kalerkantho

শনিবার । ৩১ শ্রাবণ ১৪২৭। ১৫ আগস্ট ২০২০ । ২৪ জিলহজ ১৪৪১

বান্দরবানের উত্তর-পূর্বাংশ এখন ভয়ংকর জনপদ

নিজস্ব প্রতিবেদক, বান্দরবান   

১০ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বান্দরবানের উত্তর-পূর্বাংশ এখন ভয়ংকর জনপদ

এক পাশে বান্দরবান সদর, রোয়াংছড়ি ও রুমা উপজেলার উত্তর-পূর্ব অংশ। ওপারে রাঙামাটির কাপ্তাই, রাজস্থলী ও বিলাইছড়ি উপজেলা। মাঝখানে সড়কহীন খাড়া খাড়া পাহাড় আর গহিন জঙ্গল। স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাশ এবং শঙ্খ নদের উত্তর পারের এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলটি প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর হলেও বসতি খুব বেশি নেই। যারা বাস করছে তাদের মধ্যে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা এবং সামান্য কিছু খেয়াং পরিবার ছাড়া অন্য জনজাতির বসতি নেই বললেই চলে। ভৌগোলিক ও কৌশলগত অবস্থানের দিক থেকে বেশ সুবিধাজনক বিস্তীর্ণ এই অঞ্চলটিতে এত দিন বইছিল শান্তির সুবাস। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর সামরিক ক্যাডারদের নিষ্ঠুরতায় এখন এটি এক ভয়াল সন্ত্রাসী জনপদ।

পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত এত দিন ছিল রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে। তবে দুই বছর ধরে বান্দরবান সদর, রোয়াংছড়ি ও রুমা উপজেলায়ও ছড়িয়েছে এই সংঘাত। শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরকারী পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস) এবং শান্তিচুক্তিবিরোধী আঞ্চলিক সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) বেশ কয়েকজন সিনিয়র নেতা কালের কণ্ঠকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাঁরা বলেন, শুধু নির্জন ও জঙ্গলাকীর্ণ এলাকার কারণেই নয়, বিলাইছড়ির ফারুয়া এবং রুমার রনিনপাড়ার পাশ দিয়ে ভারত সীমান্তে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগকে কাজে লাগাতেই এই অঞ্চলকে বেছে নেওয়া হয়েছে। তাঁরা বলেন, পাহাড়ে ১১টি জাতিসত্ত্বা বাস করলেও চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা ও তঞ্চঙ্গ্যা ছাড়া অন্যদের ওপর পাহাড়ি সংগঠনগুলোর নেতাদের খুব আস্থা নেই। ফলে প্রধান চারটি জনজাতি অধ্যুষিত এলাকাগুলোকেই ঘাঁটি গাড়ার জন্য তাঁরা বেছে নেন।

পাহাড়ি জনগোষ্ঠীগুলোর প্রবীণ সদস্যরা প্রশ্ন তুলেছেন, বিভিন্ন এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদাবাজির কর্তৃত্ব ধরে রাখার জন্য নিজেদের মধ্যে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে আঞ্চলিক সংগঠনগুলোকে দেখা যাচ্ছে না।

একজন মৌজা হেডম্যান এবং একাধিক পাড়াপ্রধান (কার্বারি) নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আঞ্চলিক সংগঠনগুলো পাহাড়ি জনজাতির শত বছরের প্রথাগুলোকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিজেরাই বিচার-আচার করায় হেডম্যান-কার্বারিরাও এলাকাবাসীর কাছে গুরুত্বহীন হয়ে পড়ছেন।

বান্দরবান জেলা চাঁদা আদায়ের জন্যও উর্বর ভূমি। জনগণকে সংগঠিত করা কিংবা আদর্শ প্রচারের চেয়ে প্রতিবছর বিপুল অঙ্কের চাঁদা আদায়ের জন্যই সংগঠনগুলো একে অন্যের সঙ্গে দ্বন্দ্ব-সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে।

বান্দরবানের প্রকৌশল বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রতিবছর বান্দরবানে ৫০০ কোটি টাকারও বেশি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। এসব প্রকল্পে নিয়োজিত ঠিকাদারদের আঞ্চলিক সংগঠনগুলোকে ক্ষেত্রবিশেষে ৫ থেকে ১০ শতাংশ চাঁদা দিতে বাধ্য করা হয়। এ ছাড়া কাঠ ও বাঁশ ব্যবসায় জড়িত সবার কাছ থেকে মৌসুমভিত্তিক এককালীন বিপুল অঙ্কের টাকা আদায় করা হয়। তিনি জানান, এই দুটি খাত থেকেই বছরে ৫০ কোটি টাকার বেশি চাঁদা আদায় করা হয়। ফলে চাঁদা আদায়ের কর্তৃত্ব একটি বড় বিষয়।

পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বিভিন্ন এলাকায় নিজেদের কর্তৃত্ব ধরে রাখতে শান্তিচুক্তির পক্ষ ও বিপক্ষ হিসেবে পরিচিত পিসিজেএসএস এবং ইউপিডিএফ নিজেদের বিরোধ ভুলে এখন একযোগে কাজ করছে। অন্যদিকে পাল্টা প্রতিশোধ হিসেবে তাদের দুই বিদ্রোহী সংগঠন পিসিজেএসএস এমএন লারমা গ্রুপ এবং ইউপিডিএফ গণতন্ত্রী গ্রুপও নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে চলতে শুরু করেছে। এদের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ‘মগ পার্টি’ নামে আরো একটি স্থানীয় সংগঠন।

এমন পরিস্থিতিতে গত মঙ্গলবার বাঘমারা বাজারপাড়ার ঘটনাটিও চাঁদা আদায়ের কর্তৃত্ব পুনঃ প্রতিষ্ঠার জন্যই ঘটানো হয়েছে বলে সূত্রগুলো দাবি করেছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা