kalerkantho

শুক্রবার । ১৩ ফাল্গুন ১৪২৭। ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১। ১৩ রজব ১৪৪২

কাশিমপুর কারাগারে বন্দির নারীসঙ্গ

প্রত্যাহার সিনিয়র জেল সুপার-জেলার

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ও গাজীপুর   

২৫ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



প্রত্যাহার সিনিয়র জেল সুপার-জেলার

মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে কাশিমপুর-২ কারাগারে এক বন্দির সঙ্গে বাইরের এক নারীর একান্ত সময় কাটানোর ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। তিনি গতকাল রবিবার দুপুরে কারা অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতনদের ডেকে পাঠান। পরে তাঁদের সঙ্গে বৈঠকের সময় কারাগারে এসব কর্মকাণ্ড রোধে কঠোর হওয়ার নির্দেশ দেন।

এ ঘটনায় গতকাল কাশিমপুর কারাগার-১-এর সিনিয়র জেল সুপার রত্না রায় ও জেলার নূর মোহাম্মদকে প্রত্যাহার করে কারা সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজনস) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মোমিনুর রহমান মামুন। তাঁদের স্থলে কাশিমপুর-১ কারাগারের জেল সুপারের দায়িত্ব (অতিরিক্ত দায়িত্ব) দেওয়া হয়েছে হাই সিকিউরিটি কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মো. গিয়াস উদ্দিনকে। আর জেলার হিসেবে দায়িত্ব পাচ্ছেন মাগুরা জেলা কারাগারের জেলার হৃতেশ চাকমা।

কাশিমপুর কারাগার সূত্রে জানা গেছে, সিনিয়র জেল সুপার রত্না রায় ও জেলার নূর মোহাম্মদ মৃধা গতকাল দুপুর ১২টায় কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মো. গিয়াস উদ্দিনের কাছে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে ঢাকার উদ্দেশে কারাগার ত্যাগ করেন।

এর আগে এই ঘটনায় ডেপুটি জেল সুপার গোলাম সাকলাইন, সার্জেন্ট আব্দুল বারী ও সহকারী প্রধান কারারক্ষী খলিলুর রহমানকে প্রত্যাহার করা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এ ঘটনার সময় কারাগারসংশ্লিষ্ট যাঁরা উপস্থিত ছিলেন, তাঁদের সবার কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করছে তদন্ত কমিটি। তাঁদের মধ্যে থেকেও কেউ কেউ শাস্তির আওতায় আসতে পারেন।

ঘুষ নিয়ে কাশিমপুর কারাগার পার্ট-১-এ বন্দিদের নানা সুযোগ দেওয়ার ঘটনা ছিল ওপেন সিক্রেট। বিশেষ করে প্রায় এক বছর আগে রত্না রায় কারাগারে যোগ দিয়ে একটি চক্র গড়ে তোলেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

গত ৬ জানুয়ারি দুপুরে কাশিমপুর-১ কারাগারের ডেপুটি জেলার গোলাম সাকলাইন এক নারীকে কারাগারের ভেতর স্বাগত জানান। ওই নারীকে নিয়ে যাওয়া হয় একটি কক্ষে। সেখান থেকে সাকলাইন বের হয়ে যান। কিছুক্ষণ পরই হলমার্ক কেলেঙ্কারি মামলার আসামি কারাবন্দি (হাজতি) তুষার আহমেদ ওই কক্ষে যান। ১০ মিনিট পর জেল থেকে বেরিয়ে যান জেল সুপার রত্না রায়। পরে তুষার ও ওই নারী একটি কক্ষে একান্তে সময় কাটান। এ ঘটনাটি জেনে যায় বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা। তারা খোঁজ-খবর শুরু করে। এরই মধ্যে জেল সুপার রত্না রায় নিজেকে নির্দোষ দাবি করে একটি চিঠি লিখে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ঘটনাটি জানান। তখন কারা অধিদপ্তর থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এরপর বেরিয়ে আসতে থাকে কারাবিধি লঙ্ঘন করে কী করে এমন ঘটনা ঘটানো হলো।

জানা গেছে, গতকাল দুপুরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের ডাকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বৈঠক করতে আসেন আইজি প্রিজনস ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মোমিনুর রহমান মামুন। পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা কাশিমপুর কারাগারে বন্দির নারীসঙ্গের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নির্দেশ দেন এ ধরনের ঘটনাসহ কোনো ধরনের অপরাধ কারাগারে যেন আর না ঘটে। সে জন্য যতটা কঠোর হওয়া দরকার, ততটা কঠোর হওয়ার নির্দেশ দেন তিনি।

জানা গেছে, তদন্ত কমিটি গতকাল রাত পর্যন্ত তাদের কার্যক্রম চালিয়েছে। সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, পুরো ঘটনাটির সঙ্গে কারা কিভাবে জড়িত, কত টাকার বিনিময়ে এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে এসব তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এর আগেও এ ধরনের ঘটনা ঘটানো হয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার সঙ্গে কোনো কারা কর্মকর্তা জড়িত হলে তাঁদের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সেসব বিষয়েও তদন্ত রিপোর্টে সুপারিশ করা হবে।

এদিকে অভিযোগ উঠেছে, অনিয়মের সুযোগ তৈরি করে দিয়ে জেল সুপার রত্না রায় অফিসে আসতেন খুব কম। বাসায় বা ঢাকায় সময় কাটাতেন তিনি। বিপদ হলে অধস্তনদের ওপর দায় চাপানোর কৌশল হিসেবেই এমনটা করতেন বলে জানা গেছে।

জানা গেছে, হলমার্কের তুষারসহ ধনাঢ্য বন্দিদের জন্য রত্না রায় ছিলেন উদার। তিনি ও অন্য কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে কারাগারে প্রতি মাসে তিন-চারবার নারীসঙ্গ পেতেন তুষার। থেমে ছিল না করোনা মহামারির কারণে বন্দিদের সাক্ষাতে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও।

মূলত ঘুষের টাকার ভাগ-বাটোয়ারাকে কেন্দ্র করে দ্বন্দ্বের জেরে একটি গোয়েন্দ সংস্থার মাধ্যমে কারা অধিদপ্তর ঘটনাটি জানতে পারে। তদন্ত শুরুর আগে গত ১৪ জানুয়ারি রত্না রায় কারা মহাপরিদর্শককে পাঠানো চিঠিতে উল্লেখ করেন, ‘হাজতি তুষার একজন সাধারণ বন্দি। তিনি শ্রেণিপ্রাপ্ত বন্দি না হওয়ায় তাঁর অফিসে সাক্ষাতের কোনো সুযোগ নেই। বন্দি তুষারের সঙ্গে ওই নারীর সাক্ষাতের জন্য জেলার নূর মোহাম্মদ এক লাখ, ডেপুটি জেলার গোলাম সাকলাইন ২৫ হাজার, সার্জেন্ট ইনস্ট্রাক্টর ও গেট সহকারী প্রধান কারারক্ষীরা পাঁচ হাজার টাকা করে ঘুষ নিয়েছেন।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা