kalerkantho

সোমবার । ১৩ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১০ সফর ১৪৪২

এনআইডি জালিয়াতি করে সম্পত্তি দখলের চেষ্টা

চক্রে কুষ্টিয়া জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানও!

জালিয়াতি খুঁজে বের করতে কমিটি গঠন

নিজস্ব প্রতিবেদক, কুষ্টিয়া   

১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



চক্রে কুষ্টিয়া জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানও!

কুষ্টিয়ায় জালিয়াতি করে এনআইডি বানিয়ে ১৩ কোটি টাকার সম্পত্তি হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টার ঘটনায় নেতৃত্ব দিয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগ সহসভাপতি ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হাজি রবিউল ইসলাম। এই ঘটনায় আটক হার্ডওয়্যার ব্যবসায়ী মহিবুল ইসলাম গত সোমবার কুষ্টিয়ার আদালতে ১৬৪ ধারায় দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে চাঞ্চল্যকর এই তথ্য দিয়েছেন। জালিয়াতির মাধ্যমে রেজিস্ট্রি করে এই জমি নিলে কোনো সমস্যা হবে না বলে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হাজি রবিউল আশ্বস্ত করেছিলেন মহিবুলকে। এ জন্য মহিবুল ৩০ লাখ টাকাও দেন হাজি রবিউলকে।

জমি জালিয়াতির মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে হাজি রবিউল ইসলামের নাম আসায় দলীয় নেতাকর্মীরা বিব্রত। তাঁরা এ ঘটনার সঠিক তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে জেলা আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা হাজি রবিউল ইসলাম দাবি করেছেন, এসব তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শহরে জমি জালিয়াতির ঘটনায় কুষ্টিয়া সদর মডেল থানায় ১৮ জনকে আসামি করে যে মামলা হয়েছে, তাতে যুবলীগ নেতা আশরাফুজ্জামান সুজনকে মূল হোতা হিসেবে আসামি করা হয়। সুজনকে যুবলীগের রাজনীতিতে আনার পেছনে বড় ভূমিকা ছিল হাজি রবিউল ইসলামের। এনআইডি জালিয়াতি করে জমি বিক্রির মামলায় সুজন গ্রেপ্তার হওয়ার পর হাজি রবিউল ইসলামের সম্পৃক্ততা নিয়ে শহরে নানা আলোচনা হতে থাকে। ১৩ কোটি টাকার জমি জালিয়াতি করে ৭৭ লাখ টাকায় কেনা হার্ডওয়্যার ব্যবসায়ী মহিবুল ইসলাম গ্রেপ্তারের পর তাঁর জবানবন্দিতে হাজি রবিউল ইসলামের সম্পৃক্ততার বিষয়ে প্রশাসনও নড়েচড়ে বসেছে। দলীয় নেতারা জানান, মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হওয়ার পর হাজি রবিউল ইসলাম হাউজিংয়ে সাধারণ মানুষের কাছে বিক্রি করা গণপূর্তের প্লট দখল, বটতৈল এলাকায় ব্যক্তিমালিকাধীন একটি দোতলা মার্কেটকে জেলা পরিষদের জমি দাবি করে এক শিল্পপতির নামে ইজারা দিয়ে তা উচ্ছেদসহ নানা ঘটনার জন্ম দিয়ে বিতর্কিত হয়েছেন।

কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী সাংবাদিকদের বলেন, পত্র-পত্রিকায় খবর দেখেছি। বিষয়টি স্পর্শকতার। কুষ্টিয়ায় দলের শীর্ষ নেতার নাম এসেছে মহিবুলের জবানবন্দিতে। কেন্দ্র থেকে এখনো নির্দেশনা আসেনি। এলে সেইভাবে দল দেখবে। কোনো অন্যায়, অপকর্মের দায়ভার দল নেবে না।

এদিকে হাজি রবিউল ইসলাম নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে কেউ ষড়যন্ত্র করছে।’ কারা ষড়যন্ত্র করছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমিও বুঝতে পারছি না। আমি বিন্দুমাত্র এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত নই।’ 

জালিয়াতি খুঁজে বের করতে কমিটি গঠন :  এদিকে জমি জালিয়াতি নিয়ে একাধিক গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর ভূমি সম্পত্তি বিষয়ক জেলা কমিটির এক জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে। জেলা প্রশাসক আসলাম হোসেন তাঁর কার্যালয়ে এই সভা করেন। সেখানে পুলিশ সুপার এস এম তানভীর আরাফাত, সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আতাউর রহমান আতা, সরকারি কৌঁসুলি অনুপ কুমার নন্দী, কুষ্টিয়া পৌরসভার প্যানেল মেয়র মতিয়ার রহমানসহ সরকারি কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সভায় জেলা প্রশাসক আসলাম হোসেন বলেন, ‘স্থানীয় সংসদ সদস্য মাহবুব উল আলম হানিফের নির্দেশে এই জরুরি সভা ডাকা হয়েছে। তিনি পরামর্শ দিয়েছেন জমি জালিয়াতির বিষয়ে জেলায় যত অভিযোগ আছে, তা যেন গ্রহণ করা হয় এবং সবগুলোর ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সভায় জেলা প্রশাসক আসলাম হোসেনকে প্রধান করে পুলিশ সুপার এস এম তানভীর আরাফাত ও সরকারি কৌঁসুলি অনুপ কুমার নন্দীকে সদস্য করে তিন সদস্যের একটি কমিটি করা হয়। জমি জালিয়াতির কোনো অভিযোগ পেলে এই কমিটি দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।

একটি জালিয়াতচক্র কুষ্টিয়া শহরের মজমপুর মৌজার প্রায় ১৩ কোটি টাকা মূল্যের ২২ শতক জমির ভুয়া মালিক সেজে মাত্র ৭৭ লাখ টাকায় হার্ডওয়্যার ব্যবসায়ী মহিবুল ইসলামের নামে রেজিস্ট্রি করিয়ে দেয়। বর্তমানে এই জমির বাজারমূল্য আরো বেশি। ওই চক্র প্রকৃত মালিকের নামে ভুয়া এনআইডি বানিয়ে তার মাধ্যমে জমি রেজিস্ট্রি করিয়ে নেয়। এরপর মহিবুল জমি দখল করতে গেলে প্রকৃত মালিক টের পান। পরে এই ঘটনায় জমির প্রকৃত মালিক শহরের থানাপাড়া এলাকার বাসিন্দা এম এম ওয়াদুদ ওই চক্রের ১৮ জনের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করেন। এই জালিয়াতির ঘটনায় হার্ডওয়্যার ব্যবসায়ী মহিবুল ইসলামকে গত রবিবার আটক করে পুলিশ। মহিবুল গত সোমবার কুষ্টিয়া সদর আমলি আদালতের বিচারক দেলোয়ার রহমানের কাছে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। এই ঘটনায় এ পর্যন্ত ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা