kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৪ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১১ সফর ১৪৪২

পদমর্যাদাসীমা নিয়ে প্রশ্ন

লাল পাসপোর্টের চাপে মন্ত্রণালয়

বাহরাম খান    

৯ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



লাল পাসপোর্টের চাপে মন্ত্রণালয়

সরকারের বিভিন্ন কমিশন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পদমর্যাদার সীমা বিষয়ে নতুন করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ক্রমেই উচ্চ পদমর্যাদার ব্যক্তির সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় অর্থাৎ কূটনৈতিক পাসপোর্টধারীর (লাল পাসপোর্ট হিসেবে পরিচিত) সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর সঙ্গে ভিসাহীন চুক্তির ক্ষেত্রে আপত্তি আসছে বলে এমন আহ্বান মন্ত্রণালয়ের।

অন্যদিকে ‘সমমর্যাদা’ দাবি করে উচ্চ পদধারীরা কূটনৈতিক পাসপোর্টের জন্য চাপ দিচ্ছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, বিশ্বব্যাপী কূটনৈতিক পাসপোর্ট খুবই সীমিত আকারে রাখা হয়, বাংলাদেশেও তাই রাখা উচিত।

গত ডিসেম্বর মাসে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো এক চিঠিতে উচ্চ পদমর্যাদাধারীদের বিষয়ে নতুন করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ উচ্চ পদমর্যাদাধারীদের বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কাছে জানতে চেয়েছে। যদিও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এখনো এই বিষয়ে কোনো উত্তর পাঠায়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, কমিশন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে প্রশাসনিক পদেও মর্যাদা বাড়ানো হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা বিভিন্ন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) পদে নিয়োগ দেওয়া হতো যুগ্ম সচিবদের। এখন ডিজি পর্যায়ে অতিরিক্ত সচিবদের নিয়োগ দিয়ে গ্রেড-১ হিসেবে সচিব মর্যাদা দেওয়া হচ্ছে। এভাবে দিন দিন উচ্চ পদমর্যাদার ব্যক্তি বাড়ার কারণে কূটনৈতিক পাসপোর্টের চাপও বাড়ছে।

জানা গেছে, মন্ত্রিপরিষদসচিবের কাছে লেখা চিঠিতে পররাষ্ট্রসচিব বলেছেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বহির্গমন শাখা-১ কর্তৃক জারি করা ‘কূটনৈতিক পাসপোর্ট লাভের যোগ্য ব্যক্তিগণের তালিকা’ অনুযায়ী বিভিন্ন কমিশনের প্রধান ও সদস্যরা এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা কূটনৈতিক পাসপোর্ট পান। ২০১৩ সালে যখন তালিকাটা প্রণয়ন করা হয়েছিল তখন কমিশনের সংখ্যা ছিল মাত্র পাঁচ-সাত, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ছিল আটটি। কিন্তু বর্তমানে কমিশনের সংখ্যা অন্তত ২০, যার প্রতিটিতে একজন চেয়ারম্যানসহ পাঁচ-সাতজন করে সদস্য আছেন। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৫০, যা পর্যায়ক্রমে আরো বাড়ছে। এই অবস্থায় কূটনৈতিক পাসপোর্ট লাভের যোগ্য ব্যক্তির সংখ্যাও বেড়ে যাচ্ছে। এই কারণে কূটনৈতিক পাসপোর্ট কারা পাবেন সে বিষয়ে তালিকা হালনাগাদ করে সুনির্দিষ্ট করার প্রস্তাব দিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

তৎকালীন পররাষ্ট্রসচিব শহীদুল হকের লেখা চিঠিতে আরো বলা হয়েছে, কূটনৈতিক পাসপোর্ট 

বিশেষ পদমর্যাদার ব্যক্তিদের বিশেষ উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কূটনৈতিক পাসপোর্টের প্রাপ্যতা সীমিত রাখা হয়। সম্প্রতি বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক ও সরকারি পাসপোর্টধারীদের সফরের ক্ষেত্রে ভিসা অব্যাহতি সংক্রান্ত দ্বিপক্ষীয় চুক্তির আলোচনায় অনেক দেশ কূটনৈতিক পাসপোর্টের প্রাপ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। সরকারি পাসপোর্টের সংখ্যা অনেক বেশি থাকায় কয়েকটি দেশ ভিসা অব্যাহতির চুক্তি স্বাক্ষর করতে রাজি হয়নি।

ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, সামনে আরো কয়েকটি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সরকারি পাসপোর্টধারীদের ভিসা অব্যাহতি সংক্রান্ত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। পূর্ব-ইউরোপীয় কয়েকটি দেশ এসংক্রান্ত আলোচনায় বাংলাদেশে কূটনৈতিক পাসপোর্ট কারা পান তার তালিকা চেয়েছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, তালিকার বিষয়টি শুধু অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের জন্য সংরক্ষিত করতে না পারলে অনেক দেশ এসংক্রান্ত চুক্তি করতে রাজি হবে না। তাই এই বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের উদ্যোগে পররাষ্ট্র, জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে বৈঠক করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার।

জানা গেছে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এসংক্রান্ত চিঠি পেলেও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কাছে এখনো জবাব দেয়নি।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, যাদের যে মর্যাদা দেওয়া হচ্ছে তা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আইন অনুযায়ীই দেওয়া হচ্ছে। এই বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে যথাযথ উত্তর দেওয়া হবে।

অন্যদিকে মন্ত্রিপরিষদ মনে করছে, উচ্চ মর্যাদার পদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে নতুন করে চিন্তা করা উচিত। জনপ্রশাসন এসব পদমর্যাদা কিভাবে দেয় তা নিশ্চিত নয় বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যে প্রশ্ন তুলেছে তা যথাযথ। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েই বিবেচনা করা হচ্ছে। জনপ্রশাসন থেকে মতামত পেলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ পরবর্তী উদ্যোগ নেবে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বহির্গমন শাখা থেকে জারি করা ‘কূটনৈতিক পাসপোর্ট লাভের যোগ্য ব্যক্তিগণের তালিকা’র মধ্যেও বিভিন্ন সুনির্দিষ্ট পদের সঙ্গে ‘সমমর্যাদার’ চাকুরেরাও সেই সব সুবিধা পাবেন বলে উল্লেখ করা আছে। এই সুযোগে সবাই সমান সুযোগ দাবি করছেন বলে মনে করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদেরও অভিমত, সমমর্যাদার পদ, মানে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সব পর্যায়ে মূল পদের সম্মান ও সুবিধা ভোগ করবেন, তা কিন্তু নয়। এটি একটি স্পিরিট বা প্রতীকী অর্থ বুঝাতে সমমর্যাদা দেওয়া হয়। কিন্তু অনেকেই সেটা না বুঝে মূল পদের ক্ষমতা বা সুবিধা ভোগ করতে চাওয়ায় সমস্যা হচ্ছে। এই বিষয়ে নতুন করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বিষয়টি নিয়ে চার মন্ত্রণালয়কে নিয়ে আন্ত মন্ত্রণালয় বৈঠক করে স্পষ্ট করা হবে। যাতে বিভিন্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে।

জানতে চাইলে সাবেক পররাষ্ট্রসচিব শহীদুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি এখন চাকরিতে নাই। তাই এই বিষয়ে মন্তব্য করতে চাই না।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা