kalerkantho

শুক্রবার । ৭ কার্তিক ১৪২৭। ২৩ অক্টোবর ২০২০। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

কন্যাশিশু দিবস উপলক্ষে পিএসটিসি-কালের কণ্ঠ ওয়েবিনার

সমতাবিধানের শিক্ষা শুরু হোক পরিবার থেকে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সমতাবিধানের শিক্ষা শুরু হোক পরিবার থেকে

বাংলাদেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে বড় অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে বাল্যবিয়ে। মেয়েদের বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার অন্যতম কারণও এই বাল্যবিয়ে। অভিভাবকদের চোখে ছেলেরা এখনো বুড়ো বয়সের অবলম্বন। আর মেয়েদের বিবেচনা করা হয় পরিবারের বোঝা হিসেবে। এই ধ্যান-ধারণায় কিছুটা পরিবর্তন এলেও সমতা নিশ্চিত হয়নি সমাজে। এই মানসিকতা পরিবর্তনের জন্য নারীদের শিক্ষা, কারিগরি জ্ঞান ও প্রজ্ঞাবান হিসেবে গড়ে তোলা জরুরি। পরিবারের পুরুষদের মানসিকতা পরিবর্তনেও ভিত্তি তৈরি করে দিতে হবে।

পপুলেশন সার্ভিসেস অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার (পিএসটিসি) ও কালের কণ্ঠ আয়োজিত ওয়েবিনারে বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় এমন অভিমত উঠে এসেছে। ৩০ সেপ্টেম্বর (আজ বুধবার) জাতীয় কন্যাশিশু দিবস এবং ১১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস উপলক্ষে ‘সমতা বিধানের লক্ষ্যে চলো আওয়াজ তুলি’ শীর্ষক এই ওয়েবিনারের আয়োজন করা হয় গতকাল মঙ্গলবার। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও), আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা, সরকারি কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা এতে অংশ নেন। আয়োজনে সহযোগিতা দিয়েছে হ্যালো আই অ্যাম (হিয়া) প্রগ্রাম।

ওয়েবিনারে স্বাগত বক্তব্যে কালের কণ্ঠ সম্পাদক ও ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপের পরিচালক ইমদাদুল হক মিলন বলেন, ‘বহুকাল থেকে দেখে আসছি যে নারী ও পুরুষের মধ্যে বৈষম্য। কন্যাশিশু ও ছেলেশিশুর মধ্যে যে বৈষম্য এগুলো বহু বহুকালের। পৃথিবী এগিয়ে যাচ্ছে, দেশ ও সমাজ এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই ক্ষেত্রটিতে কি আমরা প্রকৃতপক্ষে এগোতে পেরেছি? নারী ও পুরুষের মধ্যে কোনো বৈষম্য আমরা আর দেখতে চাই না।’

পিএসটিসির নির্বাহী পরিচালক ড. নূর মোহাম্মদ বলেন, ‘২০১৭ সালের এক জরিপে দেখা যায়, প্রাইমারি থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত ১৭ শতাংশ এবং মাধ্যমিক থেকে ৪৬ শতাংশ কন্যাশিশু ঝরে পড়ছে। কন্যাশিশুরা এমনিতেই পিছিয়ে আছে। করোনা আরো পিছিয়ে দিয়েছে। কয়েকটি গবেষণায় শিশু নির্যাতন, শিশু বিয়ের মতো বিষয়গুলো উঠে এসেছে। কন্যাশিশুদের সহিংসতামুক্ত একটি পরিবেশ দিতে হবে।’

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আখতারুজ জামান খান কবির বলেন, ‘নারীদের উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নের জন্য বিভিন্ন ট্রেডে ৬২টির বেশি প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকি আমরা। এসব প্রশিক্ষণে নারীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে। ন্যাশনাল সার্ভিস প্রগ্রাম দুই বছরের জন্য প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। যেসব মেয়ে এ সার্ভিসে ছিল, তাদের ৮০ শতাংশই এখন ভালো অবস্থানে।’

মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পারভীন আকতার বলেন, ‘বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ নিয়ে আমাদের অনেক কাজ হচ্ছে। জেলা অফিসগুলো সব সময় মনিটর করছে। বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ করার জন্য আমাদের চলমান কিছু প্রজেক্টও রয়েছে।’

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (প্রশিক্ষণ) মাজহারুল হক মাসুদ বলেন, ‘মাধ্যমিকে এখনো ৪০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে। আবার বেশির ভাগ অভিভাবক ও ছাত্রী সচেতন নয়। মেয়েরা বাল্যবিয়ের শিকার হলে ড্রপ আউট হয়। তবু মেধার দিক দিয়ে ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা এগিয়ে যাচ্ছে।’

নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের সিনিয়র পলিসি অ্যাডভাইজর মাশফিকা জামান সাটিয়ার বলেন, “আমরা প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকার ও জেন্ডার নিয়ে কাজ করি। পিএসটিসির সহযোগিতায় পরিচালিত ‘বালিকা’ প্রকল্পে দেখেছি, যেসব নারী শিক্ষা ও অর্থনৈতিক কাজে যুক্ত, তাদের পক্ষে বাল্যবিয়ে ঠেকানো সহজ।”

ইউনিসেফ বাংলাদেশের আরলি চাইল্ডহুড স্পেশালিস্ট (এডুকেশন সেকশন) মোহাম্মদ মহসিন বলেন, ‘আজকের বাস্তবতা হচ্ছে বিশ্বে প্রতি চারজনে একজন মেয়েশিশু স্কুলে যায় না, কোনো কাজে নেই, কোনো প্রশিক্ষণেও নেই। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, কভিড-১৯ পরিস্থিতির মধ্যেও এক-তৃতীয়াংশ কন্যাশিশু ও নারী যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। দক্ষতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণে ছেলেদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। কারিগরি শিক্ষার ক্ষেত্রেও সুযোগ সীমিত। এসব দিকে নজর দিতে হবে।’

প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের হেড অব ইনফ্লুয়েন্সিং কাশফিয়া ফিরোজ বলেন, “আগামী ১০ বছরের কর্মপরিকল্পনায় প্ল্যান ‘ফেয়ার অব ভায়োলেন্স’ নামে একটি ক্যাম্পেইন পরিচালনা করছে। যেসব নারী হয়রানির শিকার হয়নি, তারাও সহিংসতার ঊর্ধ্বে নয়। সেই জায়গা থেকেই আমরা নতুন কৌশলে যাচ্ছি।”

আরএইচ স্টেপের নির্বাহী পরিচালক কাজী সুরাইয়া সুলতানা বলেন, ‘পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ হচ্ছে মেয়েশিশু। মেয়েশিশুর মধ্য দিয়েই সারা পৃথিবীতে মানবজাতির বিস্তার হয়। নারী-পুরুষের ভেদাভেদ বাদ দিতে হবে।’ হ্যালো আই অ্যামের (হিয়া) টিম লিডার ডা. সুস্মিতা আহমেদ বলেন, ‘বাল্যবিয়ে ও কিশোরীদের অধিকার লঙ্ঘনই এখন সমাজের বড় সমস্যা। বাল্যবিয়ের ক্ষতিকর প্রভাব দেশের অর্থনীতিতে এবং মাতৃ ও শিশু মৃত্যুর হারে পড়ছে। অভিভাবক, স্থানীয় নেতা ও প্রশাসকদের যুক্ত করে বাল্যবিয়ে বন্ধে কাজ করছি আমরা।’

ডা. সুস্মিতা জানান, দেশের ছয়টি উপজেলায় ‘হ্যালো আই অ্যাম’ বা হিয়া নামে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে একটি উদ্যোগ রয়েছে। সমাজ ও সংস্কৃতির নামে বাল্যবিয়ের ধারা বন্ধ করার লক্ষ্যে বিনোদনের মাধ্যমে শিক্ষাদানের একটি প্রয়াস এটি। এ ছাড়া বাল্যবিয়ে ও অকালগর্ভধারণ কমানো এবং পড়ালেখা অব্যাহত রাখা নিশ্চিত করতেও কাজ করছে হিয়া। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে পিএসটিসি, ডিএসকে, আরএইচ স্টেপ যৌথভাবে কাজ করছে।

ওয়েবিনারে বিশেষজ্ঞরা কন্যাশিশুদের প্রতি অবহেলা ও অবমূল্যায়ন বন্ধ এবং তাদের অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একসঙ্গে কাজ করার তাগিদ দিয়েছেন। তাঁরা বলেছেন, কন্যাশিশুর মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় পুরুষদের অংশগ্রহণ জরুরি। ছেলেদের সঙ্গে মেয়েদের বেড়ে ওঠাটা যেন আনন্দময়, শঙ্কামুক্ত ও সহিংসতামুক্ত হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। দারিদ্র্য বা নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দেওয়া বন্ধ করতে হবে। কন্যাশিশুদের শিক্ষার আলোয় বিকশিত হওয়ার সুযোগ ও পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারলে সমতা বিধানও নিশ্চিত হবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা