kalerkantho

রবিবার। ৩ মাঘ ১৪২৭। ১৭ জানুয়ারি ২০২১। ৩ জমাদিউস সানি ১৪৪২

রাতের কারওয়ান বাজারে সক্রিয় অপরাধীচক্র

রেজোয়ান বিশ্বাস   

১ ডিসেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



রাতের কারওয়ান বাজারে সক্রিয় অপরাধীচক্র

‘ধর ধর, আমার ব্যাগ নিয়া গেল...!’ এমন চিৎকারে ফিরে তাকাতেই চোখে পড়ল কয়েকজন লোক দৌড়াচ্ছে এক কিশোরের পেছনে। রাত তখন সাড়ে ১২টা। গত বুধবার পেট্রোবাংলা লাগোয়া গলিতে এমন দৃশ্য চোখে পড়ল। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, ছিনতাইকারী কিশোরটি এক পথচারীর হাত থেকে মানিব্যাগ নিয়ে দৌড়ে পালিয়ে গেছে।

রাত নামলে পাল্টে যায় কারওয়ান বাজার এলাকার দৃশ্যপট। অনেক সরকারি-বেসরকারি অফিস রয়েছে এই পাড়ায়। আবার মাছ ও শাকসবজির বৃহত্তম আড়তও রয়েছে এই কারওয়ান  বাজারে। দিনে অফিসের লোকজনের উপস্থিতিতে যেমন সরব কারওয়ান বাজার, রাতে আড়তে মাল ওঠানো-নামানো এবং পাইকারদের কাছে বিক্রি করতে তারও বেশি সরব থাকে কারওয়ান বাজার।   

রাত ১টার দিকে দেখা গেল সারি সারি  সবজিবোঝাই ট্রাক ঢুকছে কারওয়ান বাজারে। আর পাশের ফুটপাত থেকে পিঠা বিক্রেতা সিকান্দার মিয়া বলে উঠলেন ‘চোর-ছিনতাইকারীতে ভইরা গ্যাছে কারওয়ান বাজার।’ সিকান্দার মিয়ার বয়স আনুমানিক ৬০ বছর। প্রায় ৩০ বছর ধরে কারওয়ান বাজারের ফুটপাতে তিনি চা বিক্রি করছেন। কথায় কথায় তিনি জানালেন, প্রতিদিনই কারওয়ান বাজারে চুরি-ছিনতাই হচ্ছে। ছিনতাইকারীরা মানুষের হাত থেকে ব্যাগ, টাকা নিয়ে পালিয়ে যায়। কিন্তু এদের নিয়ন্ত্রণ করার কেউ নেই।

পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সোহেল নামে একজন যোগ করেন, কারওয়ান বাজারে যত সবজি বিক্রেতা আছে, তার চেয়ে বেশি চোর, ছিনতাইকারী ও মাদক কারবারি। ছদ্মবেশে এরা কারওয়ান বাজারের ওলিগলি, মূল সড়কে মানুষের ভিড়ে ঘুরে বেড়ায়।

সেখান থেকে একটু সামনে এগোতে দেখা মিলল চার কিশোরের। ভীষণ ব্যস্ত তারা ট্রাক থেকে ভ্যানে মাল নামানোর প্রতিযোগিতায়। এদের কারো মুখে মাস্ক নেই। কেন মাস্ক নেই জানতে চাইলে মাসুদ মিয়া নামে এক কিশোরের জবাব, ‘মাস্ক প্যান্টের পকেটে রাহি। তয় মুখে দেই না, কাজ করার সময় মাস্ক মুখে দিলে দম বন্ধ হয়া আসে।’ অন্য তিন কিশোর তার কথায় সায় দিয়ে মাথা নাড়ায়। ওই সময় চারপাশে তাকিয়ে দেখা যায়, কারওয়ান বাজারে হাজার হাজার ব্যস্ত মানুষ। কিন্তু কারো মুখে মাস্ক নেই।

রাত যত বাড়তে থাকে কারওয়ান বাজারের ব্যস্ততাও যেন আরো বাড়ে। শত শত মালবাহী ট্রাক, ভ্যানগাড়ি আর কয়েক হাজার শ্রমিকের হাঁকডাকে প্রাণচঞ্চল পুরো এলাকা।

আড়তদারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতি রাত নির্ঘুম কাটে তাঁদের। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ব্যবসায়ীরা কাঁচামাল এনে রাখেন তাঁদের আড়তে। পাইকারি ব্যবসায়ীরা সেসব পণ্য কিনে নেন। ১০ শতাংশ কমিশন পান তাঁরা। একজন আড়তদার প্রতি রাতে তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা কমিশন পান।

সালমান শেখ নামের এক শ্রমিক জানান, প্রতি রাতে মাল টেনে তাঁর আয় ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা। রাতের কারওয়ান বাজারে গানবাজনা আর সর্বরোগের ওষুধ নিয়ে বসে মজমা। নানা রকম আশ্বাস আর কথিত প্রমাণ উপস্থাপন করে চলে হকারদের প্রচারণা। রেললাইন এলাকায় গেলে চোখে পড়ে ভাসমান মাদক বিক্রেতাদের আনাগোনা।

কারওয়ান বাজারকেন্দ্রিক অপরাধীদের বিষয়ে জানতে চাইলে তেজগাঁও থানার ওসি সালাহ উদ্দিন মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখনো কিছু মহিলা কারওয়ান বাজার রেললাইন কেন্দ্রিক মাদক করবার করছে। প্রতি রাতেই এদের কাউকে না কাউকে ধরা হয়। মামলা হয়। কারাগারে পাঠানো হয়। জামিন নিয়ে আবার ফিরে এসে একই কাজ করছে। আর কারওয়ান বাজার এলাকায় চুরি-ছিনতাই ঘটনার সঙ্গে মাদকসেবী ‘ড্যান্ডি’ কিশোর চক্র জড়িত। লোকজন এদের ধরে মাঝেমধ্যে আমাদের কাছে দেয়। পরে এদের কিশোর সংশোধনাগার অথবা অভিভাবকদের জিম্মায় দেওয়া হয়। সব ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে।’  

পরদিন বৃহস্প্রতিবার রাতে সরেজমিনে ফের কারওয়ান বাজার ঘুরে একই ধরনের চিত্র পাওয়া যায়। রাত ১২টার দিকে সবজিবোঝাই ট্রাক নিয়ে কারওয়ান বাজারে আসা চালক সিদ্দিকের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনি মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলতে শুরু করেন, ‘আমাদের কষ্টের কথা কে শোনে। পথে পথে এখনো চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি। ঈশ্বরদী থেকে সবজি বোঝাই করে ট্রাক নিয়ে ঢাকায় আসতে কয়েক জায়গায় চাঁদা দিতে হয়। এর মধ্যে গাবতলিতে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়তে হয়। গাবতলিতে আছে লাঠি বাহিনী। তাদের ট্রাক প্রতি এক শ থেকে তিন শ টাকা চাঁদা দিতে হয়। এদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে মারধর করে। আরো বেশি চাঁদা দাবি করে।’

প্রতিদিন রাত ৯টার পর এফডিসির রেলগেট থেকে পশ্চিমের সার্কফোয়ারা, উত্তরে তেজতুরিবাজার স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক থেকে জনতা টাওয়ার হয়ে রেললাইন পর্যন্ত নতুন রূপ নেয় কারওয়ান বাজার। মধ্যরাতে বেচাকেনা ছড়িয়ে পড়ে কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউয়ের মূল সড়কেও। আর বিজিএমইএ ভবনের বিপরীতে মাছের আড়তের কেনাবেচা চলে আসে সোনরগাঁও ও এফডিসি রোড পর্যন্ত।

মন্তব্য