ গত জানুয়ারিতে এক কিশোরীকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা ঘটেছে এখানে।

দ্বিতীয় নির্দেশনায় বলা আছে, শহীদ মিনারের পবিত্রতা রক্ষায় পূর্ত মন্ত্রণালয় কমপক্ষে তিনজন নিরাপত্তাকর্মী এবং ঢাকা সিটি করপোরেশন তিনজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগ দেবে। পূর্ত মন্ত্রণালয় প্রথমে দুজন ও চলতি মাসে আরো একজন কর্মী নিয়োগ দিলেও সিটি করপোরেশন কোনো পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগ দেয়নি। তৃতীয় নির্দেশনায় ছিল সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ভাষাশহীদদের ছবিসংবলিত সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্ত তৈরি করে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করবে। কিন্তু এ রকম কিছুই হয়নি। চতুর্থ, পঞ্চম ও সপ্তম নির্দেশনা ছিল ভাষাসংগ্রামীদের তালিকা তৈরি, আর্থিক সহায়তা ও রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা প্রদানসংক্রান্ত। তালিকার বিষয়ে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় একটি কমিটি গঠন করেছিল। সেই কমিটি এত বছর পর তালিকা তৈরি হলে তা সঠিক হবে না বলে মত দেয়। ষষ্ঠ নির্দেশনা ছিল শহীদ মিনারের পাশে একটি পাঠাগারসহ ভাষা জাদুঘর নির্মাণ করতে হবে। ভাষা আন্দোলনের প্রকৃত ইতিহাস সন্নিবেশিত করে ব্রুশিয়ার তৈরি করে জাদুঘরে রাখতে হবে। পূর্ত মন্ত্রণালয়কে ২০১২ সালের জানুয়ারির মধ্যে জাদুঘরের নির্মাণকাজ শেষ করতে হবে। কিন্তু এগুলোও বাস্তবায়িত হয়নি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শহীদ মিনারের পাশের একটি পুরনো ভবনকে জাদুঘরে পরিণত করার জন্য নির্বাচন করা হয়েছে। কিন্তু আর কোনো অগ্রগতি নেই এ কাজে। এ ছাড়া অষ্টম নির্দেশনাটি ছিল বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নির্মাণ ও সংরক্ষণ করা বিষয়ে।

হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের পক্ষে অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদের একটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১০ সালের আগস্টে শহীদ মিনারের ‘মর্যাদা ও পবিত্রতা’ এবং ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি রক্ষায় রায় দেন হাইকোর্ট। ওই রায়ের সঙ্গেই এই আট দফা নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু রায় ১০ বছরেও কার্যকর না করায় বিষয়টি তামাশায় পরিণত হয়েছে। অন্য একটি রায়ে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ থেকে একটি ভুয়া মাজারসহ সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের নির্দেশ দিয়েছিলেন উচ্চ আদালত। কিন্তু সেই মাজারও বহাল তবিয়তে রয়ে গেছে। এসব ব্যাপারে বিভিন্ন সময় আদালত ক্ষোভও প্রকাশ করেছেন। নির্দেশনা না মানায় ২০১২ সালে আদালত অবমাননার অভিযোগ আনা হলে ওই সময় সংস্কৃতিসচিব আদালতে হাজির হয়ে এর ব্যাখ্যাও দিয়েছিলেন। এরপর ২০১৭ সালে আবার হাইকোর্ট জানতে চান পাঠাগারসহ ভাষা জাদুঘর নির্মাণের আদেশ বাস্তবায়নে সরকার কী পদক্ষেপ নিয়েছে।

এসব ব্যাপারে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের জাদুঘর শাখা ও আইন শাখায় যোগাযোগ করা হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কোনো তথ্য জানাতে পারেননি। এরপর সংস্কৃতিসচিবের দপ্তরে যোগাযোগ করা হলে সেখানকার একজন কর্মকর্তা নাম না প্রকাশ করার শর্তে জানান, সংস্কৃতিসচিব তাঁদের জানিয়ে রেখেছেন, এ ব্যাপারে তিনি গণমাধ্যমে কোনো বক্তব্য দেবেন না। পরে গত শুক্রবার সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, এ বিষয়ে তিনি অবগত নন। খোঁজ নিয়ে ও কাগজপত্র দেখে পরে জানাতে পারবেন।

বিষয়টি নিয়ে অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, কাজগুলো করতে এত সময় লাগার কথা না। আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু হলে বিষয়টি আবার নজরে আনা হবে। এদিকে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আবদুল্লাহ বাশার মাহমুদ জানান, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি আদালতে একটি রিট মামলার শুনানিকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারসংক্রান্ত আগের রায়ের বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। রায়ের কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে, কতুটুকু হয়নি সেই খোঁজ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাধ্যমে নেওয়া হবে।