kalerkantho

শনিবার । ১৪ ফাল্গুন ১৪২৭। ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১। ১৪ রজব ১৪৪২

আটকে রাখা যাচ্ছে না ধর্ষণ মামলার আসামিদের

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৫ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আটকে রাখা যাচ্ছে না ধর্ষণ মামলার আসামিদের

মৃত্যুদণ্ডের বিধান এবং অব্যাহত প্রতিবাদের পরও দেশে ক্রমাগত বাড়ছে ধর্ষণের হার। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে এর নেপথ্য কারণ কী? বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা? আর্থ-রাজনৈতিক-সামাজিক প্রভাব? আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদিচ্ছার অভাব? কারণগুলো খুঁজেছে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ)। সংগঠনটির পক্ষ থেকে ৩৪ জন ধর্ষণ মামলার আসামির বর্তমান অবস্থা তুলে ধরে গতকাল বৃহস্পতিবার অনলাইনে এক সংবাদ সম্মেলনে ধর্ষণ মামলা পরিচালনার প্রতিবন্ধকতা ও দীর্ঘসূত্রতার কারণগুলো তুলে ধরা হয়েছে।

সাতটি সহযোগী সংগঠন নারীপক্ষ, সিআরপি, প্রতিবন্ধী উন্নয়ন পরিষদ, পল্লীশ্রী, স্বাবলম্বী উন্নয়ন সমিতি, পিপলস অরিয়েন্টেড প্রগ্রাম এবং মহিদেব যুব কল্যাণ সমিতি এ কাজে সহায়তা করেছে। আর দেশের ১০টি জেলা ঢাকা, গাজীপুর, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর, জামালপুর ও জয়পুরহাট থেকে এসব তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।

২০১২ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত করা ২৫টি ধর্ষণ মামলায় আসামি ৩৪ জন। এর মধ্যে ২৭ জন আসামি জামিনে আছে। দুজন প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছে আর পাঁচজন পুনরায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছে। দেখা যাচ্ছে, গ্রেপ্তারের পর ২৪ ঘণ্টা থেকে ১৫ দিনের মধ্যে ধর্ষণ মামলার আসামিরা জামিন পাচ্ছে।

ধর্ষণের শিকার এই ২৫ জন নারী ও শিশুর মধ্যে প্রতিবন্ধী নারী তিনজন, পাঁচ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশু চারজন, ১১ থেকে ১৫ বছর বয়সী শিশু পাঁচজন, ১৬ থেকে ৩৫ বছর বয়সী কিশোরী ও নারী ১৬ জন। দুটি ধর্ষণের ঘটনায় দুজন প্রতিবন্ধী নারীর দুটি সন্তান  হয়েছে। কিন্তু তারা পিতৃত্বের পরিচয় পায়নি। ধর্ষণের ফলে জন্ম হওয়া শিশুর দায়িত্ব রাষ্ট্রের নেওয়ার কথা থাকলেও তা কার্যকর হচ্ছে না।

এই ২৫টি ধর্ষণ মামলার মধ্যে বেশির ভাগ বিচারাধীন ও সাক্ষ্যের পর্যায়ে রয়েছে। মামলা দায়েরের পর ছয় মাসের মধ্যে চার্জশিট হয়েছে ২২টি মামলায়। ২০১৪-১৫ সালে চার্জশিট হওয়া ৯টি মামলার রায় এখনো হয়নি। আর ২০১৬-১৭ সালে চার্জশিট হওয়া ১২টি মামলার রায় এখনো হয়নি। এই দুই ক্ষেত্রে কোনো অগ্রগতিও দেখা যাচ্ছে না। আর তিনটি মামলায় এখনো অভিযোগপত্রই দাখিল করা হয়নি।

২৫টি মামলার মধ্যে দুটি মামলা নিষ্ক্রিয় অবস্থায় আছে। চারটি মামলার নথি পাওয়া যাচ্ছে না। যে ২০টি মামলার চার্জশিট হয়েছে, সেগুলোর ছয় থেকে ২৩ বার শুনানি হয়েছে। একটি মামলার এখনো মেডিকো-লিগ্যাল টেস্ট হয়নি। দেখা গেছে, বেশির ভাগ মামলার সাক্ষী হাজির না হওয়ায় এসব মামলার তারিখ বারবার পিছিয়ে যাচ্ছে। অভিভাবকরা হতাশ হয়ে আর কোর্টে যেতে চাইছেন না। দরিদ্র অভিভাবকরা আর্থিক অসুবিধার কারণে মামলা চালাতে রাজি নন।

এসব মামলার বিচার দেরি হওয়ার কারণ অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে বলা আছে, মামলা বিচারের জন্য নথি পাওয়ার তারিখ থেকে ১৮০ দিনের মধ্যে কাজ শেষ করা, মামলার শুনানি শুরু হলে তা শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতি কর্মদিবসে একটানা পরিচালনার নির্দেশনা থাকলেও তা অনুসরণ করা হচ্ছে না।

তদন্তে দীর্ঘসূত্রতার কারণে নির্ধারিত সময়সীমা ৯০ দিনের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট দাখিল করা হচ্ছে না। এ ছাড়া পাবলিক প্রসিকিউটর ভিকটিম ও সাক্ষীকে মামলার তারিখে আদালতে হাজির করানোর ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেন না। প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়, থানা পুলিশ এবং বিচার প্রক্রিয়ায় ধর্ষণের শিকার শিশু ও নারীকেই নানাভাবে দোষারোপ করা হয়।

আসামিপক্ষের আইনজীবীরা ধর্ষণের শিকার শিশু ও নারীদের প্রতি ইচ্ছাকৃত খারাপ আচরণ করেন। এমনকি আইনে ধর্ষণের অপরাধ আপস অযোগ্য হলেও পারিপার্শ্বিক চাপে আপসরফার ক্ষেত্রে আদালত অনেক সময় চুপ থাকেন।

ধর্ষণের শিকার নারীর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে কয়েকটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ধর্ষণসংক্রান্ত আইন সংস্কার করা, সাক্ষী সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করা, নির্ধারিত সময়ে তদন্ত ও বিচার শেষ করা, আইনের বিধানগুলো সঠিকভাবে প্রতিপালিত হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে শক্তিশালী মনিটর করা, দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা, ধর্ষণের মামলা আপস বা আপসের চেষ্টা করাকে কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা, মেডিক্যাল রিপোর্টে কোনো রকম ত্রুটি শাস্তিযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করা, ভিকটিমের আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে পুলিশ, বিচারক, আইনজীবী, চিকিৎসক, কোর্ট স্টাফ ও ধর্ষণ মামলার বিচারসংশ্লিষ্ট সব স্টেকহোল্ডারকে জেন্ডার সমতা, হাইকোর্টের নির্দেশনা, সংস্কার করা আইন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রটোকল সম্পর্কে নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা