kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ মাঘ ১৪২৭। ২৮ জানুয়ারি ২০২১। ১৪ জমাদিউস সানি ১৪৪২

স্বৈরাচার পতন দিবস আজ

টিটোর পরিবারে ৩৩ বছরের কান্না

আবদুল্লাহ আল মামুন   

৬ ডিসেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



টিটোর পরিবারে ৩৩ বছরের কান্না

ভোরের আলো তখন মাত্রই উঁকি দিচ্ছিল। এক যুবক তাঁর চার রাজনৈতিক সহকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে ট্রেন থেকে নামলেন রাজধানীর তেজগাঁও রেলস্টেশনে। তাঁদের অন্তরে গণতন্ত্রের জন্য স্বৈরাচারবিরোধী মিছিলে যোগ দেওয়ার অভিপ্রায়। ঐতিহাসিক পল্টনে স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের পতন আন্দোলনের পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচিতে আর সবার সঙ্গে সেই যুবকটিও যোগ দিয়েছিলেন। তবে তিনি আর বাড়ি ফিরে যেতে পারেননি। মুক্তাঙ্গনে পড়ে ছিল কোমরে লাল জ্যাকেট বাঁধা তাঁর রক্তাক্ত লাশ। সেই লাশই ছিল কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর থেকে আসা সৈয়দ আমিনুল হুদা টিটোর।

১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর ঢাকার জিরো পয়েন্টে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান যুবলীগকর্মী নূর হোসেন। কাছেই প্রাণ হারান যুবলীগের আরেক কর্মী নুরুল হুদা বাবুল এবং মুক্তাঙ্গনে সিপিবির সৈয়দ আমিনুল হুদা টিটো। টিটোর লাশ পুলিশ নিয়ে যায়। ওই সময় কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা তাঁদের এই কর্মীর লাশ ফিরে পাওয়ার জন্য নানাভাবে চেষ্টা করেন; কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা আর পাওয়া যায়নি। নূর হোসেন, নুরুল হুদা বাবুল ও সৈয়দ আমিনুল হুদা টিটোর আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলন আরো তীব্র হয়। একপর্যায়ে ১৯৯০ সালের আজকের এই দিনে পতন ঘটে স্বৈরশাসক এইচ এম এরশাদের।

সেই দিনের ঘটনা স্মরণ করে কিশোরগঞ্জ জেলা কমিউনিস্ট পার্টির তৎকালীন সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট শাহ আজিজুল হক বলেন, ‘আওয়ামী লীগ নেতা সাইদ হোসেনের কাছ থেকে জেনে আমি টিটোর শহীদ হওয়ার বিষয়টি তাঁর বাবাকে জানাই।’

টিটোর ওই দিনের সার্বক্ষণিক সঙ্গী তখনকার কমিউনিস্ট পার্টি নিকলী শাখার সভাপতি রমেশ চন্দ্র বর্মন বলেন, “আমরা ঢাকার কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে জেলা কমিটির নির্দেশনা পাই ৮ নভেম্বর। পরের দিন টিটোসহ আমরা বাজিতপুরের সরারচর রেলস্টেশন থেকে ট্রেনে উঠি। স্টেশনের লোকজন অবস্থা খারাপ জানিয়ে আমাদের ঢাকায় যেতে বারণ করে। কিন্তু টিটোর কথা, ‘দাদা, আমাদের ঢাকা যেতেই হবে।’ পরে ভৈরব স্টেশনে এসে রাতে চট্টগ্রাম থেকে আসা একটি ট্রেনে আমরা পাঁচজন উঠে পড়ি। সারা রাত কাটিয়ে ভোরে তেজগাঁও রেলস্টেশনে নামি। কমলাপুর স্টেশনে নামতে পারতাম; কিন্তু সেখানে চেকিং হতে পারে। আসলে আমাদের টিকিট ছিল না।”

তিনি জানান, তেজগাঁও রেলস্টেশন থেকে তাঁরা সিপিবি অফিসে পৌঁছে চিড়া-মুড়ি খান। পরে কর্মসূচিতে যোগ দেন। এর আগে দুই দফা পুলিশি হামলার মুখে পড়েন তাঁরা। এ জন্য হাউস বিল্ডিংয়ের গলি থেকে একটি লাঠি কুড়িয়ে হাতে নেন টিটো। লাল জ্যাকেট এবং পাশে পড়ে থাকা ওই লাঠি দেখে দূর থেকে তাঁরা টিটোর লাশ শনাক্ত করেন। অনেক চেষ্টা করলেও পুলিশি বাধার কারণে তাঁরা লাশের কাছে পৌঁছতে পারেননি।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনে গঠিত সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের অন্যতম নেতা পরবর্তী সময়ে ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি হাসান তারিক চৌধুরী বলেন, সৈয়দ আমিনুল হুদা টিটোর আত্মত্যাগের বিষয়ে অনেকেই জানে না। শুরু থেকেই তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি সর্বত্রই উপেক্ষিত হয়ে আসছে।

শহীদ সৈয়দ আমিনুল হুদা টিটোর ছোট ভাই সৈয়দ মনিরুল হুদা বলেন, ‘প্রতিবছর ১০ নভেম্বর আমরা স্থানীয়ভাবে স্মরণসভার আয়োজন করি। কিন্তু আমি প্রত্যাশা করি, যাঁরা টিটোর মতো উপেক্ষিত তাঁদের সম্পর্কে নতুন প্রজন্মকে জানানো হোক।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা