kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ১ ডিসেম্বর ২০২০। ১৫ রবিউস সানি ১৪৪২

বিসর্জনে ছিল না শোভাযাত্রা

করোনামুক্তির প্রার্থনায় মা দুর্গাকে বিদায়

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৭ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



করোনামুক্তির প্রার্থনায় মা দুর্গাকে বিদায়

বিসর্জন : বিজয়া দশমীর আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রতিমা বিসর্জন দিতে মানুষের ঢল। গতকাল পতেঙ্গা সৈকত থেকে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

শারদীয় দুর্গোৎসবে বিজয়া দশমীতে ছিল না সেই চিরচেনা আনন্দ উৎসব। কোনো শোভাযাত্রাও চোখে পড়েনি। ঢাকের বাদ্য ও অশ্রুভেজা ভালোবাসায় দুর্গতিনাশিনী মা দুর্গাকে বিদায় জানিয়েছে ভক্তরা। বিশ্ববাসীর করোনামুক্তিই ছিল এবারের পূজায় ভক্তদের প্রধান প্রার্থনা।

গতকাল সোমবার সকালে বিজয়া দশমীর ‘বিহিত পূজায়’ ষোড়শ প্রচার পূজার পাশাপাশি দেবী প্রতিমার হাতে জরা, পান ও শাপলার ডালা দিয়ে আরাধনা করা হয়। সকাল ৯টা ৫৭ মিনিট থেকে দশমী বিহিত পূজার লগ্ন শুরু হয়। বিজয়া দশমীর পূজার আনুষ্ঠানিকতা শেষে সিঁদুর খেলায় মত্ত হয় ভক্তরা। এরপর দুপুর দেড়টায় বুড়িগঙ্গার ওয়াইজঘাটের বীণা স্মৃতি স্নানঘাটে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে রাজধানীতে দেবীকে বিদায় জানানোর আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। প্রতিমা বিসর্জন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সব ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। পুলিশের পাশাপাশি নৌ পুলিশ ও র‌্যাব সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করছেন।

পূর্বনির্দেশনা অনুযায়ী করোনা মহামারির কারণে বিসর্জনে শোভাযাত্রার সমারোহ ছিল না। দুপুরের পরপরই বিভিন্ন এলাকার মণ্ডপ থেকে ট্রাকে করে প্রতিমা নিয়ে ঘাটের পথে রওনা হয় ভক্তরা। শঙ্খ আর উলুধ্বনির সঙ্গে চলে খোল-করতাল-ঢাকঢোলের সনাতনি বাদ্য। কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ঢাকার ওয়াইজঘাট ছাড়াও বসিলায় তুরাগে ও সবুজবাগ এলাকার প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। প্রতিমা ঘাটে নেওয়ার পর ভক্তরা শেষবারের মতো ধূপ-ধুনো নিয়ে আরতি করেন। শেষে পুরোহিতের মন্ত্রপাঠের মধ্য দিয়ে দেবীকে নৌকায় তুলে বিসর্জন দেওয়া হয়। বিসর্জন শেষে মন্দিরে শান্তির জল নিয়ে আসা হয় ও সন্ধ্যায় মণ্ডপে করা হয় আশীর্বাদ।

গত ২২ অক্টোবর মহাষষ্ঠী তিথিতে বেলতলায় ‘আনন্দময়ী’র নিদ্রাভঙ্গের বন্দনায় যে উৎসবের সূচনা হয়েছিল, দশমী তিথিতে প্রতিমা বিসর্জনে এর সাঙ্গ হলো। ‘বাবার বাড়ি বেড়ানো’ শেষে দেবী দুর্গা এক বছরের জন্য ফিরে গেলেন ‘কৈলাসের শ্বশুরালয়ে’, সমাপ্তি হলো বাঙালি হিন্দুর সবচেয়ে বড় পার্বণ শারদীয় দুর্গোৎসবের। দেবী এসেছিলেন দোলায় চড়ে, ফিরে গেলেন (গমন) হাতিতে চড়ে। হাতিতে চড়ে গমনে দুর্যোগ কেটে যাবে, শস্য ফলন ভালো হবে। সুখ-সমৃদ্ধিতে পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে পৃথিবী। এবার দুর্গতিনাশিনী মা দুর্গার কাছে ভক্তদের প্রার্থনাও ছিল তা-ই। করোনার মতো ভয়াবহ দুর্যোগ থেকে মুক্তি।

পুরোহিত রাজীব গাঙ্গুলি কালের কণ্ঠকে জানান, মায়ের পূজায় প্রতিদিনই করোনাভাইরাসের মতো ভয়াবহ দুর্যোগ থেকে মুক্তির জন্য প্রার্থনা করা হয়েছে। এ ছাড়া ২৩ অক্টোবর সপ্তমীর দিনে দুপুর ১২টা ১ মিনিটে করোনামুক্তির জন্য সারা দেশে মণ্ডপে মণ্ডপে বিশেষ প্রার্থনাও করা হয়। ভক্তদের এই মনোবাসনা মা দ্রুতই পূরণ করবেন বলে তিনি আশাবাদী।

করোনামুক্তির আশা প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি মিলন কান্তি দত্ত। তিনি বলেন, ‘করোনাভাইরাস মহামারির কারণে এবারের পূজা শাস্ত্রীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়। বিজয়া দশমীতে কোনো শোভাযাত্রা হবে না, তা আগেই জানানো হয়। তাই সবাই যাঁর যাঁর মতো করে স্বাস্থ্যবিধি মেনে প্রতিমা বিসর্জন দিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি নদীর ঘাটে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর সদস্যরা কাজ করেছেন।’ শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে পূজা উদযাপনে সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করায় সব রাজনৈতিক দল, সরকার ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন তিনি।

চণ্ডীপাঠ, বোধন এবং দেবীর অধিবাসের মধ্য দিয়ে গত ২২ অক্টোবর স্বাস্থ্যবিধি মেনে হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা শুরু হয়। করোনা মহামারির কারণে সংক্রমণ এড়াতে এ বছর ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান সংক্ষিপ্ত করা হয়। উৎসবসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো পরিহার করে সাত্ত্বিক পূজায় সীমাবদ্ধ রাখতে হবে বিধায় এবারের দুর্গোৎসবকে শুধু ‘দুর্গাপূজা’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। এ জন্য বেশ কিছু বিধি-নিষেধও দেওয়া হয়। মণ্ডপে দর্শনার্থীদের উপস্থিতি সীমিত করা ও সন্ধ্যায় আরতির পরই পূজামণ্ডপ বন্ধ করে দেওয়া হয়। পূজা উপলক্ষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ধুনচি নাচের প্রতিযোগিতা হয়নি। স্বাস্থ্যবিধি যাতে ভঙ্গ না হয়, সেদিকে খেয়াল রেখেই প্রসাদ বিতরণ ও বিজয়া দশমীর শোভাযাত্রা নিষিদ্ধ করা হয়। পূজার সময় বেশির ভাগ ভক্ত অঞ্জলি নিয়েছেন ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে। এ বছর সারা দেশে ৩০ হাজার ২২৩টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা হয়েছে। গত বছর সারা দেশে দুর্গাপূজার মণ্ডপের সংখ্যা ছিল ৩১ হাজার ৩৯৮টি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা