kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ১ ডিসেম্বর ২০২০। ১৫ রবিউস সানি ১৪৪২

ডিএসসিসির বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নীতিমালা নেই

ঠিকাদারদের খবরদারি বাসিন্দাদের অসন্তোষ

শাখাওয়াত হোসাইন   

২৬ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ঠিকাদারদের খবরদারি বাসিন্দাদের অসন্তোষ

বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) কোনো নীতিমালা নেই। বর্জ্য সংগ্রহের জন্য নিয়োগ করা ঠিকাদারদের মৌখিকভাবে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ আদায়ের জন্য বলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দক্ষিণ সিটির অনেক এলাকায় সেটা মানা হচ্ছে না। ঠিকাদাররা ঠিক করে দিচ্ছেন কিভাবে বর্জ্য সংগ্রহ করা হবে এবং কত টাকা তাঁদের দিতে হবে। এ ব্যাপারে সিটি করপোরেশনের কোনো নজরদারিও নেই।

বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন যে ঠিকাদাররা অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছেন। নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহও করা হয় না। ব্যবসায়ী ও নাগরিকদের এক ধরনের ‘জিম্মি’ করে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগও উঠেছে। মালিকের নিজ উদ্যোগে বাসা-বাড়ি ও দোকানের বর্জ্য ডাস্টবিনে ফেলতে না দেওয়ারও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব বিষয় নিয়ে নগরবাসী ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

জানা গেছে, বাসা বা ফ্ল্যাটপ্রতি সিটি করপোরেশন নির্ধারিত বর্জ্যের ফি ছিল ৩০ টাকা। সে ফি দিতে হতো প্রাথমিক বর্জ্য সংগ্রহকারীদের। এ অর্থ থেকে কোনো রাজস্ব পেত না সিটি করপোরেশন। প্রাথমিক বর্জ্য সংগ্রহকারীদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ ছিল। সেই বর্জ্য সংগ্রহকারীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে এবং রাজস্ব আয় বাড়াতে প্রতি ওয়ার্ডে ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয়। ডিএসসিসির মোট ৭৫টি ওয়ার্ডেই সেই ঠিকাদার নিয়োগের সিদ্ধান্ত থাকলেও এ পর্যন্ত ৬৯টি ওয়ার্ডে ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়েছে। বাকি ছয়টি ওয়ার্ডে বাসা-বাড়ি কম থাকায় আগ্রহী ঠিকাদার পায়নি সংস্থাটি। প্রতিবছর ১২ লাখ টাকা দিয়ে বর্জ্য আদায়ের কাজ নিচ্ছেন ঠিকাদাররা। এ হিসাবে ৬৯টি ওয়ার্ড থেকে দক্ষিণ সিটি প্রতিবছর রাজস্ব পাচ্ছে আট কোটি ২৮ লাখ টাকা।

দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তথ্য মতে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত কোনো নীতিমালা এখনো করা হয়নি। তবে বাসাপ্রতি ১০০ টাকা আদায়ের জন্য মৌখিকভাবে সব ঠিকাদারকে বলা হয়েছে। আর রেস্টুরেন্ট ও দোকানের বর্জ্যের অর্থের পরিমাণ এখনো ঠিক করা হয়নি।

ডিএসসিসির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, বেশ কিছু অভিযোগ তাঁরা পেয়েছেন। সিটি করপোরেশন ১০০ টাকার বেশি আদায় না করার ব্যাপারে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে।

সিটি করপোরেশনের লাইসেন্স পাওয়ার পর থেকে ঠিকাদাররা অনেকটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন বলে অভিযোগ করেছেন বাসিন্দারা।

বাসিন্দাদের অভিযোগ, বাসা-বাড়ি থেকে বর্জ্য সংগ্রহের অর্থ হঠাৎ করে বাড়িয়ে দিয়েছেন ঠিকাদাররা। যেসব এলাকায় ৫০ টাকা নেওয়া হতো, এখন সেখানে ১০০ টাকা দিতে হয়। ঠিকাদারের লোকের কাছে বাধ্যতামূলকভাবে বর্জ্য দিতে হচ্ছে। বাড়ির মালিক বা ভাড়াটিয়া নিজে ডাস্টবিনে বর্জ্য ফেলে দিয়ে এলেও ঠিকাদারের নির্ধারিত অর্থ দিতে হয়। বাসাবো এলাকায় এর আগে ৫০ টাকা ফি নেওয়া হতো। কিন্তু এখন আদায় করা হচ্ছে বাসাপ্রতি ১০০ টাকা করে। শান্তিনগর এলাকায় বাসাপ্রতি আদায় করা হচ্ছে ২০০ টাকা। করোনাভাইরাস মহামারি শুরুর আগে বর্জ্য সংগ্রহকারীরা ফ্ল্যাটের দরজার সামনে থেকে বর্জ্য নিয়ে আসতেন। কিন্তু এখন নিজস্ব উদ্যোগে বর্জ্য নিচে নিয়ে দিতে হয়। নয়তো বর্জ্য নিতে চান না তাঁরা। অনেক এলাকায় এমনটি চলছে। সোবহানবাগ এলাকায় সিটি করপোরেশনের ডাস্টবিনে বর্জ্য ফেললে ‘জরিমানা’ আদায় করার হুমকি দিয়ে ব্যানার টাঙিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। অতিরিক্ত অর্থ নিলেও ১০০ টাকার রসিদ দেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে মানিকনগর এলাকায়।

পূর্ব মানিকনগরের ৯৬/২ হোল্ডিয়ের বাসিন্দা শিহাব আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আগে ১০০ টাকা দিতাম বর্জ্যের জন্য। কিন্তু এখন দিতে হয় ১২০ টাকা। নয়তো বর্জ্য বাসার নিচে দিয়ে আসতে হয়। ১২০ টাকা দিলেও রসিদ দেয় ১০০ টাকার।’

বাসার ভেতরে প্রবেশ করে ফ্ল্যাটের দরজার মুখ থেকে বর্জ্য আনার বিষয়ে সিটি করপোরেশন উৎসাহিত করে না। ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা।

এদিকে আগে হোটেল ও রেস্টুরেন্ট মালিকরা নিজেদের কর্মী দিয়ে বর্জ্য ডাস্টবিনে ফেলতেন। ঠিকাদার নিয়োগের পর রেস্টুরেন্টপ্রতি মাসে তিন হাজার টাকা আদায়ের চেষ্টা হয়েছে। পরে মাসে দুই হাজার টাকায় মিটমাট করেছে রেস্টুরেন্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। একই ধরনের সমস্যায় পড়েছেন বিভিন্ন শপিং মলের দোকান মালিকরা। নিজেদের উদ্যোগে বর্জ্য ডাস্টবিনে ফেলতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। বর্জ্যের পরিমাণ যা-ই হোক, এলাকাভেদে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা ধার্য করেছিলেন ঠিকাদাররা। পরে মেয়রের সঙ্গে দোকান মালিক সমিতির নেতাদের বৈঠকে দোকানপ্রতি ৩০ টাকা ঠিকাদার দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

বাংলাদেশ রেস্টুরেন্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি খন্দকার রুহুল আমিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা নিজেরা সিটি করপোরেশনের ডাস্টবিনে বর্জ্য ফেলতাম। কিন্তু এখন ঠিকাদাররা তা করতে দেয় না। তাদের মাধ্যমে বর্জ্য দিতে হয়।’

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে দেড় লাখের মতো দোকান রয়েছে। শুরুর দিকে দোকানপ্রতি ৩০০ টাকার বেশি ধার্য করেছিলেন ঠিকাদাররা। কোনো কোনো এলাকায় আরো বেশি ধার্য করা হয়েছিল।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা