kalerkantho

বুধবার । ২৮ শ্রাবণ ১৪২৭। ১২ আগস্ট ২০২০ । ২১ জিলহজ ১৪৪১

গভীর সংকটে তারকা হোটেল

তিন মাসে ক্ষতি দেড় হাজার কোটি টাকা

► তিন হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা চায় বিআইএইচএ
►স্মরণকালের সর্বনিম্ন অতিথি

এম সায়েম টিপু   

১১ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



তিন মাসে ক্ষতি দেড় হাজার কোটি টাকা

বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও সম্ভাবনাময় এবং দ্রুত বর্ধনশীল পর্যটন হোটেলসহ তারকা হোটেল খাতে গভীর সংকট তৈরি করেছে করোনাভাইরাস। ফলে এরই মধ্যে এ খাতে দেড় হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এ অচলাবস্থা চলতে থাকলে চলতি জুলাই মাসে  ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে চার হাজার কোটি টাকায়। খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা এমন আশঙ্কা করছেন। খাতটিকে রক্ষায় অন্যান্য খাতের মতো সরকারের কাছে তিন হাজার কোটি টাকার প্রণোদনাসহ চার দফা দাবি জানিয়েছে দেশের আন্তর্জাতিক মানের পাঁচতারা হোটেলগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল হোটেল অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএইচএ)। সম্প্রতি সংগঠনটির পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী বরাবর এক চিঠিতে এ দাবি জানানো হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিআইএইচএর সভাপতি এইচ এম হাকিম আলী।

চিঠিতে বলা হয়, জিডিপিতে এ খাতের অবদান ৪.৪ শতাংশ, যা দ্রুত দুই অঙ্কের দিকে (১০%) নিয়ে যেতে সরকারের সহায়ক হিসেবে কাজ করছে সংগঠনটি। কিন্তু করোনাভাইরাসের প্রভাবে বেশির ভাগ হোটেলে অতিথির সংখ্যা নেমে এসেছে ২ থেকে ৩ শতাংশে। এটি স্মরণকালের মধ্যে সর্বনিম্ন। এ ছাড়া পরিচালনা ব্যয় নির্বাহ করতে না পারায় এরই মধ্যে বেশ কিছু হোটেল তাদের কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে। অপ্রত্যাশিত এই আর্থিক সংকটে কাজ হারিয়েছেন অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী। শুধু দুই থেকে পাঁচতারা মানের হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টেই কাজ হারিয়েছেন এক লাখ মানুষ।

এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়ে এইচ এম হাকিম আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পোশাকশিল্পের মতো দেশের হোটেল তথা পর্যটনশিল্পকে বাঁচাতে আমরা চার দফা দাবি জানিয়ে চিঠি দিয়েছি। এ ছাড়া আগামী তিন বছরের জন্য তিন হাজার কোটি টাকার সুদমুক্ত ঋণ চেয়েছি। করোনা সংকট কেটে গেলে বিদেশি গণমাধ্যমে প্রচারণা চালাতে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দের আহ্বান জানাই প্রধানমন্ত্রীর কাছে। আর করোনাকালীন পরিষেবা বিল মওকুফসহ আগামী দুই বছর আয়কর মওকুফ করারও দাবি জানাই।’ 

প্রধানমন্ত্রী বরাবর চিঠিতে বলা হয়, বর্তমানে দেশে আন্তর্জাতিকমানের আবাসিক হোটেল ও অন্যান্য হোটেলের বিপরীতে বিদ্যমান ঋণের লভ্যাংশ/সুদ মার্চ ২০২০ থেকে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত মওকুফ, ক্ষতিগ্রস্ত হোটেল ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে সরকার ঘোষিত প্রণোদনার ওপর অর্পিত মোট ৯% লভ্যাংশ/সুদ হারে পরিশোধের সময়সীমা তিন বছরের স্থলে পাঁচ বছর করা এবং ঋণ বিতরণের তারিখ থেকে দুই বছর গ্রেস পিরিয়ড রেখে পরবর্তী তিন বছর এ পরিশোধের সময়সীমা নির্ধারণ করা, করোনা মহামারির কারণে সরকারি আদেশ অনুযায়ী লকডাউনে ছুটিতে যাওয়া হোটেল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সরকার ঘোষিত ৭৬০ কোটি টাকা বরাদ্দের তহবিল থেকে এককালীন অথবা মাসিক বেতন তাদের ব্যাংক হিসাবে সরাসরি দেওয়ার ব্যবস্থা করা, আবাসিক হোটেলগুলোর মার্চ ২০২০ থেকে ডিসেম্বর ২০২০ পর্যন্ত সব ইউটিলিটি বিল ইলেকট্রিক/ওয়াসা এবং গ্যাস বিল মওকুফ করার দাবি জানানো হয়।

এদিকে স্থানীয় তারকা মানের হোটেলগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল শুরু না হওয়ায় বিদেশি অতিথি নেই বললেই চলে। যেখানে আগে নিয়মিত ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ অতিথি থাকত, বর্তমানে তা নেমে এসেছে ২ থেকে ৩ শতাংশে। হোটেলের স্থায়ী কর্মীরা এখনো কাজ না হারালেও দৈনিক ভিত্তিতে যারা কাজ করতেন তাঁরা কাজ হারিয়েছেন।

জানতে চাইলে ওয়েস্টিন হোটেলের ঢাকার পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ আবদুল মোতালেব কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বিমান পুরোপুরি চালু না হওয়ায় আমাদের হোটেলও পুরোপুরি চালু হয়নি। ভার্চুয়ালে সভা-সেমিনার হওয়ায় কনফারেন্স রুমগুলো বন্ধ। প্রায় ৬০০ কর্মী কাজ করেন আমাদের এই হোটেলে। এর মধ্যে ১৫০ জন দৈনিক ভিত্তিতে। প্রতিষ্ঠানের পক্ষে কাউকে বাদ দেওয়া না হলেও ওই দেড় শ কর্মীর অন্তত ১০০ জন কাজে আসছেন না। টিকে থাকতে ব্যয় সংকোচন করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠান ভর্তুকি হিসেবে কর্মীদের বেতন দিচ্ছে।

হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালে ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, তাঁদের হোটেলেও অতিথি নেই বললেই চলে। বিশেষ অফারে প্রতিদিন দু-একজন অতিথি এলেও পরের দিন চলে যান। এ অবস্থায় স্থায়ী কর্মীরা বেতন-ভাতা পেলেও দৈনিক ভিত্তিক বেশির ভাগ কর্মী কাজে আসে না। এসব কর্মী অর্থকষ্টে দুর্বিষহ দিন কাটাচ্ছে। আশার কথা হলো, গত তিন মাসের মধ্যে সম্প্রতি একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানের অর্ডার পেয়েছে হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টাল।

তথ্য মতে, গত জানুয়ারি থেকেই হোটেল খাতে করোনার প্রভাব পড়তে শুরু করে। আর গত ২৬ মার্চ থেকে দেশে অঘোষিত লকডাউন চলছে। ফলে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন এ খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। যেখানে প্রতিটি পাঁচতারা হোটেল মাসে পাঁচ থেকে ছয় কোটি টাকা লাভ করত; সেখানে এখন প্রতি মাসে পাঁচ থেকে ছয় কোটি টাকা লোকসান দিচ্ছে।

বিআইএইচএ সূত্র জানায়, বাংলাদেশে বিদেশি অতিথিদের বেশির ভাগই আসেন চীন, জাপান, ভারত, ফ্রান্স, ডেনমার্ক ও শ্রীলঙ্কা থেকে। সাধারণত বছরের এ সময়ে ৭০ শতাংশের বেশি রুমে অতিথি থাকলেও করোনার প্রভাবে এখন সেটি নেমে এসেছে ২ শতাংশে। এ অবস্থায় বিআইএইচের সদস্য এমন ৪৪টি তারকা হোটেলসহ ৫০০ হোটেল চার হাজার কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা