kalerkantho

সোমবার  । ১৯ শ্রাবণ ১৪২৭। ৩ আগস্ট  ২০২০। ১২ জিলহজ ১৪৪১

করোনা সংকট কেটে যাবে, এই আশায় মানুষ

আবুল কাসেম ফজলুল হক

আজিজুল পারভেজ   

৫ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



করোনা সংকট কেটে যাবে, এই আশায় মানুষ

‘করোনাভাইরাসের ফলে পৃথিবীজুড়ে যে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, তা এক বিপর্যয়কর সময়। সাত দিন, পনেরো দিন, এক মাস হলে এতটা বিপর্যয়কর হতো না। কিন্তু এটা কত দিন চলবে তা তো বলা যাচ্ছে না। এই যে অনির্দিষ্টকাল ধরে মানুষকে নিয়ন্ত্রিত অবস্থার মধ্যে কাটাতে হচ্ছে, এটা খুব কষ্টকর।’ চলমান করোনাকালকে এভাবে চিহ্নিত করলেন দেশের খ্যাতিমান প্রাবন্ধিক ও বিশিষ্ট চিন্তাবিদ অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে দীর্ঘকাল অধ্যাপনা শেষে বর্তমানে অবসর জীবন যাপন করছেন তিনি। লেখালেখি তাঁর ধ্যানজ্ঞান। করোনাকালীন এই সময়টাও লেখালেখি করে পার করার চেষ্টা করছেন। তবে সাধ্যানুযায়ী হয়ে উঠছে না। কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় বললেন, ‘আমার অভ্যাসটা লেখালেখি করা। আমার সমস্ত অস্তিত্ব দিয়ে, শক্তি দিয়ে লিখতাম। বাংলাদেশটাকে আমি একটা উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চেয়েছি।

উন্নত জনজীবন চেয়েছি। সেই উদ্দেশ্য নিয়েই আমার সারা জীবনের লেখালেখি। কিন্তু করোনা সংক্রমণ দেখা দেওয়ার পর আগের মতো আর লেখালেখি হচ্ছে না। আমার পুরনো কিছু বই কম্পোজ করা ছিল, পুনর্মুদ্রণ হবে। কবে হবে জানি না। তবে কাজটি করে রাখছি। চিন্তাশীল মানুষ যার যা কাজ; সেই কাজ করার চেষ্টা করছেন, আমিও তাই করেছি।’

প্রায় চার মাস স্বেচ্ছায় ঘরবন্দি। এই সময়টা কি তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়—এমন প্রশ্ন করা হলে আরো বলেন, ‘করোনাভাইরাসের ফলে যে অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে, এ রকম অবস্থা পৃথিবীর ইতিহাসে আর কখনো দেখা যায়নি। এটা সম্পূর্ণ নতুন। একসময় প্লেগ হতো, কলেরা হতো, বসন্ত-ম্যালেরিয়া হতো। এগুলো মানুষ নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে। করোনা একটি নতুন বাস্তবতা নিয়ে এসেছে। নিজের জন্য এই সময়টা সত্যিই কঠিন। বয়স হয়েছে। শরীরও অনেক দুর্বল। মনের মধ্যে অনেক আশা ছিল। সেই বিষয়গুলো লিখতে চেয়েছি। কিন্তু লিখতে পারছি না। নিজের জন্য এই পরিস্থিতিটা দুঃখজনক। তার পরও আশা করছি কাজগুলো করতে পারব।’

এ পর্যন্ত ২১টির বেশি প্রবন্ধের বই প্রকাশিত হয়েছে তাঁর। বইগুলো পুনর্মুদ্রণের কাজ এগিয়ে রাখছেন করোনার এই সময়টায়। রচনাবলি প্রকাশের কাজও এগোচ্ছে। জাগৃতি প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হবে। করোনা পরিস্থিতিতেও সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতির নানা অসংগতি বড্ড পীড়া দিচ্ছে তাঁকে। বললেন, ‘অনেকে আশা করেছিলেন, করোনার এই পরিস্থিতিতে পৃথিবীজুড়ে মানুষ সাবধান হবে, নৈতিক দিক দিয়ে উন্নত হবে, দুর্নীতি-অনাচার-খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকবে। কিন্তু বাস্তবে দেখতে পাচ্ছি, অনাচার, দুর্নীতি, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, মানুষকে বঞ্চনা করা আগের মতোই চলছে। এ রকম একটা বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি।’

দীর্ঘশ্বাস ফেলে আরো যোগ করলেন, ‘বাংলাদেশকে উন্নত রাষ্ট্ররূপে গড়ে তোলা দরকার। রাজনৈতিক দলগুলো রাজত্ব করতে চাইলেও দেশটাকে উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার কথা ভাবছে না। দেশের জনগণের কাছে তারা যায় না। জনগণের ওপর তাদের আস্থা প্রমাণ করে না। এই রাজনীতির ফলে বাংলাদেশ রাষ্ট্ররূপে গড়ে উঠছে না।’

রাজনীতি নিয়ে হতাশা প্রকাশের পরও আশায় বুক বাঁধেন তিনি। বলেন, ‘আসলে নৈতিক উন্নতি, দুর্নীতি দূর করা, একটা ভালো অবস্থার দিকে যেতে হলে এর জন্য প্রস্তুতি লাগবে। আমাদের দেশে দরকার রাজনীতির উন্নতি। উন্নত চরিত্রের রাজনৈতিক দল। উন্নত চরিত্রের রাজনৈতিক দল ছাড়া দেশের ভালো করতে পারবে না কোনো সরকার। এটা ঠিক, মানুষ ভুলত্রুটি করে, অন্যায় করে। কিন্তু অন্যায় করা উচিত নয়, কেউ অন্যায় করলে সংশোধন করব, নিজেদের ক্রমাগত উন্নত অবস্থায় নিয়ে যাব—রাজনীতিবিদদের মধ্যে এই মানসিকতা দরকার। আশা করতে চাই বাংলাদেশ উন্নত রাজনীতির দিকে যাবে।’

৭৮ বছর বয়সে এসে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক স্ত্রী এবং অসুস্থ এক ভাইকে নিয়ে জীবন যাপন করছেন। প্রবল আত্মবিশ্বাস নিয়ে বললেন, ‘করোনা সংকট কেটে যাবে, এটাকে নিয়ন্ত্রণ করার উপায় পাওয়া যাবে। মানুষের চেষ্টায় বিজ্ঞানকে অবলম্বন করেই এর সমাধান আসবে। পৃথিবীজুড়ে এই আশায় আছে মানুষ।’

করোনার কারণে বিশ্বজুড়ে ইতিবাচক একটি পরিবর্তন আসবে বলেও বিশ্বাস করেন তিনি, ‘মানব জাতির মধ্যে যখন বিপর্যয় দেখা দেয়, এই বিপর্যয় অতিক্রম করে ভালোর দিকে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষাও তৈরি হয়। করোনার কারণে পৃথিবীজুড়ে বড় পরিবর্তনের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। অনেক কিছু বদলে ফেলার জন্য মানুষের মনে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হবে।’

মন্তব্য