kalerkantho

সোমবার । ১০ কার্তিক ১৪২৭। ২৬ অক্টোবর ২০২০। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

যুক্তরাষ্ট্রের ফিনসেন নথি ফাঁস

বাংলাদেশের তিন ব্যাংকে সন্দেহের আট লেনদেন

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২২ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বাংলাদেশের তিন ব্যাংকে সন্দেহের আট লেনদেন

সদ্য ফাঁস হওয়া ‘ফিনসেন ফাইলসে’ বাংলাদেশ থেকে যাওয়া এবং বাংলাদেশে আসা আটটি সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য দেওয়া হয়েছে। এই লেনদেনগুলো হয়েছিল ২০১৪ থেকে ২০১৬ সালে, যার পরিমাণ আট লাখ ৩২ হাজার ৯৩৭ ডলার। টাকার অঙ্কে যা সাত কোটির বেশি? যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের গোয়েন্দা সংস্থা ফিন্যানশিয়াল ক্রাইম এনফোর্সমেন্ট নেটওয়ার্কের (ফিনসেন) কাছে থাকা এই তথ্য ফাঁস করেছে অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের জোট ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টস (আইসিআইজে)।

ফিনসেন দাবি করেছে, আড়াই হাজারের বেশি সন্দেহজনক লেনদেনের গোপন নথি তাদের হাতে রয়েছে। ফাঁস হওয়া এসব নথিতে দেখা গেছে, দুই লাখ কোটি ডলারেরও (দুই ট্রিলিয়ন) বেশি অবৈধ অর্থ লেনদেনের সুযোগ দিয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম ব্যাংকগুলো। এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া এবং বাংলাদেশে আসা আটটি সন্দেহজনক লেনদেনের ঘটনা রয়েছে। দেশের তিনটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে এ ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে দুই ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ দেশে ঢুকেছে; আর অন্য ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ বিদেশে গেছে। এসব সন্দেহজনক লেনদেনের বিষয়টি খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশের কেন্দ্রীয় আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ফিন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট। আর বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের কার্যক্রমে জড়িতদের দৃশ্যমান কোনো শাস্তি হয় না বলেই বারবার এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। কঠোরভাবে নিয়মনীতি মেনে চললে, এ ধরনের কার্যক্রম অনেকটাই রোধ করা সম্ভব বলেও মনে করেন তাঁরা। 

এ বিষয়ে বিএফআইইউর প্রধান আবু হেনা মোহাম্মদ রাজি হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ফিনসেন ফাইলসে সন্দেহজনক ব্যাংক লেনদেন নিয়ে যে তথ্য ফাঁস হয়েছে সেটা খতিয়ে দেখে আইনানুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিশেষ করে এখান থেকে কিভাবে অর্থ গেল, এ ক্ষেত্রে যথাযথ আইন মানা হয়েছে কি না, কিংবা কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না সেটি খতিয়ে দেখা হবে। এরপর সেগুলো আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে হস্তান্তর করা হবে। এর আগে পানামা ও প্যারাডাইস পেপারসে বাংলাদেশি বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান নিয়ে যেসব তথ্য ফাঁস হয়েছিল, সেসব বিষয়ও খতিয়ে দেখে আমরা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে তা হস্তান্তর করেছিলাম।

ফিননেসের নথি অনুযায়ী, অন্য দেশ থেকে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোতে এসেছে তিন লাখ ৩৭ হাজার ৭৩৩ ডলার, যার তিন লাখ ৩৬ হাজার ১৩৩ ডলারই ঢুকেছে বাংলাদেশের একটি ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে। এএনজেড (অস্ট্রেলিয়া অ্যান্ড নিউজিল্যান্ড ব্যাংকিং) থেকে এই টাকা এসেছে। টাকা স্থানান্তর হয়েছিল ২০১৬ সালের ২৩ আগস্ট থেকে এক সেপ্টেম্বরে। লেনদেনগুলো সম্পন্ন হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের দ্য ব্যাংক অব নিউ ইয়র্ক মেলন করপোরেশনের মাধ্যমে? তারাই এই লেনদেনের বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টের অর্থপাচার প্রতিরোধ বিভাগকে অবহিত করে? এ ছাড়া দেশের আরেকটি ব্যাংকে এক হাজার ৬০০ ডলারের একটি লেনদেনের বিষয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। ২০১৪ সালের ১৪ এপ্রিল লাটভিয়ার একটি ব্যাংক থেকে ওই টাকা বাংলাদেশের ব্যাংকটিতে এসেছিল? অন্যদিকে চারটি পৃথক লেনদেনের মাধ্যমে দেশের একটি ব্যাংক থেকে জার্মানির ডয়চে ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে চার লাখ ৯৫ হাজার ডলার স্থানান্তর হয়েছিল? এই লেনদেনটি হয়েছে ২০১৬ সালের ১৫ ও ২২ সেপ্টেম্বর? এই সম্পর্কেও ফিন্যানশিয়াল ক্রাইম এনফোর্সমেন্ট নেটওয়ার্কের কাছে রিপোর্ট করা হয়েছিল।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, সন্দেহজনক লেনদেন বা অর্থপাচার সংক্রান্ত বিষয়গুলো বন্ধ করার জন্য দেশের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বিএফআইইউ ও দুদকসহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থা সব সময়ই তৎপর এবং বিভিন্ন সময় নানা পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও শোনা যায়। কিন্তু সত্যিকারভাবে এসব কার্যক্রম কিন্তু বন্ধ করা যাচ্ছে না। কেউ-ই এগুলো বন্ধ করতে পারছে না। তিনি বলেন, বাণিজ্যভিত্তিক মানি লন্ডারিংয়ের ক্ষেত্রে দেখা যায়, যতই পদক্ষেপ নেওয়া হোক না কেন, অসাধু ব্যবসায়ীরা এমন কিছু কারসাজি করে যে ওইটাই গ্রহণ করে নিতে হয়। আবার এই কাজে ব্যাংকারদের সহযোগিতাও থাকে। তাই এগুলো বন্ধ করা একটু টাপ। তার পরও আমি বলব, একেবারে কঠোরভাবে নিয়মনীতি মেনে চললে এটা অনেকটাই রোধ করা সম্ভব। এ ছাড়া এসব ঘটনায় যাদের নাম আসে, সেগুলো তদন্ত করে প্রমাণ হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। এর আগে ২০১৬ সালের এপ্রিলে আইসিআইজে ফাঁস করা আলোচিত পানামা পেপারসে দুই ধাপে অন্তত ৫২ বাংলাদেশির নাম এসেছিল। এর এক বছরের মাথায় ২০১৭ সালের নভেম্বরে প্যারাডাইস পেপারস নামে আর্থিক দুর্নীতির তথ্যও ফাঁস করে আইসিআইজে। এতে কয়েক ধাপে প্রায় ৩০ বাংলাদেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম আসে।

শুধু পানামা, প্যারাডাইস বা ফিনসেন ফাইলস-ই নয়, প্রতিবছর বিভিন্ন  উপায়ে বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থপাচার হচ্ছে। বিদেশে টাকা পাচারে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পরই এখন বাংলাদেশের অবস্থান। ওয়াশিংটনভিত্তিক সংস্থা গ্লোবাল ফিন্যানশিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেবল ২০১৫ সালেই বাংলাদেশ থেকে ৫ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। সব মিলে গত সাত বছরে বাংলাদেশ থেকে পাঁচ হাজার ২৭০ কোটি ডলার বা সাড়ে চার লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। চারটি প্রক্রিয়ায় এই অর্থ পাচার হয়েছে। এগুলো হলো বিদেশ থেকে পণ্য আমদানি মূল্য বেশি দেখানো (ওভার ইনভয়েসিং), রপ্তানিতে মূল্য কম দেখানো (আন্ডার ইনভয়েসিং), হুন্ডি ও অন্য মাধ্যমে বিদেশে লেনদেন এবং ভিওআইপি ব্যবসা।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা