kalerkantho

শুক্রবার । ১৪ কার্তিক ১৪২৭। ৩০ অক্টোবর ২০২০। ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

সবিশেষ

অ্যালবাট্রস রক্ষায় নতুন উদ্যোগ

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



অ্যালবাট্রস রক্ষায় নতুন উদ্যোগ

দেখতে অনেকটা সি-গাল পাখির মতো হলেও অ্যালবাট্রস আকারে অনেক বড়। ডানা মেলতে পারে প্রায় সাড়ে তিন মিটার পর্যন্ত। বেআইনি মাছ ধরাসহ নানা কারণে এই প্রজাতি এখন বিলুপ্তপ্রায়।

গবেষকরা সেই বিপদ দূর করতে প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছেন।

ভারত মহাসাগরে ফ্রান্স নিয়ন্ত্রিত ক্রোজে দ্বীপপুঞ্জে শতাধিক অ্যালবাট্রস পাখির গায়ে ট্রান্সমিটার লাগিয়েছেন অঁরি ওয়াইমার্সকের্শ ও তাঁর সহকর্মীরা। গত বছরের শরৎকাল থেকে তাঁরা আকাশে অ্যালব্যাট্রসের গতিবিধির ওপর নজর রাখছেন। ছোটবেলা থেকেই সামুদ্রিক এই পাখি দেখে মুগ্ধ অঁরি। তিনি বলেন, ‘অ্যালবাট্রস ঘণ্টায় ৭০ থেকে ৮০ কিলোমিটার গতিতে উড়তে পারে। সামুদ্রিক ঝড়ও তাদের দমিয়ে রাখতে পারে না। বাতাস কাজে লাগিয়েই তারা ঘোরাফেরা করে। তবে এই পাখির উড়ালের মধ্যে সত্যি বেশ রাজকীয় ও চমৎকার একটা ব্যাপার আছে। সমুদ্রে পাড়ি দিলে সব পক্ষিবিজ্ঞানীর অন্তত একটি অ্যালবাট্রস দেখার স্বপ্ন থাকে।’

তবে এমন সম্ভাবনা দিনে দিনে কমে চলছে, কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অ্যালব্যাট্রসের বিচরণ নাটকীয় মাত্রায় কমে গেছে। গবেষকদের ধারণা, গোটা বিশ্বে এই প্রজাতির মাত্র ২৫ হাজার প্রাণী টিকে আছে।

খোরাকের সন্ধানে অ্যালবাট্রস প্রায়ই নৌকার পিছু নেয়। নিজের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে অঁরি ওয়াইমার্সকের্শ বলেন, ‘ক্রোজে দ্বীপপুঞ্জে যাওয়ার নৌকা থেকে আমি প্রথম অ্যালবাট্রস দেখি। হঠাৎ যেন পাখিটি উদয় হলো। সমুদ্র অস্থির ছিল। আমরা দেখলাম, অ্যালবাট্রস নৌকার দিকে উড়ে এসে ওপর দিয়ে চলে গেল এবং নৌকার পাশে উড়তে লাগল। আমাদের পর্যবেক্ষণ করে আবার সমুদ্রে উধাও হয়ে গেল।’

এই পাখি মূলত জেলে নৌকা অনুসরণ করে। তবে দুর্ভাগ্যবশত অনেক জেলে পানির ওপর কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ জালের দড়ি ফেলে রাখে, যেগুলোর মধ্যে অসংখ্য হুক বা বড়শি থাকে। টোপ ছিনিয়ে নিতে গিয়ে অ্যালবাট্রস প্রায়ই বড়শি গিলে ফেলে, যার পরিণাম ভীষণ কষ্টকর মৃত্যু।

বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এই সব নৌকার মাছ ধরার অনুমতি থাকে না। ফলে নিয়ম অনুযায়ী সেগুলো শনাক্ত হওয়ার সিগন্যালও পাঠায় না। পানির উপরিভাগ থেকে জাল দ্রুত গভীরে নামানোর জন্য ওজনদার দড়ির মতো নিরাপত্তার ব্যবস্থাও থাকে না। ফলে গি দুয়ামেলের মতো সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানীদের দুশ্চিন্তা বেড়েই চলছে। তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক জলসীমার সমস্যা হলো, সেখানে কোনো অধিকার স্বীকৃত নয়। ফলে আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর হাতে সেখানে কোনো আইনি পদক্ষেপ প্রয়োগ করে এসব নৌকার বেআইনি মাছ ধরা বন্ধ করা সম্ভব নয়।’

সে কারণে অঁরি ওয়াইমার্সকের্শ ও তাঁর সহকর্মীরা তাঁদের ‘ওশান সেন্টিনেল রিসার্চ প্রজেক্ট’ শুরু করে অন্য পথে বেআইনি মাছ ধরা মোকাবেলার চেষ্টা করছেন। তাঁরা ১৭০টি পাখির শরীরে রাডার ট্রান্সমিটার লাগিয়েছেন। সেই যন্ত্র সেসব নৌকাও শনাক্ত করতে পারে, যেগুলো নিয়ম অনুযায়ী নিজস্ব অবস্থান জানাতে সংকেত পাঠাচ্ছে না। অঁরি বলেন, ‘ট্রান্সমিটারের মধ্যে জিপিএস অ্যান্টেনা আছে, যেটি নিখুঁতভাবে সেই জায়গার প্রতি নির্দেশ করতে পারে, যেখানে রাডার শনাক্ত করা হয়েছে। তারপর আরেকটি অ্যান্টেনা স্যাটেলাইটের মাধ্যমে আমাদের সংকেত পাঠায়।’ বিজ্ঞানীরা পাখিদের শরীরে বসানো ট্রান্সমিটার থেকে পাওয়া তথ্য আইনসংগত জেলে নৌকা থেকে পাঠানো তথ্যের সঙ্গে তুলনা করেন। এভাবে তাঁরা জানতে পারেন যে সমুদ্রের বুকে প্রায় ৩০ শতাংশ নৌকারই প্রয়োজনীয় অনুমতি নেই। গবেষকদের দাবি, এমন কিছু নৌকা স্পেন ও চীনের পতাকার ছত্রচ্ছায়ায় ঘোরাফেরা করছে।

স্পেনের টেকসই মাছ ধরা বিভাগের মহাপরিচালক ইসাবেল আর্তিমে গার্সিয়া অবশ্য সেই অভিযোগ মানতে একেবারেই প্রস্তুত নন। তিনি বলেন, ‘এই মহাসাগর বা অন্য যেকোনো মহাসাগরে স্পেনের পতাকার ছত্রচ্ছায়ায় যেসব নৌকা চলছে, সেগুলোর ওপর যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণ থাকে। আমরা প্রতিটি নৌকা মনিটর করি এবং সেগুলোর কার্যকলাপ না জানা অসম্ভব।’

কিন্তু পক্ষিবিজ্ঞানীরা নিজেদের গবেষণার ওপর আস্থা রাখেন। তাঁদের সংগৃহীত তথ্য যে বেআইনি মাছ ধরা বন্ধ করতে এবং অ্যালবাট্রস বাঁচাতে সাহায্য করবে, সে বিষয়ে তাঁরা নিশ্চিত। অঁরি ওয়াইমার্সকের্শ বলেন, ‘কোনো জায়গায় মৃত্যুর হার বেশি এবং সেখানকার বেশির ভাগ নৌকা শনাক্ত করার প্রণালী বন্ধ রয়েছে—সাম্প্রতিক তথ্যের ভিত্তিতে আমরা এমন প্রমাণ দিতে পারলে তা হবে সঠিক দিশায় এক পদক্ষেপ।’

সমুদ্রে বিচরণরত অ্যালবাট্রস নিয়ে কাজের সুবাদে অঁরি ওয়াইমার্সকের্শ একই সঙ্গে সংরক্ষণবাদী ও গবেষক হয়ে উঠেছেন। তিনি জানেন, এই প্রজাতির অস্তিত্ব বাঁচানোর সময় কমে চলেছে। তাই বেআইনি মাছ ধরায় রাশ টানতে তিনি নিজের সংগৃহীত তথ্য কাজে লাগাচ্ছেন। ক্রোজে দ্বীপপুঞ্জের আকাশে অ্যালব্যাট্রসের উড়াল চালু রাখতে তিনি বদ্ধপরিকর। সূত্র : ডয়চে ভেলে।

মন্তব্য