kalerkantho

বুধবার । ১৫ আশ্বিন ১৪২৭ । ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১২ সফর ১৪৪২

সংগ্রহ

রবিউলের দুনিয়া কয়েন আর নোটে

আজিজুল পারভেজ   

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



রবিউলের দুনিয়া কয়েন আর নোটে

বাজারে প্রচলিত ব্যাংক নোটগুলোর মধ্যে ত্রুটিপূর্ণ নোটের সংখ্যা নেহাত কম নয়। সাধারণের চোখে হয়তো তা ধরা পড়ে না, কিন্তু মো. রবিউল ইসলামের চোখ এড়ানো মুশকিল। কারণ তিনি ব্যাংক নোটের সংগ্রাহক। তাইতো তাঁর কাছে চলে আসে একই মূল্যমানের টাকার একই নম্বরযুক্ত দুটি নোট। অবিশ্বাস্য হলেও এটা সত্য। এসে যায় একটি নোটের ওপর তিনটি নোটের ছাপযুক্ত নোট! এক পিঠ সম্পূর্ণ সাদা নোটও চলে আসে। আর তা থেকেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে ত্রুটিপূর্ণ নোটের বিপুল সংগ্রহ। শুধু ব্যাংক নোট নয়, নানা বৈচিত্র্য আর বিস্ময়কর ব্যাংক নোটের পাশাপাশি দুর্লভ সব কয়েনের ঐশ্বর্যময় ভাণ্ডার গড়ে তুলেছেন তিনি।

রবিউল ইসলামের বাড়ি খুলনা শহরের গোবরচাকা এলাকায়। পেশায় বেসরকারি চাকরিজীবী। দেশের শীর্ষ শিল্প গ্রুপ বসুন্ধরার এমসিএমএল ও বিআইসিএলের হেড অব ডিভিশন (অ্যাকাউন্টস)।

স্কুলজীবন থেকেই সংগ্রহের নেশা রবিউলের। পড়তেন খুলনার সেন্ট যোসেফস উচ্চ বিদ্যালয়ে। বিদ্যালয়ের শিক্ষক, খ্রিস্টান মিশনারির ফাদাররা বিভিন্ন সময়ে ছাত্রদের উপহার দিতেন স্ট্যাম্প। সেই থেকে শুরু হয় স্ট্যাম্প সংগ্রহ। কলেজজীবনে এসে সেই নেশা গড়ায় পুরনো কয়েন আর বৈচিত্র্যময় ব্যাংক নোট সংগ্রহের দিকে। এগুলোর ঐতিহাসিক মূল্যও অনেক বেশি। বর্তমানে সাত হাজার কয়েন বা ধাতব মুদ্রা ও চার হাজার ব্যাংক নোট রয়েছে রবিউল ইসলামের সংগ্রহে।

কয়েনের প্রচলন শুরু আড়াই হাজার বছর আগে। ভারতবর্ষের সেই মগধ সাম্রাজ্যের (খ্রিস্টপূর্ব ৫৪৪-৩২১) মৌর্য যুগের কয়েন থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময় ও সাম্রাজ্যের দুর্লভ সব কয়েন রয়েছে রবিউলের সংগ্রহে। উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কয়েন রয়েছে বাংলার সুলতানি আমলের। ঐতিহাসিকদের কাছে ওই সব মুদ্রার গুরুত্ব এই কারণে বেশি যে সুলতানি আমলের সাড়ে তিন শ বছরের ইতিহাস লিপিবদ্ধ হয়েছে সে সময়ের মুদ্রায় থাকা শাসকের নাম ও সালের ভিত্তিতে। মুসলিম শাসকদের সে সময়ের মুদ্রাগুলো মুদ্রিত হতো আরবি হরফে। তবে দুজন শাসক ছিলেন হিন্দু। তাঁদের সময়ের মুদ্রাগুলোর হরফ ছিল বাংলা। সে আমলের অনেক দুর্লভ মুদ্রার সঙ্গে ১৪১৭-১৮ খ্রিস্টাব্দের সেই দুর্লভ মুদ্রাও আছে রবিউলের সংগ্রহে। আরো আছে গুপ্ত যুগ, মোগল সাম্রাজ্য ও ব্রিটিশ আমলের দুর্লভ কয়েন।

বিষয়ভিত্তিক কয়েনের মধ্যে রয়েছে ব্রিটিশ-ভারতীয় মুদ্রা, বিভিন্ন আকারের রঙিন মুদ্রা, দ্বি-ধাতু মুদ্রা, ছিদ্রযুক্ত মুদ্রা, বিলুপ্ত দেশের মুদ্রা। আছে বিশ্বের ৩০টি দেশ থেকে প্রকাশিত প্রিন্সেস ডায়ানার ছবিযুক্ত মুদ্রা।

একইভাবে ব্যাংক নোটের প্রচলন শুরুর সেই ১৭৯২ সালের ফ্রান্সের নোট থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক ব্যাংক নোট আছে রবিউলের সংগ্রহে। যেমন—বিভিন্ন দেশের এক মূল্যমানের ৭৫০ প্রকার নোট আছে। পলিমার নোট আছে ৩০০ প্রকার। রয়েছে বাংলাদেশের আটটি মূল্যমানের নোটের সবগুলোর সলিড নম্বরের নোট। স্বাক্ষরভিন্নতা, নকশাভিন্নতা অনুযায়ী আছে সব নোট। ত্রুটিপূর্ণ নোটও আছে অনেক।

রবিউল ইসলামের এই সমৃদ্ধ সংগ্রহ নিয়ে এরই মধ্যে দশটি প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকার জিপিও, জাতীয় চিত্রশালা ও দৃক গ্যালারিতে হয়েছে দুটি করে প্রদর্শনী। অন্য প্রদর্শনীগুলো হয়েছে যশোর সেনানিবাস, খুলনা সেনানিবাস ও খুলনা কলেজিয়েট স্কুলে।

রবিউল ইসলাম সর্বশেষ চলতি মাসে প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের ধাতব মুদ্রার ক্যাটালগ ‘কয়েনস অব বাংলাদেশ’। এতে রয়েছে বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত সব প্রচলিত ও স্মারক ধাতব মুদ্রার বিস্তারিত তথ্য। চার রঙে অফসেট ম্যাট কাগজে মুদ্রিত এই ক্যাটালগে বাংলাদেশের ২৮ প্রকার প্রচলিত মুদ্রা এবং ১৬ প্রকার স্মারক মুদ্রা ও সচিত্র তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মুদ্রার প্রকাশ সাল, ধাতুর ধরন, এপিঠ-ওপিঠের বর্ণনা, ওজন, ব্যাস, পুরুত্ব, আকৃতি ও প্রান্ত সম্পর্কিত তথ্য। ৪৮ পৃষ্ঠার ক্যাটালগটির মূল্য রাখা হয়েছে ১২০ টাকা।

রবিউল ইসলাম বলেন, ক্যাটালগটি কয়েন সংগ্রাহকদের জন্য খুবই সহায়ক হবে। একেকটি কয়েন কোন কোন সালে প্রকাশ হয়েছে তা এতে দেওয়া আছে। তা দেখে তাঁরা নিজেদের সংগ্রহকে সমৃদ্ধ করতে পারবেন।

রবিউল ইসলাম তাঁর সংগ্রহের ভাণ্ডার সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। সে লক্ষ্যে নিজের সমৃদ্ধ সংগ্রহ নিয়ে তিনি একটি ওয়েবসাইট (robiscollection.blogspost.com) খুলেছেন। সেখানে রয়েছে ১৫ হাজার ইমেজ। যে কেউ ক্লিক করে দেখে নিতে পারেন সেসব।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা